সূরা ইখলাস পরিচিতি
সূরা ইখলাস একত্ববাদ সূরা হিসেবে পরিচিত। এটি কুরআনের ১১২তম সূরা, যার আয়াত সংখ্যা মাত্র ৪। এই সূরাটি মূলত তাওহিদ বা আল্লাহর একত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শানে নুযূল | surah ikhlas sane nuzul
বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে যে, মুশরিকরা নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রশ্ন করেছিল, “আপনার রব কে? তিনি কেমন?” এই প্রশ্নের প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা সূরা অবতীর্ণ করেছেন। [তিরমিজি: ৩৩৬৪, মুসনাদে আহমাদ: ৫/১৩৪, মুস্তাদরাক হাকিম: ২/৫৪০]।
কিছু বর্ণনায় আরও বলা হয়েছে, মুশরিকরা প্রশ্ন করেছিল, “আল্লাহ তা’আলা কি ধরনের বস্তু দিয়ে তৈরি- স্বর্ণ, রৌপ্য, নাকি অন্য কিছু?” এই প্রশ্নের জবাবেও একই সূরা নাজিল হয়। [আস-সুনানুল কুবরা লিন নাসায়ী: ৬/৩৭০, তাবরানী: মুজামুল আওসাত: ৩/৯৬, মুসনাদে আবি ইয়া’লা: ৬/১৮৩, নং ৩৪৬৮]।
সূরা ইখলাসের আরবি, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ
আরবি | surah ikhlas arbi
قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ ﴿١
اللَّهُ الصَّمَدُ ﴿٢
لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ ﴿٣
وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ ﴿٤
সূরা ইখলাস বাংলা উচ্চারণ | surah ikhlas bangla uccharon
- কুল হুয়াল্লাহু আহাদ।
- আল্লাহুস সামাদ।
- লাম ইয়ালিদ ওয়ালাম ইউলাদ।
- ওয়ালাম ইয়াকুল লাহু কুফুয়ুন আহাদ।
বাংলা অর্থ | surah ikhlas bangla meaning
- বলুন, তিনি আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়।
- তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন।
- তিনি কাওকে জন্ম দেননি, কারও কাছ থেকে জন্মগ্রহণও করেননি।
- এবং তাঁর সমকক্ষ বা সমতুল্য কেউ নেই।
সূরা ইখলাসের ফজিলত | surah ikhlas er fojilot
কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমতুল্য
কুরআন হলো আল্লাহর পবিত্র কালাম। প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য এবং প্রতিটি সূরা বরকতময় ও মর্যাদাপূর্ণ। আল্লাহর কালাম হিসেবে কুরআনের মর্যাদা সমান হলেও, ভাব বা মর্মের দিক থেকে কিছু আয়াত বা সূরার ফযিলত অন্যদের তুলনায় বেশি।
এর মধ্যে একটি বিশেষ মর্যাদার সূরা হলো সূরা ইখলাস। এই ছোট্ট সূরাটিতে আল্লাহ নিজেকে সংক্ষেপে, কিন্তু পরিপূর্ণভাবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। সূরার মূল বক্তব্য হলো আল্লাহ এক, অমর, এবং অনন্য।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই সূরার ফযিলত ব্যাখ্যা করে বলেছেন:
“ঐ সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ, নিশ্চয় এটি (সূরা ইখলাস) কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমতুল্য।”
[সাহিহ বুখারি, কিতাবুল তাফসীর, باب فضل قل هو الله أحد]
কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমতুল্য পাঠ
আরেকটি হাদিসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও ব্যাখ্যা করেছেন:
‘‘তোমাদের কেউ কি প্রতি রাতে কুরআনের এক তৃতীয়াংশ পড়তে অক্ষম?’’
সাহাবিরা প্রশ্ন করলেন: “এক তৃতীয়াংশ কীভাবে পড়বে?”
