বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৬

ঘুম থেকে উঠার দোয়া – উচ্চারণ, অর্থ ও ফজিলত

বহুল পঠিত

দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি কাজ শুরু করার পূর্বে মহান আল্লাহ্‌র স্মরণ করা একজন মুমিনের প্রধান বৈশিষ্ট্য। আর ঘুম থেকে ওঠার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়, যখন আমরা এক প্রকার ‘মৃত্যু’ থেকে পুনরায় ‘জীবন’ লাভ করি, তখন আল্লাহ্‌র প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা অত্যন্ত জরুরি। রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী এই মুহূর্তে একটি বিশেষ দোয়া পাঠ করা হয়।

ঘুম থেকে ওঠার সময় দোয়া পড়ার গুরুত্ব

ঘুম থেকে ওঠার দোয়াটি হলো আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা, তাঁর সার্বভৌমত্ব এবং আখেরাতের প্রতি বিশ্বাসের এক অনন্য প্রকাশ।

সুন্নাহ অনুযায়ী দোয়া করার কারণ

রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) তাঁর সাহাবীদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ছোট-বড় কাজে আল্লাহ্‌র স্মরণ ও সুন্নাহ অনুসরণের শিক্ষা দিয়েছেন। এই দোয়াটি তাঁরই শেখানো একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ, যা প্রতিটি মুসলমানের জীবনকে বরকতময় করে তোলে।

দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর শর্তিত রহমত লাভ

এই দোয়ার মাধ্যমে বান্দা স্বীকার করে যে, আল্লাহ্‌ই তাকে ঘুমের মাধ্যমে সাময়িক মৃত্যু দিয়ে আবার নতুন জীবন দান করেছেন। এই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ফলে আল্লাহ্‌ তায়ালা তাঁর প্রতি খুশি হন এবং দিনের শুরুতেই বান্দার উপর তাঁর বিশেষ রহমত ও বরকত বর্ষণ করেন।

দৈনন্দিন জীবনে নিরাপত্তা ও শান্তি বৃদ্ধি

দিনের শুরুতে আল্লাহ্‌র যিকির ও তাঁর কাছে আশ্রয় চাওয়ার ফলে, মানুষ শয়তানের ওয়াসওয়াসা ও অনিষ্ট থেকে অনেকটা সুরক্ষিত থাকে। ফলে পুরো দিনটি মানসিক শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে কাটানো সহজ হয়।

ঘুম থেকে ওঠার দোয়ার আরবি উচ্চারণ

ঘুম থেকে ওঠার দোয়াটি সহীহ বুখারী এবং সহীহ মুসলিমসহ বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।

আরবি:

الحَمْدُ للهِ الَّذِي أَحْيَانَا بَعْدَ مَا أَمَاتَنَا وَإِلَيْهِ النُّشُورُ

উচ্চারণ:

আ’লহা’মদু লিল্লা-হিল্লাযী আ’হ্ইয়া-না- বা’দা মা- আ’মা-তানা- ওয়া ইলাইহিন নুশূ-র।

ঘুম থেকে ওঠার দোয়ার বাংলা অর্থ

অর্থ:

“সকল প্রশংসা সেই আল্লাহ্‌র জন্য, যিনি আমাদের মৃত্যুর (ঘুম) পরে জীবিত করেছেন, এবং তাঁরই দিকে (আমাদের) ফিরে যেতে হবে/সমবেত হতে হবে।”

এই দোয়ার গভীর অর্থ মুমিনকে আল্লাহর শক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

দোয়ার ফজিলত ও উপকারিতা

এই ছোট্ট দোয়াটি পাঠের মাধ্যমে বান্দা বহুবিধ উপকারিতা লাভ করে থাকে।

আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের গুরুত্ব

এই দোয়াটি ঘুম থেকে ওঠার প্রথম মুহূর্তেই আল্লাহর প্রতি আমাদের গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, জীবনের প্রতিটি নিঃশ্বাসই আল্লাহ্‌র দান এবং যেকোনো মুহূর্তে জীবন কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা তাঁরই হাতে।

দৈনন্দিন জীবনে সাফল্য ও শান্তি বৃদ্ধি

দিনের শুরুতে আল্লাহ্‌র প্রশংসা ও তাঁর কাছে আত্মসমর্পণের এই মনোভাব ব্যক্তিকে ইতিবাচক ও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। একজন কৃতজ্ঞ বান্দার জন্য আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে দিনের কাজে সাফল্য ও কর্মে বরকত লাভের পথ সুগম হয়।

সুন্নাহ অনুযায়ী জীবনের সূচনা করা

প্রতিদিন সুন্নাহ অনুযায়ী দোয়া পাঠ করে দিন শুরু করা মানে, প্রতিটি দিনকে নবীর (সাঃ) দেখানো পথে শুরু করা। এতে ইবাদতের স্বাদ ও জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পায়।

ঘুম থেকে ওঠার সময় অন্যান্য প্রয়োজনীয় আমল

ঘুম থেকে ওঠার পর এই দোয়াটির পাশাপাশি কিছু সুন্নাহসম্মত আমল রয়েছে যা আমাদের করা উচিত:

  • মেসওয়াক করা: ঘুম থেকে উঠে প্রয়োজনীয় কাজ সারার পর মেসওয়াক করা বা দাঁত ব্রাশ করা।
  • অজু করা: সুন্দর করে অজু করা।
    • ফজেরর নামাজ আদায় : ফজরের ফরজ নামাজ জামাতে আদায়ের জন্য মসজিদে যাওয়া। সুন্নত বাসায় পড়া উত্তম।

