শনিবার, জানুয়ারি ১০, ২০২৬

মুসলিম জাতির পিতা বলা হয় কোন নবীকে? muslim jatir pita

বহুল পঠিত

ভূমিকা: শিকড় ও উপাধির অর্থ

মুসলিম জাতির শিকড় কোথা থেকে?

মুসলিম জাতির শিকড় তাওহিদ বা আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াতের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। মানবজাতির আদি পিতা নবী আদম (আলাইহিস সালাম) থেকে শুরু করে সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পর্যন্ত সকলেই একই মৌলিক বার্তা প্রচার করেছেন- আল্লাহর একত্ব এবং তাঁর ইবাদত। কিন্তু, মানব ইতিহাসের এক বিশেষ সন্ধিক্ষণে একজন নবীকে তাঁর বিশেষ অবদান ও আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের কারণে ‘মুসলিম জাতির পিতা’ উপাধি দেওয়া হয়।

“জাতির পিতা” উপাধির অর্থ কী?

ইসলামী প্রেক্ষাপটে “জাতির পিতা” (Father of the Nation) উপাধিটির অর্থ কেবল বংশগত সম্পর্ক নয়, বরং এটি একটি আধ্যাত্মিক, আদর্শিক এবং ধর্মীয় ভিত্তি নির্দেশ করে। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়:

  • আদর্শের উৎস: সেই ব্যক্তিত্ব, যার জীবন ও শিক্ষা মুসলিম উম্মাহর মৌলিক আদর্শের ভিত্তি স্থাপন করেছে।
  • নিয়ম-নীতির প্রবর্তক: যিনি এমন কিছু নিয়ম, ইবাদত বা ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা আজও মুসলিম উম্মাহ অনুসরণ করে।
  • বংশীয় কেন্দ্রবিন্দু: যার বংশধরদের মধ্য দিয়ে ইসলামের মূল ধারার বেশিরভাগ নবীর আগমন ঘটেছে।

মুসলিম জাতির পিতা বলা হয় কোন নবীকে?

সরাসরি উত্তর: নবী ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম)

নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-কে মুসলিম জাতির পিতা (Father of the Muslim Nation) বলা হয়।

কেন তাঁকে “মুসলিম জাতির পিতা” বলা হয়?

পবিত্র কুরআনুল কারীমে আল্লাহ্‌ নিজেই এই উপাধিটি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন। তিনি ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি বহু-ঈশ্বরবাদী সমাজ ও নিজ পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে কেবল আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং নিজের জীবনকে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর কাছে ‘ইসলাম’ বা সমর্পণ করেছিলেন।

কুরআনে তাঁর অবস্থান

আল্লাহ তা’আলা সূরা আল-হজ্জের ৭৮ নম্বর আয়াতে স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন:

هُوَ سَمّٰىكُمُ الۡمُسۡلِمِيۡنَ مِنۡ قَبۡلُ وَفِيۡ هٰذَا

বাংলা অর্থ: “তিনি (আল্লাহ) পূর্বে তোমাদের নাম ‘মুসলিম’ রেখেছেন এবং এই (কুরআনেও)।” (সূরা আল-হজ্জ, ২২:৭৮)

তাফসীরবিদদের মতে, এই আয়াতে ‘তিনি’ দ্বারা নবী ইব্রাহিম (আ.)-কে বোঝানো হয়েছে, যিনি তাঁর দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে এই উম্মাহর নাম ‘মুসলিম’ হওয়ার প্রার্থনা করেছিলেন।

কেন নবী ইবরাহিম (আ.) মুসলিম জাতির পিতা?

