জুলাই আন্দোলনের সাহসী গল্প নিয়ে বিশ্বমঞ্চে ‘স্কারলেট ইকোস’
২০২৪ সালের জুলাই মাস- বাংলাদেশের ইতিহাসে এক সাহস, প্রতিবাদ ও আত্মত্যাগে ভরা সময়। ছাত্র-জনতার অদম্য আন্দোলন, রক্তিম রাজপথ আর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার সেই দিনগুলো এবার তুলে ধরা হচ্ছে বিশ্বদরবারে। ফিনল্যান্ডের খ্যাতিমান টেম্পেয়ার চলচ্চিত্র উৎসবের ৫৬তম আসরের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘স্কারলেট ইকোস’ (বাংলা নাম: রক্তিম)।
আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে এটি বাংলাদেশের জন্য এক গর্বের অর্জন ও ঐতিহাসিক মাইলফলক।
৭ হাজার চলচ্চিত্রের ভিড়ে একমাত্র বাংলাদেশ
বিশ্বের ৪৪টি দেশ থেকে জমা পড়া ৭ হাজার ১২৫টি চলচ্চিত্র থেকে বাছাই করে মাত্র ৬০টি চলচ্চিত্র চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েছে। এই সম্মানজনক তালিকায় একমাত্র বাংলাদেশি চলচ্চিত্র হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে তরুণ নির্মাতা হেমন্ত সাদীক পরিচালিত ‘স্কারলেট ইকোস’।
টেম্পেয়ার চলচ্চিত্র উৎসব শুধু একটি উৎসব নয়- এটি অস্কার, বাফটা এবং ইউরোপিয়ান ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড কোয়ালিফাইং ফেস্টিভ্যাল হিসেবে স্বীকৃত। ফলে এখানে নির্বাচিত হওয়া মানেই বিশ্ব চলচ্চিত্রের এলিট প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ।
স্মার্টফোনে ধারণ করা বাস্তবতার শক্তিশালী ভাষ্য
‘স্কারলেট ইকোস’ একটি ডকু-ফিকশনধর্মী চলচ্চিত্র। এর সবচেয়ে বড় শক্তি- এতে ব্যবহার করা হয়েছে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের বাস্তব ফুটেজ। সিনেমার প্রায় ৮০ শতাংশ দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে আন্দোলনের সময়, একটি মাত্র স্মার্টফোনে।
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র আদনান, একজন আলোকচিত্রী ও সিঙ্গেল ফাদার। তার ক্যামেরার লেন্সে ধরা পড়ে ঢাকার রাজপথের অনিশ্চয়তা, ভয়, আশা আর মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। বাস্তব আর কল্পনার মেলবন্ধনে নির্মিত এই সিনেমা দর্শককে নিয়ে যায় আন্দোলনের একেবারে ভেতরে।
পারিশ্রমিক ছাড়াই নির্মাণ, বিশ্বাস আর ভালোবাসার জয়
চলচ্চিত্রটির প্রযোজক দিলরুবা হোসেন দোয়েল জানান, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ছাড়াই সম্পূর্ণ টিমের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সিনেমাটি নির্মিত হয়েছে। পরিচালক থেকে কলাকুশলী-সবাই কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই কাজ করেছেন।
এই সিনেমা প্রমাণ করে, বড় বাজেট নয়- বিশ্বাস, দায়বদ্ধতা আর সাহসই ভালো সিনেমার মূল শক্তি।
শহীদ আলোকচিত্রী তাহির জামান প্রিয়’র প্রতি শ্রদ্ধা
‘স্কারলেট ইকোস’ উৎসর্গ করা হয়েছে শহীদ আলোকচিত্রী তাহির জামান প্রিয়-এর স্মৃতির প্রতি। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় সায়েন্স ল্যাব এলাকায় পুলিশের গুলিতে নিহত হন তিনি।
তার সাহস, পেশাগত দায়বদ্ধতা এবং সত্য তুলে ধরার সংগ্রামকে স্মরণ করতেই এই চলচ্চিত্র নির্মাণ। এটি শুধু একটি সিনেমা নয়- এটি একজন শহীদের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার আন্তর্জাতিক ভাষ্য।
ফিনল্যান্ডে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার
আগামী ৪ থেকে ৮ মার্চ ফিনল্যান্ডের টেম্পেয়ার শহরে অনুষ্ঠিত হবে উৎসবটির ৫৬তম আসর। সেখানেই হবে ‘স্কারলেট ইকোস’-এর ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার।
১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই উৎসবটি ক্লেরমন্ট ফেরাঁন্দের মতো বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত।
বাংলাদেশের গল্প, বিশ্বের মঞ্চে
জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে নির্মিত ‘স্কারলেট ইকোস’ কেবল একটি চলচ্চিত্র নয়- এটি বাংলাদেশের রাজপথের লড়াইয়ের আন্তর্জাতিক দলিল। এই অর্জনের মাধ্যমে আবারও প্রমাণ হলো, সাহসী গল্প আর সত্যনিষ্ঠ নির্মাণ বিশ্ব জয় করতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এটি নিঃসন্দেহে এক গুড নিউজ, এক গর্বের মুহূর্ত।





