দীর্ঘ বিরতির পর অবশেষে একটি প্রাণবন্ত, কার্যকর ও বিতর্কমুখর জাতীয় সংসদ পেতে যাচ্ছে দেশ। আগামী ১২ মার্চ সকাল ১১টায় শুরু হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। মো. সাহাবুদ্দিন তার সাংবিধানিক ক্ষমতাবলে এ অধিবেশন আহ্বান করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অধিবেশনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আবারও একটি কার্যকর সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে দৃঢ়ভাবে ফিরছে।
শুরু থেকেই উত্তাপ ও সক্রিয় অংশগ্রহণের আভাস
জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় গঠিত এই সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ ইস্যু, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার অভিযোগ, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, যানজট, গ্যাস সংকট এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনীতির নানা ইস্যু সংসদকে শুরু থেকেই উত্তপ্ত করে তুলতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন-
এবার সংসদ হবে কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং বাস্তব বিতর্ক ও জবাবদিহিতার কেন্দ্রবিন্দু।
নির্বাচনের ফল ও সংসদের শক্ত অবস্থান
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
সংসদের আসনচিত্র:
- বিএনপি জোট: ২১২ আসন
- জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট: ৭৭ আসন
- ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ: ১ আসন
- স্বতন্ত্র: ৭ আসন
বর্তমানে ২৯৬টি আসনের মধ্যে বিএনপির একক আসন সংখ্যা ২০৮।
সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের ফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যেই সংসদ বসার বাধ্যবাধকতা থাকায় সময়সীমা পূরণের আগেই ১২ মার্চ অধিবেশন আহ্বান করা হয়েছে।
স্পিকার নির্বাচন ও প্রথম দিনের কর্মসূচি
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে—
প্রথম দিনের অধিবেশনে:
- নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন
- শপথ গ্রহণ
- শোক প্রস্তাব
- সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচন
- রাষ্ট্রপতির ভাষণ
- অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ উত্থাপন
তবে জুলাই বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে পূর্ববর্তী সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে কে প্রথম বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন—তা নিয়ে আলোচনা চলছে। সংসদের রেওয়াজ অনুযায়ী সিনিয়র সংসদ সদস্যের মাধ্যমে প্রথম বৈঠক পরিচালনার সম্ভাবনাই বেশি।
দায়িত্বশীল বিরোধী দলের নতুন অধ্যায়
বিরোধী দল হিসেবে সংসদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত জামায়াতে ইসলামী। দলটির সংসদ সদস্যদের ইতোমধ্যে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে—যা বাংলাদেশের সংসদ ইতিহাসে বিরল ঘটনা।
বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন—
“আমরা দায়িত্বশীল বিরোধী দল হিসেবে জনগণের পক্ষে কথা বলব। দেশের স্বার্থে ভালো কাজে সমর্থন দেব, আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেব।”
বিশ্লেষকদের মতে, এবার সংসদে নেগেটিভ রাজনীতির বদলে পজিটিভ ও গঠনমূলক বিরোধিতা দেখা যেতে পারে।
সরকারও প্রস্তুত জবাবদিহিতার জন্য
সরকারি দল বিএনপিও এবার সংসদ বয়কটের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। বিএনপির সংসদ সদস্যদের মতে, এবার সংসদ হবে জনগণের প্রকৃত কণ্ঠস্বর।
নরসিংদী-৫ আসনের এমপি ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুল বলেন-
“এবার সংসদ কোনো পরিবারের গুণগান নয়, জনগণের সমস্যা সমাধানের জায়গা হবে।”
ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী ড. এমএ মুহিতের মতে-
এবার সংসদে আসছেন শিক্ষিত, নবীন ও রাজপথে সক্রিয় মানুষ—ফলে সংসদ হবে প্রাণবন্ত ও কার্যকর।
নতুন সংসদ, নতুন প্রত্যাশা
বিশ্লেষকদের অভিমত—
- এবার সংসদ সদস্যদের বড় অংশ নবীন ও উচ্চশিক্ষিত
- ব্যবসায়ীদের আধিক্য কম
- বিরোধী দল প্রশিক্ষিত ও প্রস্তুত
- সংসদ বর্জনের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা
সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ সংসদ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী অধ্যায়।