নবী ইবরাহিম (আ.)–কে মুসলিম জাতির পিতা বলার পেছনে বেশ কিছু ঐতিহাসিক, আদর্শিক ও ধর্মীয় কারণ রয়েছে:

  • তাওহিদের প্রতিষ্ঠা: তিনি ছিলেন সেই দৃঢ়চেতা নবী, যিনি নমরুদের বিশাল সাম্রাজ্যে এবং পৌত্তলিকতার যুগে দাঁড়িয়ে একমাত্র তাওহিদ (আল্লাহর একত্ববাদ) প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর এই সংগ্রামই ইসলামের মূল ভিত্তি।
  • কাবা ঘর নির্মাণে ভূমিকা: আল্লাহর নির্দেশে তিনি তাঁর পুত্র নবী ইসমাইল (আ.)-এর সাথে মক্কার পবিত্র কাবা ঘর পুনর্নির্মাণ করেন, যা মুসলিমদের কিবলা এবং ইবাদতের কেন্দ্রবিন্দু।
  • তাঁর বংশধরদের মাধ্যমে অনেক নবীর আগমন: ইবরাহিম (আ.)-এর দুই পুত্র, নবী ইসমাইল (আ.) এবং নবী ইসহাক (আ.)
    • নবী ইসমাইল (আ.)-এর বংশধারায় সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমন ঘটে।
    • নবী ইসহাক (আ.)-এর বংশধারায় বনি ইসরাইলের বহু নবী-রাসূল (যেমন: মূসা, ঈসা, ইউসুফ, দাঊদ, সুলাইমান প্রমুখ আলাইহিমুস সালাম) এর আগমন ঘটে। এই বংশগত ধারা তাঁকে একটি কেন্দ্রীয় স্থানে প্রতিষ্ঠিত করে।
  • ইসলামি শিক্ষার ভিত্তি স্থাপন: হজ্জ, কুরবানি এবং খতনার মতো মৌলিক ইসলামী বিধান তাঁর জীবন ও ত্যাগের ঘটনা থেকে এসেছে।

তাঁর দোয়া: “উম্মতে মুসলিমা” গঠনের জন্য প্রার্থনা

তিনি এবং তাঁর পুত্র ইসমাইল (আ.) কাবা ঘর নির্মাণের পর দোয়া করেছিলেন:

“হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি তাদের মধ্য থেকে তাদের কাছে একজন রাসূল প্রেরণ করুন, যিনি আপনার আয়াতসমূহ তাদের কাছে তেলাওয়াত করবেন, কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেবেন এবং তাদের পরিশুদ্ধ করবেন।” (সূরা আল-বাকারা, ২:১২৯)

এই দোয়াটিই ছিল শেষ নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর উম্মত গঠনের জন্য একটি মৌলিক প্রার্থনা।

কুরআনে নবী ইব্রাহিম (আ.) সম্পর্কে উল্লেখ

মুসলিম জাতির নেতা হিসেবে পরিচয়

কুরআন তাঁকে মুসলিম জাতির আদর্শ নেতা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়। আল্লাহ বলেন:

“নিশ্চয় ইবরাহিম ছিলেন এক উম্মত (নেতা বা আদর্শ), আল্লাহর প্রতি একান্ত অনুগত এবং মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।” (সূরা আন-নাহল, ১৬:১২০)

তাওহিদের প্রতি তাঁর দৃঢ়তা

কুরআন তাঁর দৃঢ়তাকে বিশেষভাবে তুলে ধরেছে। তিনি মূর্তিপূজা প্রত্যাখ্যান করে ঘোষণা করেন:

“আমি একনিষ্ঠভাবে তাঁর দিকে মুখ ফিরিয়েছি, যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, আর আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।” (সূরা আল-আন’আম, ৬:৭৯)

আল্লাহর পরীক্ষায় সফলতা

আল্লাহ তাঁকে বিভিন্ন কঠিন পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করেছেন এবং তিনি সবগুলোতে উত্তীর্ণ হয়েছেন। তাঁকে তাঁর প্রিয় পুত্র কুরবানি করার নির্দেশ দেওয়া হয়, যা তিনি পালন করতে প্রস্তুত ছিলেন- এটাই ছিল আল্লাহর কাছে তাঁর নিখুঁত আত্মসমর্পণ বা ইসলামের চূড়ান্ত প্রমাণ।