শিশুদের জন্য ঘুম থেকে ওঠার দোয়া শেখার কৌশল

ছোটবেলা থেকেই শিশুদের এই দোয়াটি শেখানো জরুরি। এর জন্য কিছু কার্যকরী কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে:

সহজ উচ্চারণ শেখানো

  • প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠার পর বাচ্চাকে দোয়াটি একবার হলেও উচ্চারন করানো।
  • দোয়ার বাক্যগুলোকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে বার বার পুনরাবৃত্তি করে সেখানো।

বাংলা অর্থসহ বোঝানো

  • শিশুদের তাদের বোধগম্য ভাষায় দোয়ার অর্থ ব্যাখ্যা করা: “আমরা আল্লাহকে থ্যাংকস দিচ্ছি যে তিনি আমাদের আবার জেগে উঠতে সাহায্য করেছেন।”
  • বোঝানো যে, এটা কেবল একটি দোয়া নয়, বরং এটি আল্লাহ্‌র সাথে কথা বলার একটি উপায়।

কবিতার মত করে শেখানো

  • দোয়াটিকে একটি সহজ ও ছন্দময় সুরের সাথে গেয়ে শেখানো। ছন্দের মাধ্যমে শিশুরা দ্রুত ও আনন্দের সাথে মুখস্থ করতে পারে।
  • ঘুম থেকে ওঠার পরই এটি মনে করিয়ে দিয়ে অভ্যাস তৈরি করা।

ঘুম থেকে উঠার দোয়া সম্পর্কিত সাধারণ প্রশ্নোত্তর (FAQ)

১. ঘুম থেকে ওঠার দোয়া কোন সময় পড়া হয়?

উত্তর: ঘুম থেকে জেগে ওঠার সাথে সাথেই এবং বিছানা ছাড়ার পূর্বেই এই দোয়াটি পড়া হয়।

২. দোয়া পড়তে পারলে কি বিশেষ সওয়াব আছে?

উত্তর: হ্যাঁ, এই দোয়াটি পাঠ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ। সুন্নাহ অনুসরণ করে আমল করার জন্য আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে বিশেষ প্রতিদান ও সওয়াব রয়েছে, সেই সাথে দিনের শুরুতে আল্লাহর স্মরণ করার বরকতও লাভ হয়।

৩. ঘুম থেকে উঠার পর প্রথম করণীয় কি?

উত্তর: প্রথম করণীয় হলো: ১. এই দোয়াটি পাঠ করা। ২. এরপর মিসওয়াক/দাঁত পরিষ্কার করা এবং ৩. অজু করে ফজরের নামাজ আদায় করা।

৪. ঘুমের আগে কোন দোয়া পড়া উচিৎ?

উত্তর: রাসূল (সাঃ) কর্তৃক বর্ণিত সুন্নাহসম্মত ঘুমানোর দোয়া হলো: বিসমিকাল্লাহুম্মা আমূতু ওয়া আহ্‌ইয়া। (অর্থ: “হে আল্লাহ! আপনারই নামে আমি ঘুমাই এবং আপনারই নামে জাগ্রত হই।)।

৫. ঘুম থেকে উঠার দোয়া কি?

উত্তর: ঘুম থেকে ওঠার দোয়া হল “الحَمْدُ للهِ الَّذِي أَحْيَانَا بَعْدَ مَا أَمَاتَنَا وَإِلَيْهِ النُّشُورُ।”

৬. সকালে ঘুম থেকে উঠে কোন দোয়া পড়তে হয়?

উত্তর: সকালে ঘুম থেকে উঠে ঘুম থেকে ওঠার দোয়া পড়া উচিত।

৭. নিদ্রা থেকে জাগ্রত হওয়ার জন্য কোন দোয়া পড়তে হয়?

উত্তর: নিদ্রা থেকে জাগ্রত হওয়ার জন্য ঘুম থেকে ওঠার দোয়া পড়তে হয়।

আরো পড়ুন

দাকাতুল ফিতরের হার নির্ধারণ: জনপ্রতি সর্বনিম্ন ১১০ টাকা, সর্বোচ্চ ২,৮০৫ টাকা

চলতি বছরের সাদাকাতুল ফিতর (ফিতরা)-এর হার নির্ধারণ করেছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। এ বছর জনপ্রতি সর্বনিম্ন ১১০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২,৮০৫ টাকা ফিতরা আদায়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

রমযানের প্রস্তুতি: আত্মিক ও শারীরিক প্রস্তুতির পূর্ণ গাইড

রমযান কেবল একটি মাস নয়, এটি হলো আত্মিক জাগরণের সময়। এই মাসে মানুষের হৃদয় আলোর প্রতিফলনে ভরে ওঠে, মন শান্ত হয় এবং আত্মা আল্লাহর দিকে ঝুঁকে।

ষষ্ঠ তারাবি: শয়তান থেকে বাঁচার পথ ও ইসলামের শিক্ষা

ষষ্ঠ তারাবিতে পঠিত হলো সূরা আরাফ (১২–২০৬) ও সূরা আনফাল (১–৪০)। আজকের পাঠের মূল বার্তা: শয়তান মানুষকে উলঙ্গপনা ও বেহায়াপনার পথে প্রলুব্ধ করে, আর আল্লাহর নির্দেশ পালনের মাধ্যমে আমরা নিরাপদ থাকি।
- Advertisement -spot_img

আরও প্রবন্ধ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ প্রবন্ধ