বাংলাদেশ আজ এমন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে উন্নয়ন আর টিকে থাকার সংগ্রাম একসঙ্গে চলমান। কর্মসংস্থানের ঘাটতি, নিরাপদ খাদ্যের চ্যালেঞ্জ, গ্রামীণ অর্থনীতির স্থবিরতা- সবকিছুর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণ। এই বাস্তবতায় আশার নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে কৃষি পর্যটন (Agro-Tourism)– যা আগামীর বাংলাদেশে হতে পারে একটি সমন্বিত, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন মডেল।
কৃষি পর্যটন: উন্নয়নের নতুন আশার গল্প
কৃষি পর্যটন কেবল বিনোদনভিত্তিক পর্যটন নয়; এটি উৎপাদন, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির এক জীবন্ত সংযোগ। খামার, মৎস্যঘের, ডেইরি, পোলট্রি, চা-বাগান, পাহাড়ি কৃষি অঞ্চল, হাওর-বাঁওড়, উপকূলীয় কৃষিভিত্তিক জনপদ- এসব যখন পর্যটনের গন্তব্যে রূপ নেয়, তখন কৃষক শুধু উৎপাদক নন, তিনি হয়ে ওঠেন উদ্যোক্তা, সেবাদাতা ও স্থানীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তি।
এই মডেলে গ্রামীণ জনপদের মানুষের আয় বাড়ে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং গ্রাম থেকেই তৈরি হয় অর্থনৈতিক গতি।
সমবায়ভিত্তিক শক্তি: কৃষকের হাতে উন্নয়নের চাবিকাঠি
কৃষি পর্যটনের সফলতার কেন্দ্রে রয়েছে সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থা। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক এককভাবে বাজারে টিকে থাকতে হিমশিম খেলেও সমবায়ের মাধ্যমে তারা ঝুঁকি ভাগাভাগি করে লাভের ন্যায্য অংশ নিশ্চিত করতে পারেন।
ইউরোপের ইতালি-র ‘Agriturismo’ কিংবা এশিয়ার জাপান-এর গ্রামীণ কৃষি সমবায় দেখিয়েছে- কীভাবে কৃষকরা পর্যটন ও খাদ্য বিপণনকে একসূত্রে গেঁথে স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছেন।
রপ্তানির নতুন দিগন্ত ও ‘বাংলাদেশ ব্র্যান্ড’
কৃষি পর্যটনের মাধ্যমে উৎপাদিত নিরাপদ, ট্রেসেবল ও পরিবেশবান্ধব খাদ্যপণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যের পণ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পায়। জৈব খাদ্য, ঐতিহ্যবাহী চাল, মধু, দুগ্ধজাত পণ্য, মৌসুমি ফল, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য-সবই পর্যটনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ‘বাংলাদেশ ব্র্যান্ড’ হিসেবে বিশ্ববাজারে জায়গা করে নিতে পারে।
এশিয়ার থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম কৃষি পর্যটনকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় পণ্যকে বৈশ্বিক বাজারে পরিচিত করেছে-বাংলাদেশও সেই পথ অনুসরণ করতে পারে।
গ্রিন ও সার্কুলার ইকোনমির বাস্তব প্রয়োগ
কৃষি পর্যটন মানেই পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন। এখানে বর্জ্যও হয়ে ওঠে সম্পদ। খামারের গোবর থেকে বায়োগ্যাস, কৃষি অবশিষ্টাংশ থেকে কম্পোস্ট, সৌরবিদ্যুৎ ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ-সব মিলিয়ে তৈরি হয় একটি সার্কুলার ইকোনমি।
ইউরোপের নেদারল্যান্ডস ও ডেনমার্ক দেখিয়েছে, কীভাবে কৃষি ও পর্যটন একসঙ্গে পরিবেশের ওপর চাপ কমিয়ে টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করতে পারে।
গ্রামভিত্তিক স্টার্টআপ ও তরুণ উদ্যোক্তার উত্থান
কৃষি পর্যটন হতে পারে গ্রামীণ স্টার্টআপ উন্নয়নের ইনকিউবেশন হাব। স্মার্ট ফার্মিং, কৃষিপ্রযুক্তি, ডিজিটাল বুকিং, ইকো-ট্যুর গাইডিং, স্থানীয় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও হস্তশিল্প-এসব খাতে তরুণরা গড়ে তুলতে পারে নতুন উদ্যোগ। এর ফলে গ্রাম থেকেই তৈরি হবে উদ্ভাবন, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা।
জলবায়ু অভিযোজনের কার্যকর কৌশল
জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ-এর জন্য কৃষি পর্যটন হতে পারে অভিযোজনের শক্তিশালী হাতিয়ার। খরা, বন্যা, লবণাক্ততা বা ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকিতে থাকা অঞ্চলে কৃষি, মৎস্য ও পর্যটন একত্রে পরিচালিত হলে আয়ের ঝুঁকি কমে এবং জীবিকার স্থিতিশীলতা বাড়ে।
শিক্ষা ও সচেতনতার নতুন প্ল্যাটফর্ম
কৃষি পর্যটন শুধু অর্থনীতি নয়- এটি শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতারও মাধ্যম। নগরবাসী ও শিক্ষার্থীরা খামারে গিয়ে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন দেখলে খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু সচেতনতা বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে গড়ে ওঠে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি হয় দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে।
প্রয়োজন সমন্বিত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ
এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে কৃষি, পর্যটন, সমবায়, অর্থ, পরিবেশ ও যুব উন্নয়ন খাতের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। সহজ ঋণ, প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নীতিগত সহায়তা পেলে কৃষি পর্যটন হয়ে উঠতে পারে আগামীর বাংলাদেশের উন্নয়নের এক শক্ত ভিত।
সুত্রঃ আমার দেশ





