দীর্ঘদিনের অনিয়ম, অর্থ পাচার ও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের দৌরাত্ম্যে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল বাংলাদেশের আর্থিক খাত। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নেমে আসে চরম অস্থিরতা-ডলার সংকট, রিজার্ভের পতন, তারল্য ঘাটতি এবং আমানতকারীদের ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেওয়ার হিড়িক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
ঠিক এমন এক সংকটময় মুহূর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব নেন ড. আহসান এইচ মনসুর। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ১৬ মাসের মধ্যেই তিনি ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো, তারল্য সংকট মোকাবিলা এবং আস্থা পুনর্গঠনে দৃশ্যমান সাফল্য দেখিয়েছেন—যা অর্থনীতির জন্য বড় সুখবর হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রিজার্ভের পতন থেমেছে, ডলার সংকটে স্বস্তি
নতুন গভর্নরের নেতৃত্বে নেওয়া কার্যকর পদক্ষেপে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের লাগামহীন পতন বন্ধ হয়েছে। শুধু তাই নয়, রিজার্ভে হাত না দিয়েই বাংলাদেশ ইতোমধ্যে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি ঋণ পরিশোধ করেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ঋণ ও সুদ বাবদ আরও প্রায় ১.২৫ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার একটি শক্তিশালী বার্তা।
ব্যাংকে ফিরছে আমানত, কমছে নগদ টাকা ঘরে রাখার প্রবণতা
দীর্ঘদিন আস্থার সংকটে গ্রাহকরা ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিচ্ছিলেন। তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে।
- ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে নতুন করে জমা পড়েছে ১,০৮৫ কোটি টাকা
- ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ কমে দাঁড়িয়েছে ২.৭৬ লাখ কোটি টাকা, যা আগের মাসের তুলনায় কম
এই প্রবণতা অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক সংকেত এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আস্থা ফেরার প্রমাণ।
দুর্বল ব্যাংক একীভূত করে গঠিত হলো “সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক”
ড. মনসুরের অন্যতম সাহসী সিদ্ধান্ত ছিল সমস্যাগ্রস্ত শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি বেসরকারি ব্যাংক একীভূত করা।
এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত হয়ে গঠিত হয়েছে:
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি
- পরিশোধিত মূলধন: ৩৫ হাজার কোটি টাকা
- সরকারের অংশ: ২০ হাজার কোটি টাকা
- লাইসেন্স: ১ ডিসেম্বর
- পূর্ণাঙ্গ লেনদেন শুরু: ১ জানুয়ারি
বর্তমানে আমানতকারীরা নির্বিঘ্নে টাকা জমা ও উত্তোলন করতে পারছেন, যা ব্যাংকিং খাতে আস্থার বড় ভিত্তি তৈরি করেছে।
খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল: প্রকৃত ব্যবসায়ীদের জন্য বড় সুযোগ
অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়েছে আরেকটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত—প্রকৃত ব্যবসায়ীদের জন্য খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধা।
মূল দিকগুলো:
- মাত্র ২% অর্থ জমা দিয়ে ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ
- ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর
- প্রথম ২ বছর কিস্তি পরিশোধে ছাড়
- ৬ মাসের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা
- এককালীন পরিশোধে ১ বছর সময়
এই সিদ্ধান্তে বহু ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পুনরায় কার্যক্রম চালু করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সুশাসন ফেরাতে কঠোর পদক্ষেপ
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে:
- ১২টির বেশি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করেছে
- দখলদার ও অনিয়মকারীদের হাত থেকে ব্যাংক উদ্ধার করেছে
- নতুন করে টাকা ছাপিয়ে সংকট সমাধানের নীতি থেকে সরে এসেছে
- স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি জোরদার করেছে
অর্থনীতির জন্য আশার আলো
বিশ্লেষকদের মতে, ড. আহসান এইচ মনসুরের নেতৃত্বে নেওয়া এসব পদক্ষেপ বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার পথে ফিরিয়ে আনছে। যদিও পুরোপুরি শৃঙ্খলা ফিরতে আরও সময় লাগবে, তবে সঠিক পথটি ইতোমধ্যেই নির্ধারিত হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরার এই যাত্রা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় সুখবর।
সুত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন




