রবিবার, জানুয়ারি ১১, ২০২৬

ঢাকায় ফিরছেন ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন: বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন দিগন্তের সূচনা

বহুল পঠিত

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাসে এক নতুন ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সূচিত হলো। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশের নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন অভিজ্ঞ কূটনীতিক ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন (Brent Christensen)। গত শুক্রবার (৯ জানুয়ারি, ২০২৬) যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় সকালে ওয়াশিংটনস্থ মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে এক অনাড়ম্বর কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ অনুষ্ঠানে তিনি শপথ গ্রহণ করেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের মনোনীত এই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিদায়ী রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের স্থলাভিষিক্ত হয়ে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের ১৮তম রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। ক্রিস্টেনসেনের এই নিয়োগ কেবল একজন নতুন দূতের আগমন নয়, বরং ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ‘কৌশলগত বাঁক’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

ঢাকায় পুরনো অভিজ্ঞতার আলোয় নতুন পথচলা

ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বাংলাদেশ সম্পর্কে তার গভীর ও প্রত্যক্ষ জানাশোনা। তিনি ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ক কাউন্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই সময়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক বিবর্তন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন।

শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ক্রিস্টেনসেন অত্যন্ত আবেগঘন ও ইতিবাচক ভাষায় বলেন:

“যে দেশটির সঙ্গে আমি খুব ভালোভাবে পরিচিত, সেই বাংলাদেশে ফিরতে পেরে আমি ভীষণ আনন্দিত। বাংলাদেশ আমার হৃদয়ের খুব কাছের একটি দেশ। এখানকার মানুষ, সংস্কৃতি এবং সম্ভাবনা সম্পর্কে আমার যে অভিজ্ঞতা আছে, তা কাজে লাগিয়ে দুই দেশের বন্ধুত্বকে আরও মজবুত করতে চাই।”

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি ও বাংলাদেশ

ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের নিয়োগটি ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শপথ গ্রহণের পর তিনি স্পষ্টভাবে তার লক্ষ্যের কথা জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশিত পথ অনুসরণ করে আমেরিকাকে আরও নিরাপদ, শক্তিশালী এবং সমৃদ্ধ করে তোলা এবং একই সাথে মিত্র দেশগুলোর সাথে লাভজনক ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাই হবে তার মূল লক্ষ্য।

তিনি বলেন, “আমি ঢাকার দূতাবাসে আমেরিকান এবং স্থানীয় কর্মীদের নিয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী দলের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বসিত। আমাদের লক্ষ্য হবে দুই দেশের অভিন্ন স্বার্থ রক্ষায় কাজ করা এবং অর্থনৈতিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে উভয় দেশের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা।”

কূটনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব: কেন ক্রিস্টেনসেন অনন্য?

ঢাকার মার্কিন দূতাবাস নতুন রাষ্ট্রদূতকে অত্যন্ত উষ্ণভাবে স্বাগত জানিয়েছে। দূতাবাসের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের মতো একজন অভিজ্ঞ কূটনীতিককে নেতৃত্বে পাওয়া ঢাকার টিমের জন্য অত্যন্ত আনন্দের।

বিশ্লেষকদের মতে, ক্রিস্টেনসেনের নিয়োগের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ কাজ করেছে:

  1. অর্থনৈতিক বোঝাপড়া: কাউন্সেলর থাকাকালীন তিনি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর কাজ করেছেন। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক বাড়াতে আগ্রহী।
  2. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা: বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ভূ-রাজনীতি সম্পর্কে তার স্বচ্ছ ধারণা রয়েছে, যা দুই দেশের ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে সহায়ক হবে।
  3. কন্টিনিউটি (ধারাবাহিকতা): একজন নবাগত ব্যক্তির চেয়ে একজন পুরনো কর্মকর্তার পক্ষে দ্রুত কাজ শুরু করা সম্ভব, যা বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য জরুরি ছিল।

পিটার হাসের উত্তরসূরি এবং ১৮তম রাষ্ট্রদূত

ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন ঢাকার ১৮তম মার্কিন রাষ্ট্রদূত। এর আগে ১৭তম রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন পিটার হাস। পিটার হাস ২০২২ সালের মার্চ থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তার মেয়াদে দুই দেশের সম্পর্কে অনেক উত্থান-পতন দেখা গিয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে ক্রিস্টেনসেনের আগমনকে একটি ‘ফ্রেশ স্টার্ট’ বা নতুন শুরু হিসেবে দেখছেন অনেকে।

কবে আসছেন ক্রিস্টেনসেন?

পররাষ্ট্র দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১২ জানুয়ারি নবনিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ঢাকায় পৌঁছাবেন। বিমানবন্দরে তাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। ঢাকা পৌঁছানোর পর তিনি রাষ্ট্রপতি বরাবর তার পরিচয়পত্র পেশ করবেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মদিবস শুরু করবেন।

আগামীর চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

বাংলাদেশ বর্তমানে তার অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য বাংলাদেশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের হাত ধরে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা নতুন মাত্রা পেতে পারে।

বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প (RMG), জ্বালানি খাত এবং প্রযুক্তির আদান-প্রদান নিয়ে নতুন করে আলোচনার পথ প্রশস্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সুত্র: ঢাকা পোস্ট

আরো পড়ুন

আন্তর্জাতিক গবেষণার মঞ্চে আবারও বাংলাদেশের গর্ব: বিশ্বসেরা বিজ্ঞানীর তালিকায় ড. সাইদুর রহমান

আন্তর্জাতিক গবেষণা ও উদ্ভাবনের বিশ্বমঞ্চে আবারও উজ্জ্বলভাবে উচ্চারিত হলো বাংলাদেশের নাম। মালয়েশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশি বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. সাইদুর রহমান টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বের সেরা বিজ্ঞানীদের তালিকায় নিজের অবস্থান ধরে রেখে লাল-সবুজের পতাকাকে আরও একবার গর্বের সঙ্গে উঁচিয়ে ধরেছেন।

জুলাই বিপ্লবের বীরদের জন্য আসছে ঐতিহাসিক ‘দায়মুক্তি অধ্যাদেশ’!

ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত দ্বিতীয় স্বাধীনতার কারিগরদের জন্য এক বিশাল সুখবর নিয়ে এসেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া বীর যোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষা দিতে সরকার একটি বিশেষ ‘দায়মুক্তি অধ্যাদেশ’ (Indemnity Ordinance) প্রণয়ন করতে যাচ্ছে।

রাজধানীতে ‘জুলাই বীর সম্মাননা’: ১২০০ যোদ্ধা ও সাংবাদিককে বিশেষ স্মারক প্রদান

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বীরত্বগাথা এবং আত্মত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখতে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হলো বর্ণাঢ্য 'জুলাই বীর সম্মাননা' অনুষ্ঠান। আগ্রাসন বিরোধী আন্দোলনের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবং ঐতিহাসিক ফেলানী হত্যা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে শহীদ পরিবার, আহত যোদ্ধা এবং সাহসী সাংবাদিকদের বিশেষ সম্মাননা ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।
- Advertisement -spot_img

আরও প্রবন্ধ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ প্রবন্ধ