মল স্ক্যান করে রোগ ধরবে জাপানের স্মার্ট টয়লেট
প্রযুক্তি আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে প্রতিনিয়ত সহজ ও বুদ্ধিমান করে তুলছে। স্মার্টফোন, স্মার্টওয়াচের পর এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো- স্মার্ট টয়লেট। অবাক লাগলেও সত্য, জাপানের বিশ্বখ্যাত স্যানিটেশন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান টোটো (Toto Ltd.) এমন এক টয়লেট তৈরি করেছে, যা ব্যবহারকারীর মল বিশ্লেষণ করে তার স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানাতে সক্ষম।
শুনতে অদ্ভুত মনে হলেও, স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে এটিকে ইতোমধ্যে এক বৈপ্লবিক উদ্ভাবন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কীভাবে কাজ করে এই স্মার্ট টয়লেট?
টোটোর এই অত্যাধুনিক টয়লেটের ভেতরে রয়েছে একটি বিল্ট-ইন অপটিক্যাল সেন্সর ও স্ক্যানিং সিস্টেম। টয়লেট বোলের ভেতরে, পানির নোজলের কাছেই বসানো এই সেন্সরটি ব্যবহারকারীর বসার সঙ্গে সঙ্গেই সক্রিয় হয়ে ওঠে।
মলত্যাগের সময় সেন্সরটি একটি বিশেষ আলো ব্যবহার করে মলের ছবি ধারণ করে এবং মুহূর্তের মধ্যেই তা বিশ্লেষণ করে ফেলে। ফ্লাশ করার আগেই সম্পন্ন হয় পুরো প্রক্রিয়া।
এই প্রযুক্তির কাজের ধরন অনেকটা বারকোড স্ক্যানারের মতো- তবে উদ্দেশ্য একেবারেই আলাদা ও মানবকল্যাণমূলক।
কী কী বিশ্লেষণ করতে পারে এই টয়লেট?
টোটোর স্মার্ট টয়লেট মূলত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সূচক বিশ্লেষণ করে-
১️. মলের আকৃতি
মলকে সাতটি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়- স্বাভাবিক, লম্বা, ছোট ছোট দানা, শক্ত, অতিরিক্ত নরম বা তরল ইত্যাদি।
২️. রঙ
মলের রঙ স্বাস্থ্য সম্পর্কে বড় ইঙ্গিত দেয়। এই টয়লেট তিনটি রঙ শনাক্ত করে-
- হালকা হলুদ
- বাদামী
- গাঢ় বাদামী
৩️. পরিমাণ ও কাঠিন্য
মলের পরিমাণ কম, মাঝারি না বেশি- সেটিও নির্ণয় করা হয়। পাশাপাশি এটি কতটা শক্ত বা নরম, তাও বিশ্লেষণে আসে।
এই তথ্যগুলো হজম সমস্যা, কোষ্ঠকাঠিন্য বা অন্ত্রজনিত অসুস্থতার প্রাথমিক ইঙ্গিত দিতে পারে।
মোবাইল অ্যাপে মিলবে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য রিপোর্ট
টয়লেট থেকে পাওয়া সব তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে যায় ব্যবহারকারীর স্মার্টফোনে থাকা একটি বিশেষ অ্যাপে। ওয়াই-ফাইয়ের মাধ্যমে এই ডেটা সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা হয়।
অ্যাপটিতে পাওয়া যাবে-
- দৈনিক ট্র্যাকিং রিপোর্ট
- সাপ্তাহিক ও মাসিক ট্রেন্ড গ্রাফ
- খাদ্যাভ্যাস ও পানি পানের পরামর্শ
- হজম সমস্যা বা অনিয়ম হলে সতর্কবার্তা
অনেকটাই যেন নীরব এক ব্যক্তিগত ডাক্তার।
কেন প্রয়োজন হলো এমন প্রযুক্তির?
টোটোর এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য-
জাপানের প্রায় ৭৬ শতাংশ মানুষ টয়লেট ব্যবহারের পর নিজের মলের দিকে তাকান স্বাস্থ্য বোঝার জন্য। কিন্তু মাত্র ৬ শতাংশ মানুষ এই তথ্য নিয়মিত সংরক্ষণ করেন।
চিকিৎসকের কাছে গেলে রোগীরা প্রায়ই সঠিকভাবে বলতে পারেন না, মলের রং বা ধরন কেমন ছিল। এই তথ্যের অভাবেই অনেক সময় রোগ নির্ণয় বিলম্বিত হয়।
এই সমস্যার সমাধান হিসেবেই টোটোর এই স্মার্ট প্রযুক্তি- যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য ডেটা সংরক্ষণ করে।
দাম ও মডেল: সাধারণের নাগালের বাইরে?
এই ফিচার যুক্ত করা হয়েছে টোটোর বিলাসবহুল সিরিজ “নিওরেস্ট (Neorest)”-এ।
২০২৫ সালের ১ আগস্ট থেকে বাজারে এসেছে এই মডেলগুলো।
Neorest LS-W
দাম: ৫,৪২,৩০০ ইয়েন
(প্রায় ৪.৩ লাখ টাকা)
Neorest AS-W
দাম: ৪,৯৩,৯০০ ইয়েন
(প্রায় ৩.৯ লাখ টাকা)
দাম বেশি হলেও স্বাস্থ্য সচেতন ও প্রযুক্তিপ্রেমী গ্রাহকদের মধ্যে এরই মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
টোটো কোম্পানি: অতীত থেকে ভবিষ্যৎ
১৯৮০ সালে টোটো প্রথম ‘ওয়াশলেট’ বাজারে এনে স্যানিটেশন জগতে বিপ্লব ঘটায়। চার দশকের বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি পরিচ্ছন্নতা ও আরামের পাশাপাশি এখন জোর দিচ্ছে ওয়েলনেস বা সুস্বাস্থ্য-এর ওপর।
ভবিষ্যতে তারা এমন সেন্সর আনার পরিকল্পনা করছে, যা প্রস্রাব বিশ্লেষণ করে ডায়াবেটিস বা কিডনি রোগের পূর্বাভাস দিতে পারবে।
টোটোর দৃষ্টিতে, টয়লেট শুধু প্রয়োজনীয় স্থান নয়- এটি হতে পারে স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
শেষ কথা
যেভাবে স্মার্টওয়াচ আমাদের হৃদস্পন্দন মাপে, ঠিক সেভাবেই স্মার্ট টয়লেট আমাদের হজম ও অন্ত্রের খবর রাখছে। এখনই হয়তো এটি সবার নাগালে নয়, তবে প্রযুক্তির স্বভাবই হলো সময়ের সঙ্গে সহজলভ্য হওয়া।
হয়তো খুব শিগগিরই আমাদের দেশের বাথরুমেও এমন স্মার্ট টয়লেট দেখা যাবে- যা নীরবে আমাদের সুস্থ থাকার সহযাত্রী হবে।
সূত্রঃ জিও বাংলা টিভি