সূরা মাউন পরিচিতি ও পটভূমি | sura maun
পবিত্র কুরআনের ১০৭ নম্বর সূরা হলো সূরা আল-মাউন (Surah Al-Ma’un)। এই সূরাটি ‘মাউন’ বা সামান্য সাহায্য/দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে আলোচনা করে। এটি মক্কায় অবতীর্ণ একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূরা, যা মুনাফিক বা লোক-দেখানো ইবাদতকারী এবং অভাবীদের প্রতি উদাসীন ব্যক্তিদের কঠোর নিন্দা করেছে। এর মূল বিষয়বস্তু হলো- শুধু নামাজ পড়াই যথেষ্ট নয়, বরং সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানুষের প্রতি মানবিকতাও ঈমানের অপরিহার্য অংশ।
সূরা মাউন এর শানে নুযুল
অধিকাংশ তাফসীরবিদদের মতে, এই সূরাটি মক্কার সেইসব ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে নাজিল হয়েছিল, যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করত ঠিকই, কিন্তু দরিদ্র, অনাথ ও মিসকিনদের প্রতি চরম উদাসীন ছিল। এমনকি তারা লোক-দেখানোর জন্য নামাজ পড়ত এবং সাধারণ জিনিসপত্রও প্রতিবেশীকে দিতে অস্বীকার করত। সূরাটি বিশেষ করে ওয়ালিদ বিন মুগীরাহ বা আবু জাহেল এর মতো কিছু কুরাইশ নেতার ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণকে ইঙ্গিত করে, যারা অনাথের অধিকার ছিনিয়ে নিত এবং নামাজে গাফেলতি করত।
সূরা মাউন আরবি উচ্চারণ
بِسۡمِ اللهِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِيۡمِ
| আয়াত | আরবি |
| ১ | اَرَءَيۡتَ الَّذِيۡ يُكَذِّبُ بِالدِّيۡنِؕ |
| ২ | فَذٰلِكَ الَّذِيۡ يَدُعُّ الۡيَتِيۡمَۙ |
| ৩ | وَلَا يَحُضُّ عَلٰى طَعَامِ الۡمِسۡكِيۡنِؕ |
| ৪ | فَوَيۡلٌ لِّلۡمُصَلِّيۡنَۙ |
| ৫ | الَّذِيۡنَ هُمۡ عَنۡ صَلَاتِهِمۡ سَاهُوۡنَۙ |
| ৬ | الَّذِيۡنَ هُمۡ يُرَآءُوۡنَۙ |
| ৭ | وَيَمۡنَعُوۡنَ الۡمَاعُوۡنَ |
বাংলা উচ্চারণ | sura maun bangla uccharon
- আ-রাআইতাল্লাযী ইউকাযযিবু বিদ্দীন।
- ফাযা-লিকাল্লাযী ইয়াদু’উল ইয়াতীম।
- ওয়ালা ইয়াহুদ্দু ‘আলা-ত্বা‘আ-মিল মিছকীন।
- ফাওয়াইলুল লিলমুছাল্লীন।
- আল্লাযীনা হুম ‘আন ছালা-তিহিম সা-হূন।
- আল্লাযীনা হুম ইউরা-ঊন।
- ওয়া ইয়ামনা‘ঊনাল মা-‘ঊন।
সূরা মাউনের বাংলা অর্থ | sura maun er ortho
- আপনি কি তাকে দেখেছেন, যে দ্বীনকে (প্রতিফল দিবসকে/দ্বীনকে) অস্বীকার করে?
- এ তো সেই ব্যক্তি, যে ইয়াতীমকে ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেয়।
- এবং অভাবী বা মিসকিনদের খাবার দিতে উৎসাহ দেয় না।
- অতএব, দুর্ভোগ (বা ধ্বংস) সেই সব নামাজ আদায়কারীদের জন্য,
- যারা তাদের নামাজ সম্পর্কে উদাসীন বা গাফেল।
- যারা লোক-দেখানোর জন্য (ইবাদত) করে।
- এবং সাধারণ ব্যবহারের বস্তুসমূহও (মাউন) অন্যকে দিতে বিরত থাকে।
সূরা মাউন এর তাফসীর ও শিক্ষা
এই সূরা মুনাফিকদের তিনটি প্রধান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে, যা তাদের ইবাদতকে মূল্যহীন করে দেয়। এই সূরায় আল্লাহ নিম্নলিখিত বিষয়গুলোকে ভণ্ডামি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন:

| বিষয় | ব্যাখ্যা |
| অনাথ ও অভাবীদের অধিকার লঙ্ঘন | যারা এতিমের প্রতি কঠোর ও অভাবীকে সাহায্য করতে উৎসাহিত করে না। এটা হচ্ছে সামাজিক ন্যায়বিচার ও দানশীলতার গুরুত্ব অস্বীকার করা। |
| নামাজে গাফিলতি | যারা নামাজে দাঁড়ায় ঠিকই, কিন্তু মনযোগ, সময় জ্ঞান বা গুরুত্বের দিক থেকে উদাসীন। নামাজের মূল উদ্দেশ্য, অর্থাৎ আল্লাহভীতি ও সমাজসেবার প্রতি তাদের কোনো খেয়াল থাকে না। |
| রিয়াকরি (লোক-দেখানো) ইবাদত | তাদের ইবাদতের উদ্দেশ্য আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা নয়, বরং মানুষকে দেখিয়ে নাম ও খ্যাতি অর্জন করা। |
| মাউনের অর্থ (অল্প সাহায্য) | মাউন শব্দের অর্থ হলো সামান্য সাহায্য বা দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিস (যেমন: লবণ, আগুন, হাঁড়ি-পাতিল,পাসুন,খুন্তি ইত্যাদি)। যারা এসব সামান্য জিনিসও প্রতিবেশীকে দিতে কার্পণ্য করে, তারা কীভাবে বড় দান করবে? |
