শুক্রবার, জানুয়ারি ৯, ২০২৬

বিজয়ের নতুন সূর্য, স্মৃতি ও সংগ্রামের অঙ্গীকার

বহুল পঠিত

“পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে, রক্ত লাল রক্ত লাল রক্ত লাল…”- এই অমর পঙক্তির মতোই কুয়াশাচ্ছন্ন এক ডিসেম্বরের ভোরে বাংলার আকাশে উদিত হয়েছিল স্বাধীনতার নতুন সূর্য। উড্ডীন হয়েছিল লাল-সবুজ পতাকা, আর কোটি কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল- “প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ, জীবন বাংলাদেশ আমার মরণ বাংলাদেশ ”

১৬ ডিসেম্বর- একদিকে যেমন জাতির চিরগৌরব ও আনন্দের দিন, তেমনি অন্যদিকে লাখো শহীদের আত্মত্যাগ, মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বেদনায় ভারী এক স্মৃতির দিন। আজ মঙ্গলবার, মহান বিজয় দিবসের ৫৪তম বার্ষিকীতে সেই ইতিহাস নতুন করে জাতির সামনে হাজির।

১৯৭১: রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা

ছবিঃ সংগ্রহীত

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যার মধ্য দিয়েই শুরু হয় মুক্তির লড়াই। নিরস্ত্র, প্রশিক্ষণহীন সাধারণ মানুষ যার কাছে যা ছিল তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে শত্রুর বিরুদ্ধে। দীর্ঘ নয় মাসের অসম যুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের রক্ত, ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম আর অগণিত ত্যাগের বিনিময়ে পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ।

বিজয় দিবসের ইতিহাস

বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৬ ডিসেম্বর এক অবিস্মরণীয় ও গৌরবময় দিন। এই দিনে ১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ অর্জন করে চূড়ান্ত বিজয় এবং জন্ম নেয় একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপর শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে দেশের সাধারণ মানুষ, ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা একত্র হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই যুদ্ধে অগণিত মানুষ শহীদ হন এবং অসংখ্য মা-বোন নির্যাতনের শিকার হন।

অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হয় এবং লাল-সবুজের পতাকা উড়তে থাকে স্বাধীন আকাশে।

বিজয় দিবস আমাদের সাহস, ত্যাগ ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। এই দিন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়- স্বাধীনতা কখনোই সহজে আসে না; এর পেছনে রয়েছে অসীম ত্যাগ ও রক্তের ইতিহাস।

এই বিজয়ের মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতি অর্জন করে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতি।

২০২৪: জুলাই বিপ্লব ও নতুন প্রত্যাশার সূচনা

ছবিঃ সংগ্রহীত

২০২৪ সালের বর্ষা বিপ্লব মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিকতারই অংশ। দীর্ঘ সময় ধরে বিভাজন, দমন-পীড়ন ও ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়ে জন্ম দেয় নতুন বাস্তবতার।

এবারের বিজয় দিবস তাই শুধুই স্মৃতিচারণ নয়- বরং ভবিষ্যতের নতুন বাংলাদেশ গড়ার নতুন প্রত্যাশা ও শপথের দিন।

ফ্যাসিবাদ বিরোধী ঐক্যই সবচেয়ে জরুরি: সালাহউদ্দিন আহমদ

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী প্রথম বিজয় দিবস ছিল ভিন্ন আবহের। তবে বর্তমানে রাজনৈতিক বিভক্তির সুযোগ নিয়ে ফ্যাসিবাদী শক্তি আবার মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, “এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো ফ্যাসিবাদ বিরোধী জাতীয় ঐক্যকে একটি শক্তিশালী জাতীয় শক্তিতে রূপ দেওয়া। এর মাধ্যমেই গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা সম্ভব।”

আত্মত্যাগের মহিমায় গৌরবের দিন: ডা. শফিকুর রহমান

জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, একাত্তরের বিজয় আত্মত্যাগের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান সেই মুক্তিযুদ্ধকে পূর্ণতা দিয়েছে।

তিনি সকল বিভেদ ভুলে একটি শান্তিপূর্ণ, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়তে সম্মিলিত প্রচেষ্টার আহ্বান জানান।

১৯৭১ ও ২০২৪ একই ধারার সংগ্রাম: মাহফুজ আলম

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেন, ২০২৪-কে ১৯৭১-এর বিপরীতে দাঁড় করানোর প্রচেষ্টা ঐতিহাসিকভাবে ভুল। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ ও গণঅভ্যুত্থান- সবই মর্যাদা, গণতন্ত্র ও পরিচয় রক্ষার একই ধারাবাহিক লড়াই।

বিজয় ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ: ড. খন্দকার মোশাররফ

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, “আমরা বহুবার বিজয় পেয়েও তা ধরে রাখতে পারিনি। প্রশ্ন হলো- শহীদদের রক্তের ঋণ আমরা রক্ষা করতে পারব তো?”

তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের বিজয় ধরে রাখতে সম্মিলিত প্রয়াস ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

বিজয় কোনো স্থির অর্জন নয়: আ স ম আবদুর রব

জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, বিজয় দিবস কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, এটি একটি চলমান রাজনৈতিক ও নৈতিক অঙ্গীকার। প্রকৃত বিজয় তখনই সম্পূর্ণ হবে, যখন বৈষম্যহীন, মানবিক ও অংশীদারিত্বমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে।

একাত্তর রাষ্ট্রের ভিত্তি, চব্বিশ প্রত্যাশার দরজা: সাইফুল হক

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, একাত্তর রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি, আর ২০২৪ জাতির সামনে নতুন স্বপ্ন ও অসম্পূর্ণ কাজগুলো শেষ করার ডাক।

শঙ্কা ও আশার মাঝেই বিজয়ের দিন

নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, এবি পার্টির মজিবুর রহমান মঞ্জু, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের হাসনাত কাইয়ুমসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা বলেছেন- বিজয়ের আনন্দের সঙ্গে শঙ্কাও রয়েছে। সহিংসতা, নিরাপত্তাহীনতা ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের অনিশ্চয়তা বিজয়ের উল্লাসকে ম্লান করে দিচ্ছে।

তবুও সবার কণ্ঠে একটাই প্রত্যাশা- গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই বিজয়কে স্থায়ী করা।

শেষ কথা

৫৪ বছর আগে অর্জিত বিজয় আর ২০২৪-এর বর্ষা বিপ্লব- দুটোই বাঙালি জাতির দীর্ঘ মুক্তি সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এবারের বিজয় দিবস তাই শুধু উৎসব নয়, আত্মোপলব্ধি ও নতুন শপথের দিন।

এই দিনে হোক অঙ্গীকার-
শহীদদের রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না।
ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্য অটুট থাকবে।
গণতন্ত্র, সাম্য ও মানবিক বাংলাদেশই হবে চূড়ান্ত বিজয়।

সূত্র: বাসস।

আরো পড়ুন

জুলাই বিপ্লবের বীরদের জন্য আসছে ঐতিহাসিক ‘দায়মুক্তি অধ্যাদেশ’!

ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত দ্বিতীয় স্বাধীনতার কারিগরদের জন্য এক বিশাল সুখবর নিয়ে এসেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া বীর যোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষা দিতে সরকার একটি বিশেষ ‘দায়মুক্তি অধ্যাদেশ’ (Indemnity Ordinance) প্রণয়ন করতে যাচ্ছে।

রাজধানীতে ‘জুলাই বীর সম্মাননা’: ১২০০ যোদ্ধা ও সাংবাদিককে বিশেষ স্মারক প্রদান

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বীরত্বগাথা এবং আত্মত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখতে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হলো বর্ণাঢ্য 'জুলাই বীর সম্মাননা' অনুষ্ঠান। আগ্রাসন বিরোধী আন্দোলনের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবং ঐতিহাসিক ফেলানী হত্যা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে শহীদ পরিবার, আহত যোদ্ধা এবং সাহসী সাংবাদিকদের বিশেষ সম্মাননা ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।

ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে ড. ইউনূসের ডাক: গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলার আহ্বান

একটি বৈষম্যহীন ও স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে দেশবাসীকে ঐতিহাসিক এক সিদ্ধান্তের অংশ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ ইউনূস। আগামী জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি সম্ভাব্য গণভোটে জনগণকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার অনুরোধ করেছেন তিনি। ড. ইউনূসের মতে, এটি কেবল একটি ভোট নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রাষ্ট্র সংস্কারের এক বড় সুযোগ।
- Advertisement -spot_img

আরও প্রবন্ধ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ প্রবন্ধ