দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি কাজ, এমনকি বাথরুমে প্রবেশ ও বের হওয়াও ইসলামে ইবাদতের অংশ। রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর শেখানো দোয়া ও আদব পালনের মাধ্যমে আমরা একদিকে যেমন আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভ করি, তেমনি অন্যদিকে শয়তান ও জিনদের অনিষ্ট থেকে সুরক্ষিত থাকি।
বাথরুমে প্রবেশের আদব অনুযায়ী দোয়া পড়ার গুরুত্ব
ইসলামে পরিচ্ছন্নতাকে ঈমানের অংশ বলা হয়েছে। আর এই পরিচ্ছন্নতা অর্জনের স্থানে শয়তানের প্ররোচনা থেকে বাঁচার জন্য দোয়ার গুরুত্ব অপরিসীম।
কেন বাথরুমে প্রবেশে দোয়া পড়া সুন্নাহ
বাথরুম বা টয়লেটের স্থানটি হলো এমন, যেখানে সাধারণত নোংরা ও অপবিত্রতা থাকে। আর এই স্থানটি জিন ও শয়তানের আড্ডাখানা। এই দোয়ার মাধ্যমে আমরা আল্লাহ্র কাছে এই অপবিত্রতা সৃষ্টিকারী শয়তান ও শয়তানের অনুচরদের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই। এটি রাসূল (সাঃ)-এর শেখানো একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ।
অশরীরী বিপদ থেকে নিরাপত্তা
দোয়াটি মূলত জিন এবং নারী-পুরুষ শয়তানদের অনিষ্ট থেকে সুরক্ষা লাভের জন্য পাঠ করা হয়। হাদিসে উল্লেখ আছে, বাথরুমের মতো অপরিষ্কার স্থানে জিনেরা অবস্থান করে। দোয়াটি পড়লে আল্লাহ্র পক্ষ থেকে এক প্রকার নিরাপত্তার বেষ্টনী তৈরি হয়।
দৈনন্দিন পরিচ্ছন্নতার আদব রক্ষা
দোয়াটি বাথরুমে প্রবেশের আগে পাঠ করার মাধ্যমে আমরা দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাজেও আল্লাহ্র স্মরণ করার অভ্যাস তৈরি করি।
বাথরুমে প্রবেশ করার দোয়ার আরবি পাঠ
বাথরুমে প্রবেশের দোয়াটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমসহ বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।
আরবি:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْخُبُثِ وَالْخَبَائِثِ
দোয়ার বাংলা উচ্চারণ
উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা ইন্নি আ’ঊযু বিকা মিনাল খুবুসি ওয়াল খবা-য়িস।
দোয়ার বাংলা অর্থ
অর্থ: “হে আল্লাহ! আমি পুরুষ জিন (শয়তান) ও নারী জিন (শয়তানি) থেকে আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।”
(ব্যাখ্যা: ‘খুবুসি’ দ্বারা পুরুষ শয়তান এবং ‘খাবায়িস’ দ্বারা নারী শয়তানকে বোঝানো হয়েছে। অন্যমতে, ‘খুবুসি’ দ্বারা খারাপ কাজ এবং ‘খাবায়িস’ দ্বারা খারাপ বিষয়বস্তুকে বোঝানো হয়েছে। তবে প্রথম ব্যাখ্যাটিই প্রসিদ্ধ।*)
বাথরুমে প্রবেশের সুন্নাহ ও আদব
দোয়া পড়ার পাশাপাশি বাথরুমে প্রবেশের সময় কিছু আদব মেনে চলা সুন্নাহসম্মত:
- বাম পা দিয়ে প্রবেশ করা: বাথরুমে প্রবেশের সময় বাম পা আগে বাড়িয়ে প্রবেশ করা সুন্নাহ।
- কুরআন তেলাওয়াত না করা: বাথরুমে প্রবেশের পর কুরআন তেলাওয়াত করা কঠোরভাবে নিষেধ।
- নামাজের পোশাক খুলে রাখা: সম্ভব হলে বাথরুমে প্রবেশের আগে শরীরের অতিরিক্ত পোশাক বা এমন কিছু খুলে রাখা, যাতে ইস্তিনজার সময় অপবিত্র হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।
- বাথরুমে কথা না বলা: বাথরুমের ভেতরে কোনো কথা বলা বা অযথা জিকির করা মাকরুহ বা অপছন্দনীয়।
- কাবার দিকে মুখ বা পিঠ না করা: বাথরুম ব্যবহার করার সময় কিবলার দিকে মুখ বা পিঠ করে বসা মাকরুহ।
বাথরুম থেকে বের হওয়ার দোয়া
বাথরুম থেকে বের হওয়ার পর আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা চেয়ে দোয়া করাও সুন্নাহ। এর অর্থ হলো আল্লাহ্র কাছে শারীরিক ও আত্মিক সকল অপবিত্রতা থেকে মুক্তি চাওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।
আরবি:
غُفْرَانَكَ
উচ্চারণ: গুফরা-নাকা
অর্থ: “হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।”
(ব্যাখ্যা: এই সময় আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা চাওয়ার কারণ হলো, বাথরুম ব্যবহারের সময় সাধারণত দোয়া বা জিকির করা যায় না। তাই এই দোয়াটি পড়ে পুনরায় আল্লাহ্র স্মরণে ফিরে আসা এবং সব ধরনের ভুল-ত্রুটির জন্য আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা চাওয়া হয়।)
