বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের ঘামঝরানো পরিশ্রমে সচল থাকে দেশের অর্থনীতির চাকা। কিন্তু প্রবাস জীবনের নানাবিধ সংকট, আইনি জটিলতা এবং পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার যন্ত্রণায় অনেক সময়ই দিশেহারা হয়ে পড়েন তারা। প্রবাসীদের এই সব বাস্তব সমস্যার সমাধান এবং সঠিক পথের দিশা দিতে রাজধানী ঢাকায় এক ব্যতিক্রমী ও প্রাণবন্ত আয়োজন সম্পন্ন করেছে আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন।
৪৬ দেশ ও ৫৪ জেলার সেতুবন্ধন
আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের গাইডলাইন কর্মশালা’টি কেবল একটি সেমিনার ছিল না, বরং এটি পরিণত হয়েছিল এক অনন্য মিলনমেলায়। দেশের ৫৪টি জেলা থেকে আসা এবং বর্তমানে বিশ্বের ৪৬টি ভিন্ন ভিন্ন দেশে কর্মরত প্রায় সাড়ে চার শতাধিক প্রবাসী এই কর্মশালায় অংশ নেন।
পঞ্চগড় থেকে সাতক্ষীরা, কুড়িগ্রাম থেকে পটুয়াখালী—দেশের প্রত্যন্ত ও সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে ছুটে আসা রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সরব উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রবাসীদের এমন স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আয়োজকদেরও অভিভূত করেছে। তারা জানান, প্রবাসীদের এই গভীর আগ্রহ সামাজিক উন্নয়নে ফাউন্ডেশনের কাজের পরিধি বাড়িয়ে দিয়েছে।
কর্মশালার মূল ফোকাস: সমস্যা থেকে সমাধান
প্রবাসীদের জীবন কেবল টাকা পাঠানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর আড়ালে থাকে অনেক জটিল গল্প। কর্মশালায় বিশেষজ্ঞরা মূলত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত করেন:
- অভিবাসন ও কর্মসংস্থান: বৈধভাবে অবস্থান এবং কর্মক্ষেত্রে নিজের অধিকার আদায়ের কৌশল।
- আর্থিক ব্যবস্থাপনা: কষ্টে উপার্জিত টাকা কোথায় এবং কীভাবে বিনিয়োগ করলে নিরাপদ থাকবে।
- আইনি সহায়তা: বিদেশের মাটিতে আইনি জটিলতায় পড়লে করণীয় এবং দূতাবাসগুলোর সাথে যোগাযোগের উপায়।
- সামাজিক নিরাপত্তা: প্রবাসীদের অনুপস্থিতিতে দেশে তাদের পরিবারের নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
- মানসিক স্বাস্থ্য: একাকীত্ব ও দূরপ্রবাসের চাপ সামলানোর বৈজ্ঞানিক ও ধর্মীয় পদ্ধতি।
রিমোট প্যারেন্টিং: দূর থেকে সন্তান গড়ার শিল্প
প্রবাসীদের জন্য সবচেয়ে বড় কষ্টের জায়গা হলো সন্তানদের থেকে দূরে থাকা। কর্মশালার একটি বিশেষ পর্বে আলোচিত হয় ‘রিমোট প্যারেন্টিং’ বা দূর থেকে সন্তান লালন-পালন। প্রযুক্তির ব্যবহার করে কীভাবে প্রবাসে থেকেও সন্তানের চরিত্র গঠন এবং পড়াশোনার তদারকি করা যায়, সে বিষয়ে বাস্তবসম্মত পরামর্শ দেওয়া হয়। অংশগ্রহণকারী প্রবাসীরা তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন এবং সন্তানদের সাথে মানসিক দূরত্ব কমানোর উপায়গুলো সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা লাভ করেন।
সুদমুক্ত ঋণের জোরালো দাবি
দর্শকদের মতামত পর্বে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ফেনী জেলার সৌদি আরব প্রবাসী মনিরুজ্জামান আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের মঞ্চ থেকে সরকারের প্রতি একটি বিশেষ আহ্বান জানান। তিনি প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে প্রবাসীদের জন্য কোনো প্রকার সুদ ছাড়াই ঋণের ব্যবস্থা করার দাবি তোলেন। তার এই যৌক্তিক দাবিতে উপস্থিত সাড়ে চারশ প্রবাসী একযোগে হাত তুলে এবং উচ্চস্বরে সমর্থন জানান। তাদের দাবি, সুদমুক্ত ঋণ পাওয়া গেলে প্রবাসীরা ঋণের জাল থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে আত্মনির্ভরশীল হতে পারবেন।
প্রবাসীদের অভিব্যক্তি: “এমন আয়োজন আগে দেখিনি”
কর্মশালা শেষে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন অংশগ্রহণকারীরা। তারা জানান, প্রবাসীদের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে এমন বিজ্ঞানসম্মত এবং তথ্যবহুল আয়োজন বাংলাদেশে সম্ভবত এটাই প্রথম। কুয়েত প্রবাসী এক অংশগ্রহণকারী বলেন, “আমরা শুধু টাকা পাঠানোর মেশিন নই, আমাদেরও যে দিকনির্দেশনার প্রয়োজন আছে, তা আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন বুঝিয়ে দিল।” তারা দাবি জানান, এমন সচেতনতামূলক কর্মশালা যেন নিয়মিত বিরতিতে আয়োজন করা হয়।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহর এই মহতী উদ্যোগ প্রসঙ্গে আয়োজকরা জানান, প্রবাসীরা দেশের প্রাণ। তাদের জীবনমান উন্নয়ন ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন সব সময় পাশে থাকবে। ভবিষ্যতে প্রবাসী ছাড়াও অন্যান্য পেশাজীবীদের নিয়ে জনকল্যাণমূলক এমন বড় পরিসরের আয়োজন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।




