অর্থনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়, রপ্তানি–বিনিয়োগে আসছে বড় বিপ্লব–
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতিতে এক ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জিত হয়েছে। বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে Bangladesh-Japan Economic Partnership Agreement (BJEPA)–এর নেগোসিয়েশন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী MOTEGI Toshimitsu–এর সঙ্গে টেলিফোনে আলোচনার মাধ্যমে এই চুক্তি সম্পন্নকরণের যৌথ ঘোষণা প্রদান করেন।
এই চুক্তি কার্যকর হলে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) হিসেবে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জাপানের সঙ্গে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তিতে প্রবেশ করতে যাচ্ছে—যা দেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে বিপুল পরিবর্তন নিয়ে আসবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
চুক্তির সবচেয়ে বড় অর্জন: শুল্কমুক্ত জাপান বাজার
বাংলাদেশ–জাপান ইপিএ কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই-
- বাংলাদেশ পাবে ৭,৩৭৯টি পণ্যে তাৎক্ষণিক শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার
- জাপান পাবে ১,০৩৯টি পণ্যে বাংলাদেশের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা
বিশেষভাবে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক (RMG) চুক্তি স্বাক্ষরের প্রথম দিন থেকেই জাপানের বাজারে সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে।
এছাড়াও পোশাক খাতে পাওয়া যাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ Single Stage Transformation সুবিধা, যা রপ্তানি ব্যয় কমিয়ে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বহুগুণ বাড়াবে।
রপ্তানি, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে নতুন দিগন্ত
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ইপিএ-
- বাংলাদেশের রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করবে
- জাপানি বিনিয়োগকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে
- শিল্প খাতে উচ্চপ্রযুক্তি স্থানান্তর ত্বরান্বিত করবে
- লক্ষাধিক মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে
বিশেষ করে পোশাক, চামড়া, কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশল, আইটি ও সেবা খাতে এই চুক্তির ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সেবা বাণিজ্যে যুগান্তকারী অগ্রগতি
চুক্তির আওতায়-
- বাংলাদেশ জাপানের জন্য ৯৭টি সেবা উপখাত উন্মুক্ত করবে
- জাপান বাংলাদেশের জন্য ১২০টি সেবা উপখাত চারটি মোডে উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে
এর ফলে বাংলাদেশে জাপানি কোম্পানির বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রযুক্তি স্থানান্তর দ্রুত বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
দীর্ঘ আলোচনার সফল পরিণতি
এই ঐতিহাসিক চুক্তি বাস্তবায়নের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ও সুপরিকল্পিত আলোচনা প্রক্রিয়া-
- ২০২৩: Joint Study Group গঠন ও ১৭টি সেক্টর অন্তর্ভুক্ত প্রতিবেদন প্রকাশ
- ২০২৪–২০২৫: ঢাকা ও টোকিওতে ৭টি রাউন্ড নেগোসিয়েশন
- সর্বশেষ রাউন্ড: ৩–১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, টোকিও—যেখানে ইপিএ টেক্সট চূড়ান্ত হয়
এই প্রক্রিয়ায় বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী সরাসরি নেতৃত্ব দেন। একাধিক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা, জাপান সফর ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের মাধ্যমে বাংলাদেশের দৃঢ় অঙ্গীকার ও কৌশলগত গুরুত্ব জাপানের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়।
বাংলাদেশ–জাপান সম্পর্কের নতুন অধ্যায়
বিশ্লেষকদের মতে, এই ইপিএ শুধু একটি বাণিজ্য চুক্তি নয়- এটি বাংলাদেশ–জাপান কৌশলগত অংশীদারিত্বের ভিত্তি আরও সুদৃঢ় করবে।
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে এবং উন্নয়নশীল দেশের পথে উত্তরণের প্রস্তুতি আরও দৃঢ় হবে।
বাংলাদেশের জন্য এটি-
১. প্রথমবার জাপানের সঙ্গে ইপিএ
২. হাজারো পণ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার
৩. রপ্তানি ও বিনিয়োগে বড় লাফ
৪. কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তি উন্নয়ন
৫. অর্থনৈতিক কূটনীতিতে ঐতিহাসিক সাফল্য
নিঃসন্দেহে এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বড়, ঐতিহাসিক ও ভবিষ্যতমুখী গুড নিউজ, যা দেশের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
সোর্স: বাসস