বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান–এর নেতৃত্বাধীন নবনির্বাচিত সরকারের হাতে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিদায় নিয়েছে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস–এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।
ভঙ্গুর অর্থনীতি, অস্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা ও চরম রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্য দিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করা এই সরকার মাত্র ১৮ মাসে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর পথে ফেরানোর মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে।
সংকটের মধ্যেও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসনের পতনের পর ৮ আগস্ট বিপুল জনআকাঙ্ক্ষা নিয়ে সরকার গঠন করেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। শুরু থেকেই প্রশাসনিক বিদ্রোহ, আনসার বিদ্রোহ, বিচারিক ষড়যন্ত্র এবং একের পর এক রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের মুখোমুখি হয় অন্তর্বর্তী সরকার।
বিশ্লেষকদের মতে, সীমিত সময় ও চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও ড. ইউনূস পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ধৈর্য, সংযম ও গণতান্ত্রিক আচরণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। সরকারের সময়কালে দুই হাজারের বেশি আন্দোলন হলেও কোথাও প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করা হয়নি-যা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল।
অর্থনীতিতে ঘুরে দাঁড়ানো
দায়িত্ব গ্রহণের সময় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল উদ্বেগজনক অবস্থায়। কিন্তু ড. ইউনূসের অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনায় সরকার বিদায়কালে মোট ৩৪ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ রেখে যেতে সক্ষম হয়।
ডলারের বিপরীতে টাকার দর স্থিতিশীল হয়, খাদ্য মজুত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে এবং রাজস্ব আহরণেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেউলিয়ার দ্বারপ্রান্তে থাকা অর্থনীতিকে একটি মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে যাওয়াই ড. ইউনূস সরকারের অন্যতম বড় সাফল্য।
সংস্কার, বিচার ও ন্যায়বিচারের অগ্রগতি
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে
- জুলাই সনদ প্রণয়ন
- রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ
- মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া
- রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার
-এই বিষয়গুলো জনগণের আস্থাকে পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দায়ের হওয়া প্রায় ২৪ হাজার মামলা প্রত্যাহার করা হয়, যার ফলে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দলের প্রায় পাঁচ লাখ নেতাকর্মী আইনি হয়রানি থেকে মুক্তি পান।
পররাষ্ট্রনীতিতে আত্মমর্যাদার বার্তা
ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার নতজানু পররাষ্ট্রনীতি থেকে বেরিয়ে এসে ন্যায্যতা ও সার্বভৌমত্বভিত্তিক কূটনীতি অনুসরণের চেষ্টা করে। বিতর্কিত ট্রানজিট ও ট্রানশিপমেন্ট চুক্তি পর্যালোচনা করা হয় এবং জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট ‘ফেনী চিকেন নেক’ এলাকা পুনরুদ্ধার করা হয়—যা বিশ্লেষকদের কাছে সাহসী সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত।
একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে বিদায়
সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে ভারতের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপমুক্ত একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন। দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক, উন্নয়ন সহযোগী ও রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের সার্বিক মান নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে।
এই নির্বাচনের মাধ্যমেই ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রমাণ করেছেন- ক্ষমতা নয়, দায়িত্বই ছিল তার মূল লক্ষ্য।
রাষ্ট্রনায়কসুলভ বিদায়
১৮ মাসের শাসনামল শেষে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে বিদায় নিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে অন্তর্বর্তী সরকার বলতে যে মানদণ্ড বোঝাবে-তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে গেল এই সরকার।





