শনিবার, জানুয়ারি ১০, ২০২৬

ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধান: ক্রেমলিনে পুতিন-ট্রাম্প আলোচনায় অগ্রগতি ও প্রতিকূলতা

বহুল পঠিত

মার্কিন আলোচকদের সঙ্গে মঙ্গলবার ক্রেমলিনে পাঁচ ঘণ্টার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে। এই বৈঠকে আলোচনার মূল বিষয় ছিল ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি এবং সম্ভাব্য শান্তি প্রক্রিয়া।

পুতিনের সহকারী ইউরি উশাকভ বলেন, মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে বৈঠকটি “গঠনমূলক” ছিল, তবে “সামনে আরও অনেক কাজ বাকি”।

পুতিন আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, “যদি ইউরোপ আমাদের সাথে যুদ্ধ করতে চায়, আমরা তা করতে প্রস্তুত।” তিনি যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া খসড়া শান্তি আলোচনায় ইউরোপীয়দের দাবিগুলো অগ্রহণযোগ্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

মার্কিন প্রতিনিধি দলের অবস্থান

গত দুই সপ্তাহ ধরে কিয়েভের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা শেষ করে মার্কিন দূতরা মস্কো গিয়েছেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভোলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, “এখন আগের চেয়ে বেশি” যুদ্ধ শেষ করার সুযোগ রয়েছে, তবে প্রস্তাবগুলো নিয়ে এখনও কাজ করতে হবে। তিনি আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে একটি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “আজকের আলোচনার উপর সবকিছু নির্ভর করছে।”

নভেম্বরে ২৮ দফা শান্তি পরিকল্পনার পর কিয়েভের প্রতিনিধিরা মার্কিন আলোচকদের সাথে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন। এই আলোচনায় উইটকফ, কুশনার ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও উপস্থিত ছিলেন।

ইউক্রেন ও রাশিয়ার মূল দ্বন্দ্ব

রাশিয়ার দাবি হলো পূর্ব ইউক্রেনের কিছু অঞ্চল কার্যত তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন। অন্যদিকে, ইউক্রেন এবং ইউরোপীয় মিত্ররা এই দাবির বিরোধিতা করছে। কিয়েভ জোর দিয়ে বলেছে, দোনেৎস্ক ও লুহানস্ককে রাশিয়ার এলাকা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে না।

জেলেনস্কি বলেন, “কোনও সহজ সমাধান নেই। আমাদের যুদ্ধ এমনভাবে শেষ করতে হবে যাতে এক বছরের মধ্যে রাশিয়া পুনরায় আগ্রাসন করতে না পারে।” তিনি উল্লেখ করেন, নেটো সদস্যপদসহ স্পষ্ট নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চাইবে কিয়েভ, যা দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়া ও ট্রাম্প প্রত্যাখ্যান করেছেন।

যুদ্ধের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি

মঙ্গলবারও ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী পূর্বাঞ্চলীয় শহর পোকরোভস্কে রাশিয়ান সেনাদের সঙ্গে লড়াই চালাচ্ছিল। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তাদের সৈন্যরা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ওই শহরে পতাকা ধরেছে। তবে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তারা শহরের উত্তর অংশ নিয়ন্ত্রণে রেখেছে এবং রাশিয়ান ইউনিটগুলো ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।

উত্তর-পূর্ব ইউক্রেনের ভোভচানস্ক শহরেও রাশিয়ার দাবির বিরোধিতা করেছে কিয়েভ। কুপিয়ানসের অবস্থান তাদের জন্য “উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী” হয়েছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২৪শে ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার আক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে ১৪,০০০-এর বেশি বেসামরিক নাগরিক এবং হাজার হাজার সৈন্য নিহত বা আহত হয়েছেন। ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় স্কুল, হাসপাতাল এবং আবাসিক ভবনগুলো ধ্বংস বা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

সোমবার ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে জেলেনস্কির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় ইউরোপীয় নেতারা ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন। ম্যাক্রোঁ বলেন, “চূড়ান্ত পরিকল্পনা এখনও নেই; এটি কেবল ইউক্রেন এবং ইউরোপের মতামতের ভিত্তিতে অর্জন সম্ভব।”

হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, প্রস্তাবগুলো “অনেক পরিমার্জিত” করা হয়েছে, যদিও বিস্তারিত নিশ্চিত হয়নি।

বৈঠকের ফলাফল ও ভবিষ্যৎ কৌশল

ক্রেমলিন বৈঠকের পরে বোঝা যাচ্ছে, এখনও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দ্বন্দ্ব থেকে গেছে – যেমন রাশিয়ার আংশিক নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলগুলোর সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ। মার্কিন পক্ষের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, আলোচনা ইতিবাচক ছিল, তবে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আরও সংলাপের প্রয়োজন।

জেলেনস্কি স্পষ্ট করেছেন, যুদ্ধ বন্ধের যে সমাধান হবে, সেটি দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা ও ইউক্রেনের সার্বভৌমত্বকে অক্ষুণ্ণ রাখবে।

আরো পড়ুন

ট্রাম্পের ‘ড্রিম মিলিটারি’ মিশন: ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের রেকর্ড প্রতিরক্ষা বাজেট প্রস্তাব

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ইতিহাসে এক অভাবনীয় এবং নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২০২৭ অর্থ বছরের জন্য তিনি রেকর্ড ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেটের প্রস্তাব...

ডেলসি রদ্রিগেজের অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ

দক্ষিণ আমেরিকায় রাজনৈতিক ভূমিকম্প: মাদুরোর পতন ও নতুন নেতৃত্ব ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বিশাল ধাক্কা লেগেছে। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা নেতা এখন অপসারিত। নিকোলাস মাদুরোকে...

গাজায় মানবিক সেবার ধারা অব্যাহত রাখার আহ্বান জাতিসংঘের

গাজার সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফেরাতে এবং মানবিক সংকট দূর করতে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। মানবিক সংস্থাগুলোর ওপর আরোপিত সাম্প্রতিক বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করে জীবনরক্ষাকারী সহায়তা পৌঁছানোর পথ সুগম করতে তিনি ইসরায়েলের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। শান্তির এই যাত্রায় সংঘাত নয়, বরং মানুষের জীবন বাঁচানোই এখন বিশ্বের প্রধান অগ্রাধিকার।
- Advertisement -spot_img

আরও প্রবন্ধ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ প্রবন্ধ