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: ‘‘(قل هو الله أحد) এক তৃতীয়াংশের সমান।’’
[সাহিহ মুসলিম, কিতাবুল তাফসীর, باب فضل قراءة قل هو الله أحد, নং: ১৯২২]
এই হাদিসগুলো স্পষ্টভাবে দেখায় যে, সূরা ইখলাসের সংক্ষিপ্ত অথচ পূর্ণাঙ্গ বাণী আল্লাহর একত্ব স্বীকারের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। প্রতিদিন সূরা ইখলাস পাঠ করা মুমিনের জন্য বড় ফযিলত এবং নেক আমলের বৃদ্ধি করে।
অতএব, সূরা ইখলাস পড়া শুধুমাত্র আল্লাহর একত্ব স্বীকারের শিক্ষা নয়, এটি কুরআনের গুরুত্বপূর্ণ অংশের সমান বরকত বহন করে। প্রতিদিন এটি পাঠ করা মুমিনের জন্য অশেষ ফযিলত এবং নেক আমল বৃদ্ধি করে।
সূরা ইখলাস: কুরআনের এক তৃতীয়াংশের মর্ম ও ব্যাখ্যা
কিছু সময় হাদীসের অর্থকে ঠিকমত না বুঝে বা অতিরিক্ত সংযোজনের মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে সম্পৃক্ত করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, “এক তৃতীয়াংশের সমান” হওয়া এবং তিনবার পড়লে পূর্ণ কুরআনের ছওয়াব পাওয়া—এই ব্যাখ্যা সরাসরি হাদিসে নেই।
উলামায়ে কেরাম হাদীসের মর্ম ব্যাখ্যা করেছেন। তাদের মতে, কুরআনের বিষয়বস্তু মূলত তিনটি ভাগে বিভক্ত:
- আহকাম – জীবন বিধান ও নৈতিক নির্দেশনা
- আখবার – সংবাদ ও ঘটনার বিবরণ
- তাওহীদ – আল্লাহর একত্ববাদের পরিচয়
সূরা ইখলাসে আল্লাহর একত্ব (তাওহীদ) অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, কিন্তু পরিপূর্ণভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূরাটিকে কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমান হিসেবে ঘোষণা করেছেন। অর্থাৎ, এই সূরার মাধ্যমে কুরআনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলোর একটি- আল্লাহর একত্ব-সম্পূর্ণভাবে বোঝানো হয়েছে।
এই ব্যাখ্যা মুমিনদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয় যে, সংক্ষিপ্ত হলেও তাওহীদ সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জন এবং তা পাঠ করা, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নেক আমল বৃদ্ধিতে অসাধারণ ভূমিকা রাখে। ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী, প্রাগুক্ত অধ্যায়, ৯/৫৯।
ঘুমানোর আগে পড়ার উপকারিতা
সূরা ইখলাস, ফালাক এবং নাস এক সাথে পড়া এবং নিজের শরীরে ফুঁ দেওয়া হচ্ছে ঘুমানোর একটি সুন্নাত আমল যা শয়তানের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করে।
সকাল সন্ধ্যায় সূরা ইখলাস পড়া
প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় এই সূরা ইখলাস, ফালাক এবং নাস তিনবার পড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ । সকাল সন্ধ্যায় এই সূরা গুলো তেলাওয়াত করলে অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকা যায় ।
সূরা ইখলাস মুখস্থ করার কৌশল
- চারটি আয়াত একসাথে ভাঙা-ভাঙা করে মুখস্থ করা
সূরা ইখলাসের আয়াতগুলো ছোট ছোট অংশে ভাগ করে মুখস্থ করা যায়। এর ফলে মুখস্থ করা সহজ হয়। - ছোট ছোট গল্প বা ছড়া দিয়ে শিশুদের শেখানো
শিশুদের শেখানোর জন্য সূরা ইখলাসের আয়াতগুলো ছোট ছোট গল্প বা ছড়ার মাধ্যমে শেখানো যেতে পারে। - অডিও শুনে অনুশীলন
অডিও শুনে অনুশীলন করার মাধ্যমে দ্রুত মুখস্থ করা সম্ভব।
সূরায় ব্যবহৃত ‘বলুন’ শব্দটি মূলত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, কারণ তিনি ছিলেন প্রশ্নের প্রাপক। তবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তিরোধানের পর, এই নির্দেশনা সকল মুমিনের জন্য প্রযোজ্য হয়ে যায়। অর্থাৎ, যে জবাব নবীকে দিতে বলা হয়েছিল, তা প্রত্যেক মুমিনকেও উচ্চারণ করতে হবে।
এইভাবে সূরা আমাদের শেখায় যে, আল্লাহ তা’আলা অসীম, অনন্ত, এবং আমাদের সকলের রব। মুমিনদের জন্য এটি একটি শক্তিশালী শিক্ষা যে, আল্লাহর গুণাবলী এবং পবিত্রতা সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান অর্জন করা ও তা অন্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়া আমাদের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব।
সূরা ইখলাস সম্পর্কিত FAQ
১. সূরা ইখলাসের শিক্ষা কী?