এই সূরায় যা বলা হয়েছে
- ভণ্ডামির চিত্রায়ন: এই সূরার মাধ্যমে আল্লাহ দেখিয়েছেন, শুধু আনুষ্ঠানিক ইবাদত (যেমন নামাজ) যথেষ্ট নয়। যদি সেই ইবাদতের সাথে সামাজিক দায়িত্ববোধ ও মানবপ্রেম যুক্ত না হয়, তবে তা ভণ্ডামি।
- ঈমানের পূর্ণতা: একজন প্রকৃত মুমিন হবে সমাজের দুর্বল মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল, নামাজে মনোযোগী এবং লোক-দেখানো ইবাদত থেকে মুক্ত।
সূরা মাউন থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা
এই সূরাটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু নৈতিক ও সামাজিক শিক্ষা দেয়:
- ১. সাহায্য ও সহানুভূতির গুরুত্ব: দরিদ্র, অনাথ ও অসহায়দের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া এবং তাদের প্রতি দয়া দেখানো ঈমানের অপরিহার্য অংশ।
- ২. দান না করা বা তুচ্ছ করা বড় গুনাহ: সামান্য জিনিস দিয়েও সাহায্য করতে কার্পণ্য করা (যেমন মাউন) আল্লাহর কাছে অত্যন্ত অপছন্দনীয়।
- ৩. নামাজে মনোযোগী হওয়া: সময় মতো এবং পূর্ণ মনোযোগের সাথে নামাজ আদায় করা অত্যাবশ্যক। গাফিলতি করে নামাজ পড়া ধ্বংস ডেকে আনে।
- ৪. রিয়াকরি (দেখানো) ইবাদতের ক্ষতি: লোক-দেখানোর জন্য ইবাদত করলে তা আল্লাহর কাছে কবুল হয় না এবং এটি শিরকের একটি ক্ষুদ্র রূপ।
- ৫. সমাজে দুর্বল মানুষের অধিকার: সমাজে এতিম, মিসকিন ও অভাবীদের অধিকার সুনিশ্চিত করা রাষ্ট্রের ও মুমিনদের নৈতিক দায়িত্ব।
সূরাটি পাঠের ফজিলত ও উপকারিতা
সূরা মাউন পাঠের সরাসরি হাদীসগত ফজিলত ছাড়াও, এর শিক্ষা আমাদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে:
- নৈতিক চরিত্র গঠনে ভূমিকা: এটি আমাদের হৃদয়কে মানবিকতা ও সহানুভূতিতে পূর্ণ করতে সাহায্য করে।
- দরিদ্র, অনাথ ও অসহায়দের প্রতি দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়: এটি সবসময় আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমাদের সম্পদে সমাজের দুর্বল মানুষের হক রয়েছে।
- রিয়া বর্জনের শিক্ষা: অন্তরকে পরিশুদ্ধ করতে এবং ইবাদতে একনিষ্ঠতা অর্জনে এটি অত্যন্ত সহায়ক।
- দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার বার্তা: যে ব্যক্তি তার নামাজে একাগ্র এবং সামাজিক দায়িত্বে সচেতন, তার জন্যই দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে সফলতা।
সূরা মাউন সম্পর্কিত প্রশ্নোত্তর (FAQs)
১. সূরা মাউন কখন নাজিল হয়?
উত্তর: সূরা মাউন মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছিল।
২. “মাউন” শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: “মাউন” শব্দের অর্থ হলো সামান্য সাহায্য বা দৈনন্দিন ব্যবহারের ছোটখাটো জিনিসপত্র (যেমন লবণ, পানি, ধার করার পাত্র ইত্যাদি)।
৩. সূরা মাউন পড়ার ফজিলত কী?
উত্তর: যদিও সম্ভবত এই সূরা পাঠের ফজিলত সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোন হাদীস নেই, তবে এর শিক্ষানুসারে কাজ করলে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন হয়। এটি মূলত মানুষের প্রতি দায়িত্ব ও রিয়া বর্জনের মাধ্যমে ঈমানকে শক্তিশালী করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
৪. সূরা মাউন কুরআনের কত নম্বর সূরা?
উত্তর: সূরা মাউন পবিত্র কুরআনের ১০৭ নম্বর সূরা।
৫. এই সূরা কোন দৈনন্দিন শিক্ষায় উপকারী?
উত্তর: এই সূরাটি আমাদের স্বার্থপরতা ত্যাগ করে এবং সামাজিক সহানুভূতিশীল হয়ে জীবন যাপনে উৎসাহিত করে।
৬. মুসাল্লিন শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: মুসাল্লিন (المصلين) শব্দের অর্থ হলো নামাজ আদায়কারী বা যারা সালাত পড়ে।
৭.পবিত্র কুরআনের ১১১তম সূরা কোনটি ?
উত্তর: পবিত্র কুরআনুল কারিমের ১১১তম সূরা হচ্ছে সূরা লাহাব।
৮. সূরা ইখলাস কোথায় অবতীর্ণ হয়েছিল?
উত্তর: মক্কায়





