২০০৯ সালের পিলখানা ট্র্যাজেডি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক মর্মান্তিক ও নৃশংস ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত। দীর্ঘ ১৬ বছর পর অবশেষে সেই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ পিলখানা হত্যাকাণ্ড তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়া হচ্ছে। আগামী ৩০ নভেম্বর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে এই বিশাল ও বিস্তৃত তদন্ত প্রতিবেদন তুলে দেবে জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন।
এই প্রতিবেদনে রয়েছে সহস্রাধিক পৃষ্ঠার বিশ্লেষণ, সাক্ষ্য, প্রমাণ, বিবরণ এবং দেশি–বিদেশি ষড়যন্ত্রের বিস্তারিত তথ্য। এর মাধ্যমে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের প্রকৃতি, উদ্দেশ্য, দায়ী ব্যক্তিদের নাম ও ভূমিকা আরও স্পষ্ট হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
১৬ বছরের অপেক্ষার অবসান: কমিশনের তদন্ত প্রায় শেষ
গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর গঠিত ৮ সদস্যের স্বাধীন তদন্ত কমিশন টানা ১১ মাস কাজ করে এই প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছে। প্রাথমিকভাবে ৩ মাস সময় দেওয়া হলেও ধাপে ধাপে কমিশনের মেয়াদ বাড়িয়ে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত করা হয়।
কমিশনের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান জানিয়েছেন-
“সফল হওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই—আমরা সফলভাবেই তদন্ত শেষ করেছি।”
তদন্তে কী উঠে এসেছে?
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, পিলখানা হত্যাকাণ্ড তদন্ত রিপোর্ট–এ উঠে এসেছে-
- বিডিআর সদর দফতরে হত্যাযজ্ঞ ছিল আগে থেকে পরিচালিত একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র
- এটি ছিল সাধারণ বিদ্রোহ নয়, বরং সেনা কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে সংগঠিত পরিকল্পিত আক্রমণ
- দেশি–বিদেশি স্বার্থগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার প্রমাণ
- তৎকালীন দায়িত্বে থাকা সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তাদের গাফিলতি
- অনেককে আগেই ঘটনা সম্পর্কে সতর্ক করা হলেও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া
- উদ্ধার অভিযান বিলম্বিত হওয়ার রহস্য
- ঘটনার আগে–পরে দোষীদের অপকর্ম ও আলামত নষ্টের কার্যক্রম
এছাড়াও প্রতিবেদনে রয়েছে-
- পদে পদে দায়িত্বে অবহেলার বিবরণ
- ষড়যন্ত্রকারীদের ভূমিকা
- ভুক্তভোগী পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বেদনাময় বর্ণনা
- বহুসংখ্যক দেশি–বিদেশি ব্যক্তি, সংগঠন ও গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা শনাক্তকরণ
যাদের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে
তদন্ত কমিশন মোট শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর জবানবন্দি নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন-
- সাবেক সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর প্রধানরা
- ডিজিএফআই, এনএসআইসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা
- তৎকালীন আইজি, ডিএমপি কমিশনারসহ উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা
- সাংবাদিক, আমলা ও বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ
- কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ও কারামুক্ত বিডিআর সদস্য
- বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তি, কিছুজন জেলে বসে সাক্ষ্য দিয়েছেন
- পলাতক নেতারাও ই-মেইলে জবানবন্দি পাঠিয়েছেন
তবে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়-
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাক্ষ্য দিতে কমিশনের ডাকে সাড়া দেননি।
২০০৯ সালের সেই কালরাত: কী ঘটেছিল?
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি, রাজধানীর পিলখানায় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিডিআরের সদর দফতরে ঘটে ভয়াবহ বিদ্রোহ ও হত্যাযজ্ঞ।
এই ঘটনায়-
- ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা নিহত হন
- মোট ৭৪ জন প্রাণ হারান
- পুরো জাতি স্তম্ভিত হয়ে পড়ে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়
পরবর্তীতে বিডিআরের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়-
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)
আগের তদন্ত কমিটির সীমাবদ্ধতা
কমিশন আগের দুইটি সরকারি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনও বিশ্লেষণ করেছে এবং দেখেছে-
- আগের তদন্তে রাজনৈতিক প্রভাব ছিল
- কিছু গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে প্রশ্ন করার সুযোগ ছিল না
- অনেক সাক্ষ্য নিতে বাধা তৈরি হয়েছিল
স্বাধীন তদন্ত কমিশন তাই নতুন করে-
- বাদ পড়া আসল অপরাধীদের শনাক্ত
- ষড়যন্ত্রের পূর্ণ বিবরণ
- আন্তর্জাতিক সংযোগের অনুসন্ধান
- আলামত ধ্বংসের প্রমাণ
-সবকিছু বিস্তারিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
নতুন সুপারিশ কী থাকতে পারে?
প্রতিবেদনে থাকতে পারে-
- দায়ী ব্যক্তি/গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নতুন মামলা বা পুরোনো মামলা পুনরায় চালুর সুপারিশ
- বিডিআরের নাম পরিবর্তনের পেছনের যৌক্তিকতা
- নতুন নিরাপত্তা কাঠামো
- গোয়েন্দা ব্যবস্থার সংস্কার
- সামরিক ও বেসামরিক সমন্বয় জোরদারের পরামর্শ
পিলখানা হত্যাকাণ্ড তদন্ত রিপোর্ট জমা-তারপর কী?
৩০ নভেম্বর প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হবে। তবে এরপর-
- সরকার চাইলে নতুন করে মামলা করতে পারে
- রিভাইভ করা হতে পারে পুরোনো মামলা
- দোষীদের বিরুদ্ধে পৃথক বিচার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে
- প্রতিবেদনের একটি অংশ গণ-উপস্থাপন বা সংক্ষিপ্তসার প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে
১৬ বছর ধরে দেশের মানুষের মনে জমে থাকা এক বড় প্রশ্নের উত্তর মিলবে এখন।
পিলখানা হত্যাকাণ্ড তদন্ত রিপোর্ট ঘিরে জাতি অপেক্ষায় আছে সত্য উদঘাটনের-
কে ছিল দায়ী? কেন এই হত্যা? কার স্বার্থে এই ষড়যন্ত্র?
৩০ নভেম্বরের প্রতিবেদন–হস্তান্তর এই অধ্যায়ের একটি বড় মাইলফলক হয়ে থাকবে।
সুত্র: দৈনিক সংগ্রাম