মঙ্গলবার, জানুয়ারি ১৩, ২০২৬

ইরান বনাম আমেরিকা: বিভক্তি নাকি মুসলিম উম্মাহর ‘কৌশলগত ঐক্য’ প্রয়োজন?

বহুল পঠিত

আজ যখন আমেরিকার রণতরী ইরানের দিকে তাক করে আছে, তখন সোশ্যাল মিডিয়া বা চায়ের কাপের আড্ডায় মুসলিম সমাজের একাংশের উল্লাস দেখে নিজেকে প্রশ্ন করতে বাধ্য হচ্ছি- আমরা কি শত্রু চিনতে ভুল করছি?

ইরানের সঙ্গে আমেরিকার যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতি নতুন কিছু নয়। কিন্তু এবারের সংকটে মুসলিম বিশ্বের, বিশেষ করে সুন্নি সম্প্রদায়ের একাংশের প্রতিক্রিয়া বেশ বিস্ময়কর। তাদের যুক্তি সরল- ইরান শিয়া অধ্যুষিত, শিয়াদের আকিদা ‘ভ্রান্ত’, সুতরাং তাদের পতন বা ধ্বংস উদযাপনের বিষয়। কিন্তু এই সরলীকরণ কি ইসলামের গভীর দর্শন বা ইতিহাসের শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

শত্রুর শত্রু কি সবসময় বন্ধু? রাজনীতির মাঠে একটি কথা প্রচলিত আছে, “শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু।” কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে কি তাই? ইহুদিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যখন কোনো মুসলিম নামধারী জনপদকে ধ্বংস করতে উদ্যত হয়, তখন সেখানে মাজহাব বা ফেরকার দোহাই দিয়ে সেই আগ্রাসনকে সমর্থন করা কি আত্মঘাতী নয়? আল্লাহ তাআলা কুরআনে স্পষ্ট করেছেন, তিনি জুলুমকে ঘৃণা করেন। সেই জুলুম যার ওপরই হোক। আজ যদি আমরা ইরানের ওপর বোমা হামলাকে ‘উচিত শিক্ষা’ বলে হাততালি দিই, তবে কাল সেই একই বোমারু বিমান যখন রিয়াদ, ঢাকা,আঙ্কারা, কায়রো বা ইসলামাবাদের আকাশে উড়বে, তখন আমাদের পক্ষে কথা বলার কেউ থাকবে কি?

ইতিহাসের আয়নায় বর্তমান সংকট অনেকেই আজ আবেগের বশবর্তী হয়ে কথা বলছেন, কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। ৬১৪ খ্রিস্টাব্দের কথা ভাবুন। অগ্নিপূজক পারস্য যখন খ্রিস্টান রোমানদের পরাজিত করল, মক্কার মুশরিকরা তখন আনন্দে নেচেছিল। তাদের যুক্তি ছিল- আমরাও মূর্তিপূজক, পারস্যও তাই; আর মুসলিম ও খ্রিস্টানরা যেহেতু এক আল্লাহ ও কিতাবে বিশ্বাসী, তাই রোমানদের হার মানে মুসলিমদেরও নৈতিক পরাজয়।

রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং সাহাবায়ে কেরাম তখন ব্যথিত হয়েছিলেন। কেন? কারণ, মূর্তিপূজকদের তুলনায় আহলে কিতাব খ্রিস্টানরা সত্যের অধিক নিকটবর্তী ছিল। পবিত্র কুরআনের সূরা আর-রূম-এর সেই ঐতিহাসিক ভবিষ্যদ্বাণী ও রোমানদের বিজয় কামনা প্রমাণ করে যে, ইসলামি বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি (Worldview) অন্ধ আবেগের ওপর নয়, বরং ‘তুলনামূলক মন্দের চেয়ে ভালো’ (Lesser Evil) এবং ‘সত্যের নৈকট্য’-এর ওপর ভিত্তি করে মিত্রতা নির্ধারণ করে।

আজকের প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটি খুব সহজ। যারা আল্লাহ, রাসূল (সা.) এবং পরকালে বিশ্বাস করে (তা তাদের আকিদায় যত ত্রুটিই থাকুক), তারা কি সেই শক্তির চেয়ে বেশি নিকৃষ্ট, যারা প্রকাশ্যে ইসলাম ও মানবতার শত্রু? যারা ফিলিস্তিনে গণহত্যা চালায়, তাদের মিত্রদের হামলায় খুশি হওয়া কি মুমিনের পরিচায়ক হতে পারে?

