রাজধানীর কূটনৈতিক অঞ্চলে ইতিহাসের এক নীরব স্মারক যুক্ত হলো।
ঢাকার গুলশান-২ থেকে প্রগতি সরণি পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়কের নতুন নামকরণ করা হয়েছে ‘ফেলানী এভিনিউ’। সীমান্তে বিএসএফের গুলীতে নিহত কিশোরী ফেলানী খাতুনের স্মৃতিকে ধারণ করতেই এই নামকরণ।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া মঙ্গলবার তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি লেখেন, সীমান্তে নিহত কিশোরী ফেলানীর স্মরণে ভারতের দূতাবাসসংলগ্ন গুলশান-২ থেকে প্রগতি সরণি পর্যন্ত সড়কটির নামকরণ করা হয়েছে ‘ফেলানী এভিনিউ’।
হৃদয়বিদারক সেই ৭ জানুয়ারি
২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে ঘটে যায় বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড। ভারতের ভেতর থেকে বাবার সঙ্গে দেশে ফেরার পথে ১৫ বছর বয়সী ফেলানী খাতুনকে গুলি করে হত্যা করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ।
গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর কাঁটাতারে দীর্ঘ চার ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা ফেলানীর নিথর দেহ বিশ্ববিবেককে নাড়া দেয়। দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে সেই ছবি ছড়িয়ে পড়ে, শুরু হয় সীমান্ত হত্যা ও মানবাধিকার নিয়ে তীব্র আলোচনা।
বিচার হয়নি ১৫ বছরেও
ফেলানী হত্যার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলেও ন্যায়বিচার আজও অধরা। ২০১৩ সালে ভারতের কোচবিহারে বিএসএফের বিশেষ আদালতে বিচার শুরু হলেও অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে প্রথমে খালাস দেওয়া হয়। পরে বিজিবির আপত্তিতে পুনরায় বিচার শুরু হলেও ২০১৪ সালেও একই রায় বহাল থাকে।
২০১৫ সালে ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম ভারতের সুপ্রিম কোর্টে রিট আবেদন করেন। একাধিকবার শুনানির তারিখ পেছালেও মামলাটি এখনও নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।
পরিবারের কণ্ঠে আশা আর বেদনা
ফেলানীর ছোট ভাই জাহান উদ্দিন বলেন,
“আমার বোনের নামে ঢাকার গুলশানে সড়কের নাম হওয়ায় আমরা গর্বিত। কিন্তু যে আমার বোনকে হত্যা করেছে, তার বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমাদের কষ্ট শেষ হবে না।”
মা জাহানারা বেগম বলেন,
“ভারতীয় দূতাবাসের সামনে রাস্তার নাম আমার মেয়ের নামে হয়েছে-এতে মনটা ভরে গেছে। তবে আমি শুধু চাই, আমার মেয়ের হত্যার বিচার হোক।”
বাবা নুর ইসলাম জানান,
“দুইবার ভারতে গিয়ে সাক্ষ্য দিয়েছি। সুপ্রিম কোর্টেও গেছি। এখনো অপেক্ষায় আছি। ন্যায়বিচার না পাওয়া পর্যন্ত এই লড়াই চালিয়ে যাব।”
প্রতীকী স্বীকৃতি, কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেল
স্থানীয়রা বলছেন, ফেলানী এভিনিউ নামকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী স্বীকৃতি। তবে এর পাশাপাশি সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং ফেলানী হত্যার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
আইনি সহায়তাকারী অ্যাডভোকেট আব্রাহাম লিংকন বলেন,
“ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টে মামলাটির শুনানি হওয়া দরকার। শান্তিপূর্ণ সীমান্তের স্বার্থেই এই বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা আসা উচিত।”
স্মরণ থেকে ন্যায়ের পথে?
‘ফেলানী এভিনিউ’ শুধু একটি রাস্তার নাম নয়- এটি সীমান্তে নিহত নিরীহ মানুষের স্মৃতি, রাষ্ট্রীয় দায় ও ন্যায়বিচারের দীর্ঘ প্রতীক্ষার প্রতীক।
ঢাকার কূটনৈতিক এলাকায় এই নামফলক স্থাপন ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিলেও, প্রশ্ন থেকেই যায়-ফেলানী কি কোনো দিন বিচার পাবে?