অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরের শাসনকাল নিয়ে সম্প্রতি যে প্রতিক্রিয়াগুলো সামনে আসছে, সেগুলোর একটি প্রভাবশালী অংশ সরকারকে “উদারতার বয়ান কিন্তু অসহিষ্ণুতার বাস্তবতা”র প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করছে। তবে এই মূল্যায়ন কি পুরো বাস্তবতাকে ধারণ করছে, নাকি এটি একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিকোণ থেকে নির্মিত পাঠ- সে প্রশ্ন তোলা জরুরি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কোনো নির্বাচিত সরকার ছিল না। তাদের হাতে ছিল সীমিত সময়, সীমিত রাজনৈতিক বৈধতা এবং সবচেয়ে বড় কথা- একটি ভাঙা রাষ্ট্রযন্ত্র, ক্ষয়প্রাপ্ত প্রশাসন ও উত্তপ্ত সামাজিক বাস্তবতা। এই বাস্তবতা উপেক্ষা করে সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত বা ব্যর্থতাকে এককভাবে “ইচ্ছার অভাব” হিসেবে ব্যাখ্যা করা বিশ্লেষণকে সরলীকৃত করে তোলে।
অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত: ‘উদারনীতি’ না কি অনিবার্য বাস্তবতা?
রাজস্ব কাঠামো পুনর্গঠন, বন্দর ও টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় বিদেশি বিনিয়োগ- এসব সিদ্ধান্তকে অনেকেই উদারনৈতিক অর্থনীতির আগ্রাসী প্রয়োগ হিসেবে দেখছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের মতো একটি বৈদেশিক বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতিতে অবকাঠামো উন্নয়ন ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার বিকল্প কী ছিল?
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে সরকার শুরুতে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে, কিন্তু আন্দোলনের মুখে সংশোধনী এনে খাত-অভিজ্ঞদের যুক্ত করা দেখায় যে সরকার একমুখী ও অনমনীয় ছিল না। একইভাবে বন্দর ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক অপারেটরদের যুক্ত করা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে- এই আশঙ্কা যেমন সত্য, তেমনি এটিও সত্য যে বর্তমান সক্ষমতা দিয়ে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন।
সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা: কেবল ‘বয়ান’ নয়
রাষ্ট্রীয়ভাবে চারটি প্রধান ধর্মীয় উৎসব এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর উৎসব উদ্যাপনকে অনেকেই “ইমেজ নির্মাণ” হিসেবে দেখছেন। কিন্তু বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে এই মাত্রার প্রাতিষ্ঠানিক সাংস্কৃতিক অন্তর্ভুক্তি নজিরবিহীন। এটি নিছক ভিডিও বা রিলের বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি প্রতীকী স্বীকৃতি- যা সমাজে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলে।
এই সাংস্কৃতিক উদ্যোগগুলো ভবিষ্যৎ সরকারগুলোর জন্য একটি মানদণ্ডও তৈরি করেছে, যা সহজে উপেক্ষা করা যাবে না।
সহিংসতা ও ‘মব’: রাষ্ট্র বনাম সমাজ
দেড় বছরে সংঘটিত সহিংসতা, মব জাস্টিস ও সাম্প্রদায়িক হামলার দায় এককভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপানো কি ন্যায্য? এই প্রবণতাগুলো কি হঠাৎ এই সময়েই জন্ম নিয়েছে, নাকি দীর্ঘদিনের সামাজিক অবক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ?
নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যর্থতা যেমন প্রশ্নের মুখে পড়ে, তেমনি এটিও সত্য যে একটি অরাজনৈতিক অন্তর্বর্তী সরকার সর্বোচ্চ কঠোরতা দেখালে সেটিই আবার “দমনমূলক রাষ্ট্র” হিসেবে সমালোচিত হতো। শিক্ষকদের আন্দোলনে কঠোরতা আর ধর্মীয় বা সামাজিক সংঘাতে নরম অবস্থানের বৈপরীত্য আদর্শ পরিস্থিতি নয়, কিন্তু এটি রাষ্ট্রের দ্বিধাগ্রস্ত বাস্তবতারই প্রতিফলন।
‘পলিটিক্যাল কারেক্টনেস’: দায় এড়ানো, না কি সময় কেনা?
স্লোভেন দার্শনিক স্লাভয় জিজেক–এর পলিটিক্যাল কারেক্টনেসবিরোধী বিশ্লেষণ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রশ্ন হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষেত্রে ভাষার শুদ্ধতা কি শুধুই দায় এড়ানোর কৌশল ছিল, নাকি একটি সংঘাতপূর্ণ সমাজে সময় কেনার চেষ্টা?
সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবগুলো- নাম পরিবর্তন, বহুত্ববাদ, নাগরিকতন্ত্র- বাস্তবায়নের সুযোগ এই সরকারের ছিল না। এগুলো ছিল ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকারের জন্য আলোচনার খসড়া। সুতরাং এসবকে বাস্তবতার সঙ্গে তুলনা করে “ভণ্ডামি” বলা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ধাপগুলোকে উপেক্ষা করে।
এনজিও- নির্ভরতার অভিযোগ: দক্ষতা বনাম ষড়যন্ত্র
এনজিও খাত থেকে আসা উপদেষ্টাদের উপস্থিতি অনেকের কাছে সন্দেহজনক লেগেছে। কিন্তু এটিও সত্য, সংকটকালীন প্রশাসনে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাইরে অভিজ্ঞ ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তিদের যুক্ত করা অনেক দেশের ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক চর্চা। এটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে “বিদেশি এজেন্ডা” হিসেবে দেখা বিশ্লেষণকে দুর্বল করে।
শেষ কথা
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিঃসন্দেহে নিখুঁত ছিল না। কথা ও কাজে অসঙ্গতি ছিল, ব্যর্থতাও ছিল। কিন্তু এই দেড় বছরকে যদি কেবল “উদারতার বয়ান ও অসহিষ্ণুতার বাস্তবতা”র একরৈখিক গল্পে বন্দী করা হয়, তাহলে আমরা একটি জটিল সময়কে অযথা সরল করে ফেলি।
এই সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য বা ব্যর্থতা নয়- বরং শিক্ষা হলো, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সংস্কার ও আইনের শাসনকে পরস্পরের বিপরীতে দাঁড় করালে কোনো সংকটই কাটে না। ভবিষ্যৎ সরকার যদি এই তিনটিকে একসঙ্গে গুরুত্ব দিতে পারে, তবেই জুলাই–পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতার সত্যিকারের উত্তরণ সম্ভব।





