কবর জিয়ারত কী?
সংজ্ঞা
কবর জিয়ারত হলো মৃত ব্যক্তির কবর দর্শনের ইবাদতমূলক কাজ। এটি মুসলিম সমাজে নৈতিক শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক সচেতনতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
ইসলামে কবর জিয়ারতের গুরুত্ব
মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, তোমরা যিয়ারত কর। যাতে ঐ যিয়ারত তোমাদেরকে কল্যাণ (পরকাল-চিন্তা) স্মরণ করিয়ে দেয়। (সহীহ, মুসনাদে আহমদ)
কবর জিয়ারতের মূল উদ্দেশ্য
- মৃত্যুর পর জীবন স্মরণ: মৃত্যুর বাস্তবতা ও পরকালের গুরুত্ব উপলব্ধি।
- মৃত ব্যক্তির জন্য সালাম পেশ: মৃত ব্যক্তির জন্য আল্লাহর কাছে শান্তির দোয়া করা।
- আল্লাহর ভয় ও সতর্কতা বৃদ্ধি: নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সতর্কতা বাড়ানো।
- নৈতিক শিক্ষা গ্রহণ: কবর দর্শন মানুষের আচরণ ও জীবনধারায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে অন্তরে ভয়ের সৃষ্টি করে।
জিয়ারতের নিয়ম
- কবরের পাশে গিয়ে প্রথমে বলবেন এরপর নীচের উল্লেখিত দোয়া পরবেন।
- এরপর দুই হাত উঠাবেন।
- ইসমে আযম পরবেন।
- এরপর দরুদ পরবেন।
- এরপর জানাজার দোয়া পড়তে পারেন অথবা সেই মৃত ব্যক্তির ক্ষমা জন্য চোখের পানি ফেলে আল্লাহর কাছে আকুল কণ্ঠে আর্তনাদ করতে পারেন। (আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ)
কবর জিয়ারতের দোয়া
আরবি
السلام عليكم أهل الديار من المؤمنين والمسلمين وإنا إن شاء الله بكم للاحقون نسأل الله لنا ولكم العافية
কবর জিয়ারতের দোয়া বাংলা উচ্চারণ
আসসালামু আলাইকুম আহলাদ্দিয়া-রি মিনাল মু’মিনীনা অলমুসলিমীন, অইন্না ইনশা-আল্লা-হু বিকুম লালা-হিকূন, নাসআলুল্লা-হা লানা অলাকুমুল আ-ফিয়াহ।
বাংলা অর্থ
তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক, হে কবরবাসী মুমিন ও মুসলিমগণ! আমরাও -আল্লাহ যদি চান- তোমাদের সঙ্গে অবশ্যই মিলিত হব। আল্লাহর নিকট আমাদের ও তোমাদের জন্য নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি। (মুসলিম ২/৬৭১)
অন্য আরো কিছু দোয়া
১.
السَّلامُ عَلَيْكُمْ اهْلَ دَارِ قَوْمٍ مُؤمِنينَ وأَتَاكُمْ ما تُوعَدُونَ غَداً مُؤَجَّلُونَ وإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ بِكُمْ لاحِقُونَ
উচ্চারণ:- আস্সালামু আলাইকুম আহলা দারি কাওমিম মুমিনীন, অ আতাকুম মা তূআদুনা গাদাম মুআজ্জালূন। অইন্না ইনশা-আল্লা-হু বিকুম লাহিকুন।
অর্থ:- তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক হে মুমিন কবরবাসী কওম! তোমাদের নিকট তা চলে এসেছে যার প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে দেওয়া হচ্ছিল, আগামী কাল (কিয়ামত) পর্যন্ত (বিস্তারিত পুরস্কার ও শাস্তি) বিলম্বিত করা হয়েছে। আর আল্লাহ চাইলে আমরাও তোমাদেরই সাথে মিলিত হব। (মুসলিম ১৭৪নং)
২.
السلام على أهل الديار من المؤمنين والمسلمين، ويرحم الله المستقدمين منا والمستأخرين وانا إن شاء الله بكم للاحقون
উচ্চারণ:- আসসালা-মু আলা আহলিদ্দিয়া-রি মিনাল মু’মিনীনা অলমুসলিমীন, অয়্যারহামুল্লা-হুল মুস্তাকদিমীনা মিন্না অলমুস্তা’খিরীন, অইন্না ইনশাল্লা-হু বিকুম লালা-হিকুন।
অর্থ- মুমিন ও মুসলিম কবরবাসীগণের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। যারা আগে এসেছে এবং যারা পরে আসবে তাদের উপর আল্লাহ রহম করেন। এবং আমরাও আল্লাহ চাহেন তো অবশ্যই তোমাদের সাথে মিলিত হব। (মুসলিম ৯৭৮নং)
৩.