নবী ইব্রাহিম (আ.)- এর জীবনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

  • জন্ম ও বেড়ে ওঠা: তিনি ইরাকের ব্যাবিলন বা উর শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আযর ছিলেন মূর্তিনির্মাতা।
  • মূর্তিপূজা বিরোধী আন্দোলন: তরুণ বয়সে তিনি তার বাবা ও সমাজের মূর্তি ও নক্ষত্রপূজার প্রতিবাদ করেন এবং এক আল্লাহকে প্রকাশ্যে প্রচার করতে শুরু করেন।
  • আগুনে নিক্ষেপ: তাওহিদের দাওয়াত দেওয়ার অপরাধে নমরুদের নির্দেশে তাঁকে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়, কিন্তু আল্লাহর অলৌকিক কৃপায় তিনি অক্ষত থাকেন।
  • স্ত্রী হাজেরা ও পুত্র ইসমাইল (আ.): আল্লাহর নির্দেশে তিনি তাঁর স্ত্রী হাজেরা এবং শিশুপুত্র ইসমাইলকে মক্কার জনমানবহীন প্রান্তরে রেখে আসেন। এই ঘটনা থেকেই জমজম কূপ ও সাফা-মারওয়ার সাঈ শুরু হয়।
  • কাবা পুনর্নির্মাণ: বার্ধক্যে উপনীত হওয়ার পর তিনি পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে সঙ্গে নিয়ে কাবা শরিফ পুনর্নির্মাণ করেন।
  • কুরবানি পরীক্ষার ঘটনা: স্বপ্নে তাঁর প্রিয় পুত্রকে কুরবানি করার নির্দেশ আসে, যা আল্লাহর প্রতি তাঁর চরম আনুগত্যের প্রতীক।

মুসলিম উম্মাহর প্রতি নবী ইবরাহিম (আ.)- এর অবদান

মুসলিম উম্মাহর ধর্মীয় জীবনে তাঁর অবদান অপরিসীম, যা তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে:

  • হজের বিধান: হজের বেশিরভাগ আনুষ্ঠানিকতা (যেমন কাবা তাওয়াফ, সাফা-মারওয়ার সাঈ, মিনা, আরাফাহ এবং কুরবানি) সরাসরি তাঁর ও তাঁর পরিবারের স্মৃতি বিজড়িত।
  • কোরবানি: ঈদুল আযহার কুরবানি তাঁর সেই মহান ত্যাগেরই অনুসরণ।
  • তাওহিদের দাওয়াত: তিনি এমন এক আদর্শের ভিত্তি স্থাপন করেছেন, যেখানে জীবন ও ইবাদতের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
  • মুসলিম পরিচয়ের মূল ভিত্তি: আল্লাহর কাছে পূর্ণাঙ্গ আত্মসমর্পণের জীবনবোধই হলো প্রকৃত মুসলিমের পরিচয়, যা ইবরাহিম (আ.)-এর মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করে।

ইসলামিক ইতিহাসে নবী ইবরাহিম (আ.)–এর প্রভাব

নবী ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম) হলেন এমন এক কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব, যাঁর আদর্শ, ত্যাগ ও একনিষ্ঠতা ইসলাম ধর্মের মৌলিক কাঠামো তৈরি করেছে। তাঁর জীবন ছিল নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম এবং আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের প্রতীক।

কেন তাঁকে সত্যিকার অর্থেই “মুসলিম জাতির পিতা” বলা হয়

মুহাম্মাদ (সা.)-এর উম্মত থেকে শুরু করে পৃথিবীর সমস্ত তাওহিদবাদী জাতিগোষ্ঠীর পূর্বসূরী হিসেবে এবং আল্লাহর নির্দেশেই তাঁর উম্মাহকে ‘মুসলিম’ নামে ডাকার কারণে তাঁকে সত্যিকার অর্থেই মুসলিম জাতির পিতা বলা হয়। তাঁর শিক্ষাই মুসলিম উম্মাহর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- অর্থাৎ, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহ্‌র প্রতি ইসলাম (আত্মসমর্পণ) প্রদর্শন করা।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর (FAQ)

কেন তাঁকে “খলিলুল্লাহ” বলা হয়?