সূরা ইখলাস মূলত একত্ববাদ (তাওহিদ) এবং আল্লাহর একত্বের শিক্ষা দেয়। এটি আমাদের শেখায়, আল্লাহ একমাত্র, অদ্বিতীয়, এবং কোনো সমকক্ষ নেই। মুসলিমদের বিশ্বাস, প্রার্থনা এবং জীবনের প্রতিটি কর্মকাণ্ড আল্লাহর একত্বের উপর ভিত্তি করে হওয়া উচিত।
২. ইখলাস শব্দের অর্থ কী?
“ইখলাস” শব্দের অর্থ হলো খাঁটি বিশ্বাস বা নিখাদ একত্ববাদ। এটি বিশ্বাসের খাঁটি রূপ বোঝায়, যেখানে কোনো শরিক বা ভাগ নেই।
৩. সূরা ইখলাস এর আয়াত সংখ্যা কত?
সূরা ইখলাসে মোট ৪টি আয়াত রয়েছে।
৪. “লাম ইয়ালিদ” এর অর্থ কী?
“লাম ইয়ালিদ” অর্থ হলো, “তিনি (আল্লাহ) কাউকে জন্ম দেননি”। এটি আল্লাহর অজন্ম এবং অপরিসীম অস্তিত্বকে নির্দেশ করে।
৫. সূরা ইখলাসের শানে নুযুল কি?
সূরা ইখলাস মক্কী সূরা, অর্থাৎ এটি মক্কায় নাযিল হয়েছে। এটি মুসলমানদের আল্লাহর একত্ব সম্পর্কে সচেতন করার জন্য অবতীর্ণ হয়েছে।
৬. আল্লাহর পরিচয় নিয়ে নাযিলকৃত সূরা কোনটি?
সূরা ইখলাসই প্রধানত আল্লাহর পরিচয় এবং তার একত্বের ব্যাখ্যা নিয়ে নাযিল হয়েছে।
৭. ইখলাসের বিপরীত কোনটি?
ইখলাসের বিপরীত হলো শিরক বা আল্লাহর সাথে সহচরী ধরা, অর্থাৎ আল্লাহকে একত্বে না মানা।
৮. সূরা ইখলাসের তাফসীর কী?
সূরা ইখলাসের তাফসীর অনুযায়ী:
- আল্লাহ এক, অনন্য ও চিরস্থায়ী।
- তিনি জন্ম দেয়নি, জন্মায়নি।
- তার সমকক্ষ বা কোনো অংশীদার নেই।
- এই সূরা পড়লে, সৃষ্টির প্রতি আল্লাহর একত্বের পূর্ণ বোঝাপড়া হয়।
৯. আল্লাহ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ সূরা কোনটি?
সূরা ইখলাসকে আল্লাহ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ সূরা বলা হয়, কারণ এটি একমাত্র আল্লাহর একত্ব, জন্ম ও অব্যয়তা নিয়ে পুরোপুরি ব্যাখ্যা প্রদান করে।
১০. কোরআন শরীফের দ্বিতীয় সূরার নাম কি?
কোরআনের দ্বিতীয় সূরার নাম হলো সূরা বাকারাহ।