السَّلامُ عَلَيْكُمْ دَارَ قَوْمٍ مُؤمِنينَ وإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ بِكُمْ لاحِقُونَ
উচ্চারণ:- আস্সালামু আলাইকুম দারা কাওমিম মু’মিনীন, অইন্না ইন শাআল্লাহু বিকুম লা-হিকুন।
অর্থ: তোমাদের উপর শান্তি বর্ষণ হোক হে মুমিন কবরবাসী দল। আল্লাহ চাইলে আমরা তোমাদেরই সাথে মিলিত হব। (মুসলিম ২৪৯, মালেক ১/৪৯-৫০, নাসাঈ ১৫০, ইবনে মাজাহ ৪৩০৬, আহমাদ ২/৩০০, ৪০৮ প্রমুখ।
কবর জিয়ারতের ফজিলত
ইসলাম কবর জিয়ারত একটি সুন্নত নির্দেশিত নফল ইবাদত। মহানবী মুহাম্মদ (ﷺ) নিজেও মাঝে মাঝে কবর যিয়ারত করতেন। এই ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য হলো আখেরাত ও মৃত্যুর স্মরণ এবং মৃত ব্যক্তিদের জন্য সালাম ও দোয়া পাঠ করা।
কবর যিয়ারতের মাধ্যমে একজন মুসলিম মৃত্যুর বাস্তবতা ও পরকাল সম্পর্কে সচেতন হয়। এটি শুধুমাত্র মৃতদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যম নয়, বরং জীবনের নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতাকে শক্তিশালী করার সুযোগও দেয়।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উম্মাতকে কবর যিয়ারত করতে উৎসাহ দিয়েছেন এবং এটি আখেরাতের স্মরণ হিসেবে গুরুত্ব বহন করে। সুন্নাহ অনুযায়ী, কবরস্থানে প্রবেশের সময় মৃতদের জন্য সালাম দেওয়া এবং দোয়া করা গুরুত্বপূর্ণ।
হাদীস সূত্র:
- বুখারী, আস-সহীহ ১/৪৩০
- মুসলিম, আস-সহীহ ১/২১৮, ২/৬৬৯-৬৭২, ৩/১৫৬৩
কবর জিয়ারতের ভুল ও সতর্কতা
কবরের পাশে গিয়ে মৃত ব্যক্তির কাছে চাওয়া, কবরকে সিজদা করা বা তাওয়াফ করা, কবরের কাছে নির্দিষ্ট ইবাদত (যেমন: সূরা ফাতিহা, ইখলাস,তাকাছুর ইত্যাদি নির্দিষ্ট সূরা পড়া, নির্দিষ্ট সংখ্যায় দোয়া করা), কবরের মাটি বা দেয়াল স্পর্শ করে বরকত খোঁজা, এবং কবরের কাছে গিয়ে বাড়াবাড়ি করা, যা শিরক বা বিদআতের দিকে নিয়ে যায়। যেমন:
- শিরকি কাজ: মৃত ব্যক্তির কাছে চাওয়া, তাদের কাছে সাহায্য চাওয়া বা তাদের সিজদা করা- এগুলো শিরক।
- বিদআতি কাজ: কবরের কাছে কুরআন তিলাওয়াত করা, নির্দিষ্ট সূরা পড়া বাধ্যতামূলক মনে করা বিদআত। কবরের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করা হারাম।
- কবরের উপর বসা: রাসুল (সাঃ) বলেন: তোমাদের কেউ কবরের উপর বসবে, এর চেয়ে উত্তম হলো একটা আগুনের টুকরার উপর বসা। আর এ আগুন যেন তার কাপড় পুড়িয়ে দিয়ে চামড়া পর্যন্ত জ্বালিয়ে দেয়। (মুসলিম: ৯৭১)।
- বরকত খোঁজার ভুল: কবর স্পর্শ করা, কবরের দেয়াল বা মাটির সাথে গা ঘেঁষে বরকত নেওয়ার চেষ্টা করা।
- তাওয়াফ করা: কবরের চারপাশে তাওয়াফ করা।
- জবেহ করা: কবরের কাছে জবেহ করা।