ডেঙ্গু জ্বর: কারণ ও পরিচয়
ডেঙ্গু একটি ভাইরাল রোগ যা এডিস মশা দ্বারা ছড়ায়। এই রোগ ডেঙ্গু ভাইরাসের সংক্রমণের ফলে হয়। এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলা কামড়ায়, বিশেষ করে সকাল ও বিকেলে। বিশ্বের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে এই রোগ বেশি দেখা যায়। বাংলাদেশে বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ে। চার ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাস রয়েছে: ডিইএন-১, ডিইএন-২, ডিইএন-৩ এবং ডিইএন-৪। একবার এক ধরনের ভাইরাসে আক্রান্ত হলে সেই ধরনের বিরুদ্ধে আপনি আজীবন প্রতিরোধ ক্ষমতা পান। তবে অন্য তিন ধরনের ভাইরাস থেকে আপনি আক্রান্ত হতে পারেন। ডেঙ্গু জ্বর সাধারণত সাত থেকে দশ দিনের মধ্যে সেরে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি জটিল আকার ধারণ করতে পারে। জটিল ডেঙ্গু জ্বরে রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হতে পারে। তাই প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ডেঙ্গু জ্বরের প্রাথমিক লক্ষণ
ডেঙ্গু জ্বরের প্রাথমিক লক্ষণগুলি সাধারণত সংক্রমণের ৪ থেকে ৭ দিন পরে দেখা দেয়। উচ্চ জ্বর ডেঙ্গুর অন্যতম প্রধান লক্ষণ। এই জ্বর সাধারণত ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠতে পারে। মাথাব্যথা, বিশেষ করে কপালের পিছনে ব্যথা অনুভূত হয়। চোখের পেছনে ব্যথা হওয়া আরেকটি সাধারণ উপসর্গ। শরীরে ব্যথা ও মাংসপেশীতে ব্যথা অনুভব হয়। জয়েন্টে ব্যথার কারণে একে “ব্রেক-বোন ফিভার”ও বলা হয়। ত্বকে লাল ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। এই ফুসকুড়ি শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ক্লান্তি ও দুর্বলতা অনুভব করা যায়। খাবারে অরুচি এবং স্বাদ হারানো হতে পারে। বমি বমি ভাব ও পেটে ব্যথা অনুভব হতে পারে। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ডায়রিয়া হতে পারে। এই লক্ষণগুলি সাধারণত ২ থেকে ৭ দিন স্থায়ী হয়। যদি লক্ষণগুলি তীব্র হয় বা জটিলতা দেখা দেয়, তবে অবিলম্বে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
ডেঙ্গু জ্বরের জটিলতা ও বিপদজ্জনক লক্ষণ
ডেঙ্গু জ্বরের জটিলতা খুবই আশঙ্কাজনক হতে পারে। ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার (ডিএইচএফ) একটি গুরুতর অবস্থা। এই অবস্থায় রক্তক্ষরণ হতে পারে। ডেঙ্গু শক সিনড্রোম (ডিএসএস) আরেকটি জটিলতা যা প্রাণঘাতী হতে পারে। তীব্র পেটে ব্যথা জটিলতার একটি লক্ষণ। বারবার বমি হওয়া বিপদজ্জনক উপসর্গ। নাক, মাড়ি বা ত্বক থেকে রক্তক্ষরণ হতে পারে। কালো রঙের পায়খানা হওয়া রক্তক্ষরণের লক্ষণ। শ্বাসকষ্ট ও দ্রুত শ্বাস নেওয়া জটিলতার সংকেত। ত্বকে ফুসকুড়ি বৃদ্ধি পেতে পারে। পেট ফোলা ও যকৃতের আকার বড় হওয়া হতে পারে। রোগী অত্যন্ত দুর্বল ও অস্থির হয়ে পড়তে পারে। প্রচণ্ড তৃষ্ণা ও শুষ্ক মুখ হতে পারে। হাত ও পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া শকের লক্ষণ। চোখের নিচে কালো দাগ পড়তে পারে। মূত্রের পরিমাণ কমে যেতে পারে। এই লক্ষণগুলি দেখা দিলে অবিলম্বে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রয়োজন।
চিকিৎসা ও চিকিৎসকের পরামর্শ
ডেঙ্গু জ্বরের নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই। চিকিৎসা মূলত লক্ষণ উপশমমূলক। বিশ্রাম নেওয়া ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসার অন্যতম ভিত্তি। পর্যাপ্ত পরিমাণে তরল পান করা অত্যন্ত জরুরি। পানি, ফলের রস, লেবু পানি ও নারিকেল পানি পান করুন। জ্বর কমানোর জন্য প্যারাসিটামল সেবন করা যেতে পারে। এসপিরিন বা আইবুপ্রোফেন এড়িয়ে চলুন কারণ এগুলি রক্তক্ষরণ বাড়িয়ে দিতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ গ্রহণ করবেন না। হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হলে ইনট্রাভেনাস ফ্লুইড দেওয়া হয়। রক্তের প্লাটিলেট কমে গেলে প্লাটিলেট ট্রান্সফিউশন প্রয়োজন হতে পারে। রক্তচাপ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হয়। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে প্লাটিলেট সংখ্যা ও হিমোগ্লোবিন পরিমাপ করা হয়। জটিল ডেঙ্গু রোগীদের আইসিইউতে রাখা প্রয়োজন হতে পারে। সুস্থ হওয়ার পরও কয়েক সপ্তাহ দুর্বলতা থাকতে পারে। সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার জন্য ধৈর্য ধরতে হবে।