শিশুদের বাথরুমের দোয়া শেখানোর সহজ কৌশল
ছোট থেকেই শিশুদের এই দোয়াগুলো শেখানো তাদের দৈনন্দিন জীবনে ইসলামী অভ্যাস গঠনে সাহায্য করে।
- কার্ড, চার্ট বা পিকচার বুক ব্যবহার: বাথরুমে প্রবেশের সুন্নাহগুলো (বাম পা দিয়ে ঢোকা, দোয়া পড়া) ছবি বা চার্টের মাধ্যমে দেখিয়ে শেখানো।
- ছড়ার মতো উচ্চারণ শেখানো: দোয়ার উচ্চারণকে একটি সহজ ছন্দের সাথে গেয়ে শেখানো যাতে তারা দ্রুত মুখস্থ করতে পারে।
- নিয়মিত অভ্যাস করানো: যখনই তারা বাথরুমে যেতে চাইবে, তখনই বাবা-মা বা শিক্ষক মনে করিয়ে দেবেন, “প্রথমে দোয়া, তারপর বাম পা।”
দোয়া পড়ার সাধারণ ভুল ও সংশোধনী
- ভুল উচ্চারণে অর্থ পরিবর্তন হতে পারে: আরবি উচ্চারণে খুবই সামান্য ভুল থাকলেও অর্থ পরিবর্তিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই শুদ্ধ উচ্চারণ শেখার জন্য অভিজ্ঞ কারো শরণাপন্ন হওয়া।
- দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দোয়া পড়া উত্তম: বাথরুমে প্রবেশের দোয়াটি দরজার সামনে বা কাছাকাছি দাঁড়িয়ে পড়বেন, বাথরুমের ভেতরে পা ফেলার আগেই।
- বাথরুমের ভেতরে দোয়া পড়া যাবে না: পবিত্র স্থান না হওয়ার কারণে বাথরুমের ভেতরে মুখে আল্লাহ্র নাম বা কোরআনের কোনো আয়াত পাঠ করা কঠোরভাবে নিষেধ।
বাথরুমে প্রবেশ করার দোয়া – সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর (FAQ + Answer)
১. বাথরুমে প্রবেশ করার দোয়া কি?
দোয়া:
بِسْمِ اللهِ، اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْخُبُثِ وَالْخَبَائِثِ
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল খুবুসি ওয়াল খাবায়িছ
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি অপবিত্র এবং অপদেবতা (পুরুষ ও নারী শয়তান) থেকে আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি।
২. বাথরুমে যাওয়ার আগে কি দোয়া পড়তে হয়?
হ্যাঁ, বাথরুমে ঢোকার আগেই উক্ত দোয়া পড়তে হয়। ঘরে প্রবেশ করার সময় দরজার সামনে থেমে দোয়াটি পড়া সুন্নত।
৩. বাথরুমে প্রবেশ করার নিয়ম কী?
- বাম পা আগে দিয়ে বাথরুমে প্রবেশ করা
- দোয়া পড়া
- কিবলামুখী বা বিপরীতমুখী হয়ে বসা থেকে বিরত থাকা
- অপ্রয়োজনীয় কথা না বলা
- শরীর ও কাপড় নোংরা না করা
- ডান হাতে পবিত্র কাজ না করা
৪. “বিসমিল্লাহি আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল খুবুছি ওয়াল খাবায়িছ” এর অর্থ কী?
অর্থ:
“হে আল্লাহ! আমি অপবিত্র জিন-শয়তান পুরুষ (খুবুছ) ও নারী (খাবায়িছ) থেকে আপনার নিকট আশ্রয় চাই।”
৫. গোফরানাকা অর্থ কি?
গোফরানাকা (غفرانك) অর্থ-
“আমি আপনার (আল্লাহর) ক্ষমা চাই।”
বাথরুম থেকে বের হওয়ার সময় এ শব্দটি বলা সুন্নত।
৬. পেশাবের দোয়া কী?
পেশাবের বা পায়খানা করার আলাদা দোয়া নেই।
বাথরুমে ঢোকার সময় যে দোয়া পড়া হয় সেটিই যথেষ্ট।
বের হওয়ার দোয়া: غُفْرَانَكَ – গোফরানাকা
৭. কোন দিকে বাথরুম করা উচিত?
ইসলাম অনুযায়ী-
- কিবলামুখী বা কিবলার বিপরীতে বসে বাথরুম করা নিষেধ
- উত্তর–দক্ষিণ দিকে মুখ করে বসা উত্তম
৮. ঈশান কোণে পায়খানা-বাথরুম থাকলে কী সমস্যা হতে পারে?
ইসলামে বিষয়ে কোন বিধি-নিষেধ নেই।
৯. বাথরুমের রং কেমন হওয়া উচিত?
উপযুক্ত রং-
- হালকা নীল
- সাদা
- অফ-হোয়াইট
- হালকা ধূসর
এই রংগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও প্রশান্তির অনুভূতি দেয়।
১০. বাড়ির পূর্ব দিকে বাথরুম থাকলে কি হয়?
ইসলামের এমন বিধান নেই।
১১. টয়লেট সিট কী?
টয়লেট সিট হলো-
কমোডের উপরের বসার অংশ।
এর দুই ধরনের বেশি প্রচলিত ফরম্যাট
- ওয়েস্টার্ন কমোড সিট
- ইন্ডিয়ান/স্কোয়াট টয়লেট
১২. বাথরুমে প্রবেশের দোয়া কি?
“বিসমিল্লাহি আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল খুবুছি ওয়াল খাবায়িছ”
অর্থ: সব ধরনের অপদেবতা ও অপবিত্রতা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই।