বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সাল একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে—এমন মন্তব্য করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, “১৯৭১ সালে আমরা একটি স্বাধীন ভূখণ্ড পেয়েছি, আর ২০২৪ সালে দেশের মানুষ সেই স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার রক্ষার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজপথে নেমেছে।”
রোববার (১৮ জানুয়ারি) রাজধানীর খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে জুলাই আন্দোলনে নিহত ও আহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এক আবেগঘন মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলন কোনো একক ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর নয়। এটি ছিল অধিকারহারা সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রতিবাদ, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের সংগ্রাম।
তিনি বলেন,
“এই আন্দোলনের প্রকৃত নায়ক শহীদ পরিবারের সদস্যরা, আহত যোদ্ধারা এবং সেই লাখো মানুষ যারা ভয়কে জয় করে রাস্তায় নেমেছিল। এটি কোনো দলের সম্পত্তি নয়- এটি জনগণের আন্দোলন, গণতন্ত্রের আন্দোলন।”
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান
তারেক রহমান বলেন, যদি ২০২৪ সালের আন্দোলনের চেতনা বাস্তবে রূপ দিতে হয়, তাহলে দেশের প্রতিটি নারী-পুরুষ ও নাগরিকের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
তার ভাষায়,
“স্বাধীনতা শুধু মানচিত্রে থাকা একটি দেশের নাম নয়। স্বাধীনতা মানে কথা বলার অধিকার, ভোট দেওয়ার অধিকার, নিরাপদে বাঁচার অধিকার এবং সম্মানের সঙ্গে জীবিকা নির্বাহ করার সুযোগ।”
তিনি জোর দিয়ে বলেন, একটি গোষ্ঠী যেন এই গণআন্দোলনকে নিজেদের দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে, সে বিষয়ে জনগণকে সতর্ক থাকতে হবে।
শহীদ পরিবার ও আহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা
সভায় জুলাই আন্দোলনে নিহত ও আহত পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য শোনেন তারেক রহমান। আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, প্রিয়জন হারানোর যন্ত্রণা কোনো কিছু দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন,
“আমি জানি স্বজন হারানোর কষ্ট কত গভীর। এই ক্ষতি কোনো অর্থ, কোনো পদক কিংবা কোনো বক্তব্য দিয়ে পূরণ করা যায় না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শহীদ পরিবারগুলোর পাশে থাকা এবং আহতদের যথাযথ পুনর্বাসন নিশ্চিত করা।”
তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, সম্মান ও স্থায়ী সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।
সভায় উপস্থিত শীর্ষ নেতারা
মতবিনিময় সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ দলের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া অনুষ্ঠানে অংশ নেন তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জোবাইদা রহমান।
নেতারা বলেন, জুলাই আন্দোলন কেবল একটি প্রতিবাদ নয়, এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের ভিত্তি স্থাপন করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে বক্তব্যের তাৎপর্য
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের এই বক্তব্য ২০২৪ সালের আন্দোলনকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে স্থাপন করেছে এবং একে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে আদর্শিকভাবে যুক্ত করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, “স্বাধীনতা অর্জন ও স্বাধীনতা রক্ষা”—এই দুই ধারণাকে আলাদা করে তুলে ধরে তিনি জনগণের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক চেতনা গড়ে তোলার বার্তা দিয়েছেন।
নতুন প্রজন্মের প্রতি বার্তা
তারেক রহমান বিশেষভাবে তরুণদের উদ্দেশে বলেন, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের দায়িত্ব তাদের কাঁধেই।
তিনি বলেন,
“তরুণ প্রজন্ম যদি সত্য, ন্যায় ও গণতন্ত্রের পথে অবিচল থাকে, তাহলে কোনো শক্তিই এই দেশের মানুষের অধিকার কেড়ে নিতে পারবে না।”
ইতিহাসের পাতায় ২০২৪
অনেকের চোখে ২০২৪ সাল এখন শুধু একটি ক্যালেন্ডারের বছর নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে প্রতিবাদের প্রতীক, অধিকার পুনরুদ্ধারের লড়াই এবং গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণের নাম।
তারেক রহমানের বক্তব্য সেই বাস্তবতাকেই আরও শক্তভাবে উচ্চারণ করলো—
১৯৭১ ছিল শৃঙ্খল ভাঙার বছর,
আর ২০২৪ ছিল স্বাধীনতাকে রক্ষা করার শপথের বছর।