প্লাটিলেট কমে যাওয়া: কেন এবং কীভাবে বুঝবেন
প্লাটিলেট রক্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যা রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতি মাইক্রোলিটার রক্তে ১.৫ লক্ষ থেকে ৪.৫ লক্ষ প্লাটিলেট থাকে। ডেঙ্গু ভাইরাস অস্থিমজ্জাকে আক্রমণ করে প্লাটিলেট উৎপাদন কমিয়ে দেয়। ভাইরাস রক্তনালীগুলিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে প্লাটিলেট ধ্বংস বাড়িয়ে দেয়। ফলে রক্তে প্লাটিলেটের সংখ্যা দ্রুত কমে যায়। প্লাটিলেট কমে গেলে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। প্লাটিলেট কমে যাওয়ার লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে ত্বকে কালো বা বেগুনি দাগ। নাক, মাড়ি বা ত্বক থেকে রক্তপাত হতে পারে। প্রস্রাবের সাথে রক্ত যেতে পারে। শরীরের বিভিন্ন অংশে অস্বাভাবিক ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে অ্যানিমিয়া হতে পারে। প্লাটিলেট কমে গেলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করিয়ে প্লাটিলেটের সংখ্যা পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
প্লাটিলেট বাড়ানোর ঘরোয়া উপায়
পেপায়া পাতা প্লাটিলেট বাড়ানোর জন্য সবচেয়ে কার্যকর ঘরোয়া উপায়। পেপায়া পাতার রস প্রতিদিন দুইবার খেতে পারেন। গিলয় বা গুডুচি প্লাটিলেট বাড়াতে সাহায্য করে। গিলয়ের কাষ্ঠ পানিতে ফুটিয়ে সেই পানি পান করুন। পেয়ারা ফল ভিটামিন সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে সমৃদ্ধ যা প্লাটিলেট বাড়াতে সাহায্য করে। কিউই ফলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি থাকে যা প্লাটিলেট বাড়াতে সহায়তা করে। আমলকী রক্ত শুদ্ধ করে এবং প্লাটিলেট বাড়াতে সাহায্য করে। ডালিম রস অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে সমৃদ্ধ যা প্লাটিলেট বাড়াতে কার্যকর। পালং শাক ও ব্রোকোলি ফোলেটে সমৃদ্ধ যা প্লাটিলেট উৎপাদনে সাহায্য করে। গাজর, বিট ও টমেটোর রস প্লাটিলেট বাড়াতে সহায়ক। ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডযুক্ত খাবার যেমন তিল, আখরোট ও মাছ খেতে পারেন। পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া প্লাটিলেট বাড়াতে সাহায্য করে। মানসিক চাপ এড়িয়ে চলুন কারণ এটি প্লাটিলেটের উৎপাদন কমিয়ে দেয়। নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করলে রক্ত সঞ্চালন ভালো হয় ও প্লাটিলেট বাড়ে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয়
এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি পরিষ্কার রাখুন। ফুলের টব, টায়ার, বালতি ও অন্যান্য জিনিসে জমা পানি ফেলে দিন। জমে থাকা পানিতে মশার লার্ভা জন্মায়। জলাধার ঢেকে রাখুন যাতে মশা ডিম পাড়তে না পারে। মশারি ব্যবহার করুন বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের জন্য। মশা তাড়ানোর ক্রিম, স্প্রে বা লোশন ব্যবহার করুন। সকাল ও বিকেলে পূর্ণ হাতা জামা পরিধান করুন। জানালা ও দরজায় মশারি বা জাল লাগান। বাড়ির চারপাশে ধূমপান করুন বা মশা তাড়ানোর স্প্রে ব্যবহার করুন। এডিস মশা পরিষ্কার জলে ডিম পাড়ে, তাই জল জমতে দেবেন না। সপ্তাহে অন্তত একবার বাড়ির আশপাশে পানি জমে থাকা স্থান পরিদর্শন করুন। ডেঙ্গু রোগীকে মশারির ভেতরে রাখুন যাতে অন্য মশা রোগ ছড়াতে না পারে। সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনা মেনে চলুন। সচেতনতামূলক প্রচারণায় অংশগ্রহণ করুন এবং অন্যদেরও সচেতন করুন।
প্রশ্নোত্তর
১. ডেঙ্গু জ্বর কী এবং এটি কিভাবে ছড়ায়?
ডেঙ্গু একটি ভাইরাল রোগ যা এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। এডিস মশা ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড়ালে ভাইরাস বহন করে। এরপর মশা সুস্থ ব্যক্তিকে কামড়ালে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলা কামড়ায়, বিশেষ করে সকাল ও বিকেলে।
২. ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণগুলি কী কী?
ডেঙ্গু জ্বরের প্রধান লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে উচ্চ জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীরে ব্যথা, জয়েন্টে ব্যথা, ত্বকে ফুসকুড়ি, ক্লান্তি ও দুর্বলতা। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে বমি বমি ভাব, পেটে ব্যথা ও ডায়রিয়া হতে পারে।
৩. ডেঙ্গু জ্বরে প্লাটিলেট কমে যাওয়ার কারণ কী?
ডেঙ্গু ভাইরাস অস্থিমজ্জাকে আক্রমণ করে প্লাটিলেট উৎপাদন কমিয়ে দেয়। একই সাথে ভাইরাস রক্তনালীগুলিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে প্লাটিলেট ধ্বংস বাড়িয়ে দেয়। ফলে রক্তে প্লাটিলেটের সংখ্যা দ্রুত কমে যায়।
৪. পেপায়া পাতা কীভাবে প্লাটিলেট বাড়াতে সাহায্য করে?
পেপায়া পাতায় এনজাইম পেপেইন ও অন্যান্য ফাইটোকেমিক্যাল থাকে যা অস্থিমজ্জাকে উদ্দীপিত করে প্লাটিলেট উৎপাদন বাড়ায়। এছাড়া এতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে যা প্লাটিলেট ধ্বংস রোধ করে। পেপায়া পাতার রস প্রতিদিন দুইবার খেলে প্লাটিলেট বাড়তে সাহায্য করে।
৫. ডেঙ্গু জ্বরে কী খাবার উপকারী?
ডেঙ্গু জ্বরে পর্যাপ্ত পরিমাণে তরল পান করা উচিত। পানি, ফলের রস, লেবু পানি ও নারিকেল পানি খেতে পারেন। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল যেমন আমলকী, পেয়ারা, কিউই ও কমলা খেতে পারেন। সহজে হজম হয় এমন খাবার যেমন ভাত, ডাল, সবজি ও স্যুপ খান।
৬. ডেঙ্গু জ্বরে কোন খাবার এড়িয়ে চলা উচিত?
ডেঙ্গু জ্বরে তেল-মশলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা উচিত। ফাস্ট ফুড, জাঙ্ক ফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবার খাবেন না। লাল মাংস, অতিরিক্ত চিনি ও ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলুন। মশলাদার খাবার ও অ্যালকোহল পরিহার করুন।
৭. ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসায় কী ধরনের ওষুধ ব্যবহার করা উচিত?
ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসায় জ্বর কমানোর জন্য প্যারাসিটামল সেবন করা যেতে পারে। তবে এসপিরিন বা আইবুপ্রোফেন এড়িয়ে চলুন কারণ এগুলি রক্তক্ষরণ বাড়িয়ে দিতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ গ্রহণ করবেন না।
৮. ডেঙ্গু জ্বর থেকে কীভাবে দ্রুত সেরে ওঠা যায়?
ডেঙ্গু জ্বর থেকে দ্রুত সেরে ওঠার জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন। প্রচুর পরিমাণে তরল পান করুন। পুষ্টিকর খাবার খান ও প্লাটিলেট বাড়ানোর ঘরোয়া উপায় অনুসরণ করুন। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন ও নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করান।
৯. ডেঙ্গু জ্বরের সময় কত পরিমাণ তরল পান করা উচিত?
ডেঙ্গু জ্বরের সময় প্রতিদিন অন্তত ২-৩ লিটার তরল পান করা উচিত। পানি, ফলের রস, লেবু পানি, নারিকেল পানি ও ওআরএস খেতে পারেন। প্রচুর ঘাম হলে বা ডায়রিয়া হলে আরও বেশি পরিমাণে তরল পান করুন।
১০. ডেঙ্গু জ্বরের পর কতদিন পর্যন্ত শরীর দুর্বল থাকতে পারে?
ডেঙ্গু জ্বরের পর সাধারণত ২ থেকে ৪ সপ্তাহ পর্যন্ত শরীর দুর্বল থাকতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এই দুর্বলতা আরও বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে। সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার জন্য ধৈর্য ধরতে হবে ও পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে।
১১. ডেঙ্গু মশা থেকে কীভাবে নিজেকে রক্ষা করবেন?
ডেঙ্গু মশা থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য মশারি ব্যবহার করুন। মশা তাড়ানোর ক্রিম, স্প্রে বা লোশন ব্যবহার করুন। সকাল ও বিকেলে পূর্ণ হাতা জামা পরিধান করুন। জানালা ও দরজায় মশারি বা জাল লাগান ও বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি পরিষ্কার রাখুন।