শুক্রবার, জানুয়ারি ৯, ২০২৬

যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে জীবনরক্ষার লড়াই: নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত গাজার চিকিৎসকরা

বহুল পঠিত

মানবতা, ন্যায়বিচার ও আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে দৃঢ় অবস্থানের স্বীকৃতি হিসেবে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি ফ্রান্সেসকা আলবানিজ এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় কর্মরত একদল চিকিৎসক ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছেন। এই মনোনয়ন বিশ্বজুড়ে মানবাধিকারের পক্ষে এক শক্তিশালী বার্তা এবং নিপীড়িত মানুষের জন্য আশার আলো হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মঙ্গলবার (১৬ ডিসেম্বর) ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য মাতিয়াজ নেমেক নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর এ তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, বিশ্বের ৩৩টি দেশের প্রায় ৩০০ জন যোগ্য মনোনয়নদাতা-যাদের মধ্যে আইনপ্রণেতা, মানবাধিকারকর্মী ও শিক্ষাবিদরা রয়েছেন-এই ঐতিহাসিক প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেছেন।

রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে মানবতার অবস্থান

মাতিয়াজ নেমেক বলেন, এই মনোনয়ন “সবচেয়ে কঠিন ও বিপজ্জনক পরিস্থিতিতেও মৌলিক মানবিক মূল্যবোধ রক্ষায় সাহস, নিষ্ঠা ও নৈতিক দৃঢ়তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।” তার মতে, এটি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষে নয়; বরং শান্তি, মানবতা ও আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে একটি বৈশ্বিক অবস্থান।

তিনি আরও বলেন, “এই মনোনয়ন প্রমাণ করে-যখন রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যর্থ হয়, তখন মানবিক দায়িত্বই হয়ে ওঠে শেষ আশ্রয়।”

ফ্রান্সেসকা আলবানিজ: চাপের মুখেও ন্যায়ের কণ্ঠ

ফ্রান্সেসকা আলবানিজের ভূমিকার কথা তুলে ধরে নেমেক বলেন, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন পক্ষের রাজনৈতিক চাপ, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও ব্যক্তিগত আক্রমণের মুখেও তিনি আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের প্রশ্নে আপসহীন থেকেছেন। জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে তিনি ফিলিস্তিনিদের ওপর সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে স্পষ্ট ও তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন তুলে ধরেছেন।

নেমেকের ভাষায়, “তিনি বিশ্ব বিবেকের সামনে একটি আয়না ধরেছেন। তার কাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়-আন্তর্জাতিক আইন কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকার জন্য নয়, বাস্তব জীবনে প্রয়োগের জন্য।”

ধ্বংসস্তূপের মাঝেও জীবন রক্ষার লড়াই: গাজার চিকিৎসকরা

এই মনোনয়নে গাজায় কর্মরত চিকিৎসকরাও অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ডা. হুসাম আবু সাফিয়াডা. সারা আল-সাক্কা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অব্যাহত হামলা, হাসপাতাল ধ্বংস, বিদ্যুৎ ও ওষুধের তীব্র সংকটের মধ্যেও তারা প্রতিদিন শত শত আহত মানুষের চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন।

মনোনয়নপত্রে উল্লেখ করা হয়, এই চিকিৎসকরা শুধু জীবন বাঁচাচ্ছেন না-তারা মানবতা, সংহতি ও চিকিৎসা নৈতিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। নেমেক বলেন, “চরম মানবিক বিপর্যয়ের মাঝেও তারা শান্তির মূল্যবোধ বাস্তবায়ন করছেন, যা নোবেল শান্তি পুরস্কারের মূল দর্শনের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।”

বিশ্ব নেতাদের প্রতি বার্তা

নেমেক বলেন, এই বৈশ্বিক মনোনয়ন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বিশ্ব নেতাদের প্রতি একটি স্পষ্ট আহ্বান- সব পরিস্থিতিতেই আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার ও মানব মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, নীরবতা কখনো নিরপেক্ষতা নয়; বরং অনেক সময় তা অন্যায়ের পক্ষেই অবস্থান নেওয়ার নামান্তর।

পটভূমি: গাজায় মানবিক বিপর্যয়

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় চলমান ইসরাইলি হামলায় ৭০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অধিকাংশই নারী ও শিশু। একই সময়ে ১ লাখ ৭১ হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার ঘোষণা থাকলেও একাধিকবার তা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে, ফলে মানবিক সংকট আরও গভীর হয়েছে।

আশার বার্তা

বিশ্লেষকদের মতে, এই মনোনয়ন কেবল ব্যক্তি বা পেশাজীবীদের স্বীকৃতি নয়; এটি নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানো কণ্ঠগুলোর জন্য বিশ্বব্যাপী এক নৈতিক সমর্থন। মানবতার পক্ষে দাঁড়ানো মানুষরা যে একা নন- এই মনোনয়ন তারই শক্ত প্রমাণ।

আরো পড়ুন

ট্রাম্পের ‘ড্রিম মিলিটারি’ মিশন: ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের রেকর্ড প্রতিরক্ষা বাজেট প্রস্তাব

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ইতিহাসে এক অভাবনীয় এবং নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২০২৭ অর্থ বছরের জন্য তিনি রেকর্ড ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেটের প্রস্তাব...

ডেলসি রদ্রিগেজের অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ

দক্ষিণ আমেরিকায় রাজনৈতিক ভূমিকম্প: মাদুরোর পতন ও নতুন নেতৃত্ব ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বিশাল ধাক্কা লেগেছে। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা নেতা এখন অপসারিত। নিকোলাস মাদুরোকে...

গাজায় মানবিক সেবার ধারা অব্যাহত রাখার আহ্বান জাতিসংঘের

গাজার সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফেরাতে এবং মানবিক সংকট দূর করতে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। মানবিক সংস্থাগুলোর ওপর আরোপিত সাম্প্রতিক বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করে জীবনরক্ষাকারী সহায়তা পৌঁছানোর পথ সুগম করতে তিনি ইসরায়েলের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। শান্তির এই যাত্রায় সংঘাত নয়, বরং মানুষের জীবন বাঁচানোই এখন বিশ্বের প্রধান অগ্রাধিকার।
- Advertisement -spot_img

আরও প্রবন্ধ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ প্রবন্ধ