ভুল ভাঙার সময় এখনই সৌদি আরব, তুরস্ক বা পাকিস্তান-রাষ্ট্রীয় স্বার্থে হয়তো কৌশলী অবস্থান নিচ্ছে। কিন্তু সাধারণ মুসলিম হিসেবে আমাদের অবস্থান হতে হবে নীতিগত। শিয়া-সুন্নি বিতর্ক জ্ঞানগত আলোচনার টেবিলে থাকুক, কিন্তু যখন বহিঃশত্রুর কামানের গোলা ধেয়ে আসে, তখন সেই বিতর্ক সামনে আনা বোকামি ছাড়া কিছু নয়।

আমাদের মনে রাখতে হবে, ঘরের বিবাদ মিটানো যায়, কিন্তু ঘর আগুনে পুড়ে গেলে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। ইরানের ওপর আঘাত শুধু একটি শিয়া রাষ্ট্রের ওপর আঘাত নয়, এটি এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে মুসলিম শক্তিকে দুর্বল করার এক দীর্ঘমেয়াদী নীল নকশা।

তাই আনন্দ নয়, আজ প্রয়োজন গভীর চিন্তার। প্রয়োজন বিভেদ ভুলে সেই ‘কমন গ্রাউন্ড’ খুঁজে বের করার, যেখানে দাঁড়িয়ে আমরা বলতে পারি-মাজলুমের ওপর আগ্রাসন আমরা মানি না। সূরা আর-রূমের শিক্ষা আজ আমাদের কানে কানে বলে যাচ্ছে- সাময়িক পরাজয়ে হতাশ হতে নেই, কিন্তু সত্যের পক্ষের শক্তিতে ফাটল ধরলে বিজয় অনেক দূরে সরে যায়। আসুন, আত্মঘাতী উল্লাস বন্ধ করি। ইরান ভুল করলে তার সমালোচনা হবে, কিন্তু তাকে ধ্বংস করতে আসা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পক্ষে সাফাই গাওয়া কখনোই ঈমানি দায়িত্ব হতে পারে না। এটিই এখনকার সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

আরো পড়ুন

ন্যায়ের পথে ঐতিহাসিক অগ্রযাত্রা: জাতিসংঘের আদালতে আজ শুরু রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। অবশেষে আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার দরজায় পৌঁছেছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আর্তনাদ। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত গণহত্যার অভিযোগে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) আজ সোমবার থেকে শুরু হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ বিচার কার্যক্রম।

রুদ্ধশ্বাস এল ক্লাসিকোতে সুপার কাপ জিতে ইতিহাস গড়ল বার্সা

ফুটবল মানেই আবেগ, উত্তেজনা আর নাটক-আর যখন লড়াইটা হয় বার্সেলোনা বনাম রিয়াল মাদ্রিদ, তখন তা রূপ নেয় বৈশ্বিক মহাযুদ্ধে। ঠিক তেমনই এক শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনালে স্প্যানিশ সুপার কাপের মঞ্চে আবারও চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদকে ৩–২ গোলে হারিয়ে শিরোপা ঘরে তুলেছে বার্সেলোনা।

বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ? পাকিস্তান–তুরস্ক–সৌদি আরবের সম্ভাব্য যৌথ প্রতিরক্ষা বলয়

বিশ্ব রাজনীতির অস্থির বাস্তবতায় বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে সাম্প্রতিক কিছু আন্তর্জাতিক রিপোর্ট। মুসলিম বিশ্বের তিন প্রভাবশালী দেশ-পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরব- নিজেদের মধ্যে একটি সমন্বিত সামরিক ও প্রতিরক্ষা কাঠামো গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। এই উদ্যোগকে ঘিরে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মহলে ইতোমধ্যেই আলোচনার ঝড় উঠেছে, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে অনেকে আখ্যা দিচ্ছেন সম্ভাব্য ‘মুসলিম ন্যাটো’ হিসেবে।
- Advertisement -spot_img

আরও প্রবন্ধ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ প্রবন্ধ