উত্তর: “খলিলুল্লাহ” (Khalilullah) অর্থ আল্লাহর বন্ধু। ইবরাহিম (আ.)-কে এই উপাধি দেওয়া হয়, কারণ তিনি আল্লাহর প্রতি এমন নিঃশর্ত ভালোবাসা ও আনুগত্য দেখিয়েছিলেন যে, তিনি তাঁর জীবনের সবচেয়ে প্রিয় বস্তু (এমনকি তাঁর পুত্রকেও) আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ করতে প্রস্তুত ছিলেন।

নবী ইসমাইল (আ.) এবং ইবরাহিম (আ.)–এর সম্পর্ক কী?

উত্তর: নবী ইসমাইল (আ.) ছিলেন নবী ইবরাহিম (আ.)-এর প্রথম স্ত্রী হাজেরা (আ.)-এর গর্ভজাত প্রথম পুত্র।

ইবরাহিমি মিল্লাত বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: ইবরাহিমি মিল্লাত (Millat Ibrahim) বলতে নবী ইবরাহিম (আ.)–এর জীবন আদর্শ ও দ্বীনকে বোঝানো হয়।

এই মিল্লাতের মূল শিক্ষা হলো তাওহিদ বা এক আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস এবং শিরক বর্জন করে পূর্ণাঙ্গ আত্মসমর্পণ। ইসলাম ধর্ম নিজেকে ইবরাহিমি মিল্লাতেরই পুনঃপ্রতিষ্ঠা হিসেবে দেখে।

তাঁর বংশধরদের মাধ্যমে কোন কোন নবীর আগমন ঘটেছে?

উত্তর: তাঁর বংশধরদের দুটি প্রধান ধারা থেকে নবীদের আগমন ঘটেছে:

  1. নবী ইসমাইল (আ.)-এর বংশ: সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ (সা.)
  2. নবী ইসহাক (আ.)-এর বংশ: বনি ইসরাইলের প্রায় সকল নবী,

যেমন নবী মূসা (আ.), নবী ঈসা (আ.), নবী ইউসুফ (আ.), নবী দাঊদ (আ.), নবী সুলাইমান (আ.) প্রমুখ।

    আরো পড়ুন

    ব দিয়ে মেয়েদের ইসলামিক নাম অর্থসহ | B Diye Meyeder Islamic Name

    আপনার ঘরে কি নতুন অতিথি আসছে? একটি ফুটফুটে কন্যা শিশু মানেই জান্নাতের সুসংবাদ। সন্তানের আগমনের খুশির সাথে সাথে বাবা-মায়ের সবচেয়ে আনন্দের দায়িত্ব হলো তার জন্য একটি সুন্দর, অর্থবহ এবং শ্রুতিমধুর নাম রাখা।

    জানাজার নামাজের সঠিক নিয়ম সহ পূর্ণাঙ্গ গাইড | Janajar Namaz Bangla

    মানুষ মরণশীল। প্রতিটি প্রাণকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু ইসলাম ধর্মে মৃত্যু মানেই শেষ নয়, বরং এটি অনন্তকালের জীবনের শুরু। আমাদের কোনো আপনজন যখন এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান, তখন তার জন্য আমাদের পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় উপহার হলো "জানাজার নামাজ"।

    রমজানের সময় সূচি ২০২৬, সেহরি ও ইফতারের দোয়া এবং বিস্তারিত

    মুসলিম উম্মাহর জন্য রমজান মাস অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। এই মাসে সিয়াম সাধনা ফরজ হয়। সঠিক সময়ে সাওম পালন জরুরি। তাই সেহরি ও ইফতারের সময়সূচী জানা প্রয়োজন। রমজানের সময় সূচি ২০২৬ নিচে দেওয়া হলো। এই তালিকাটি ঢাকার স্থানীয় সময় অনুযায়ী তৈরি। অন্যান্য জেলায় সময় এক থেকে দুই মিনিট পরিবর্তন হতে পারে। আসুন জেনে নিই সেহরি ও ইফতারের দোয়া এবং তারিখ।
    - Advertisement -spot_img

    আরও প্রবন্ধ

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    - Advertisement -spot_img

    সর্বশেষ প্রবন্ধ