ঢাকায় শীতকালীন সবজিতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে রাসায়নিকের ব্যবহার জনস্বাস্থ্যে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। কিছু ব্যবসায়ী ও কৃষক সবজিকে আকর্ষণীয়, দ্রুত পচন রোধ এবং অধিক মুনাফালোভের আশায় শীতের এসব সবজিতে মারাত্মক বিষ প্রবেশ করাচ্ছে। ফলে ঢাকার অধিক স্বাস্থ্য সচেতন সবজি মানুষও মারাত্বক ঝুঁকির মধ্যে নিপতিত। তারা নিজেদের সুস্বাস্থ্যের জন্য ফাস্ট ফুড কিংবা মাছ,মাংশ না খেলেও এসব বিষ মিশ্রিত শাক-সবজি খেয়ে যে ক্ষতিতে পড়ছে তা তাদের কল্পনার থেকেও ভয়ঙ্কর।
সবজিতে বিষ মেশানোর কারণ
প্রধানত অতিরিক্ত লাভের লোভ এবং দ্রুত ফলন বা ফল পাকানোর চেষ্টা এই অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক ব্যবহারের মূল কারণ।
- অতিরিক্ত লাভের লোভ: দ্রুত ফসল বাজারে এনে চড়া দামে বিক্রি করা বা পচন থেকে বাঁচিয়ে বেশি দিন সংরক্ষণ করার জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক যেমন, ফরমালিন বা রঙিন রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়।
- দ্রুত ফলন পাওয়ার চেষ্টা: অপরিপক্ক ফল বা সবজিকে দ্রুত পরিপক্ক ও আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য কার্বাইডের মতো হরমোন ও রাসায়নিক ব্যবহার করা।
- ফসল রক্ষা করতে অতিরিক্ত কীটনাশক: পোকামাকড়ের হাত থেকে ফসলকে রক্ষা করতে প্রয়োজনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি কীটনাশক ব্যবহার করা এবং নির্ধারিত ‘অপেক্ষা সময়’ (Withdrawal period) না পেরোতেই তা বাজারে আনা।
কোন কোন সবজিতে বেশি বিষাক্ততা ধরা পড়ে?
গবেষণা ও পরীক্ষার ফল অনুযায়ী, শীতকালীন সবজির মধ্যে কয়েকটি নির্দিষ্ট সবজিতে কীটনাশক ও অন্যান্য রাসায়নিকের উপস্থিতি বেশি পাওয়া যায়।
গবেষণা ও পরীক্ষা থেকে পাওয়া তথ্য
- ফুলকপি ও বাঁধাকপি: এদের কাঠামোয় কীটনাশকের অবশেষ সহজে জমা হতে পারে।
- টমেটো ও বেগুন: ফলন দ্রুত পাকাতে বা আকর্ষণীয় রঙ দিতে রাসায়নিকের অপব্যবহার করা হয়।
- শিম: অধিক ফলনের জন্য হরমোন ও পোকামাকড় দমনে কীটনাশকের ব্যবহার বেশি হয়।
- লাউ, কুমড়া: দ্রুত বৃদ্ধি ও সংরক্ষণের জন্য রাসায়নিক ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যায়।
ঢাকার কোন কোন বাজারে বিষাক্ত সবজির প্রমাণ মিলেছে?
ঢাকার বিভিন্ন বাজারে চালানো অভিযানে ভেজাল বা বিষাক্ত সবজির প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে যেসব বাজারে নজরদারি কম, সেখানে এই প্রবণতা বেশি।
- কর্পোরেশন বাজার (কিছু অংশ): বড় বাজারে নজরদারি থাকলেও, কিছু অংশে অনিয়ম দেখা যায়।
- রাস্তার পাশে ভ্রাম্যমাণ বাজার: এই সব বাজারে তদারকি কম থাকায় বিষাক্ত সবজি বিক্রির সুযোগ বেশি থাকে।
- পাইকারি বাজার: এই বাজারগুলো থেকে সবজি সারাদেশে সরবরাহ হয়, তাই এখানে রাসায়নিক প্রয়োগ করে সবজি দ্রুত সংরক্ষণ করার প্রবণতা দেখা যায়। যেমন: কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী, বা মিরপুরের কিছু পাইকারি বাজার গুলোতে অসাধু কিছু ব্যবসায়ী এসব কার্যক্রমে জড়িত।
সবজিতে কোন কোন রাসায়নিক পাওয়া যাচ্ছে?
সবজিকে সতেজ, আকর্ষণীয় ও দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য কিছু মারাত্মক ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়।
সাধারণত পাওয়া ক্ষতিকর উপাদান
| রাসায়নিকের নাম | ব্যবহারের কারণ |
| কার্বাইড (Calcium Carbide) | অপরিপক্ক ফল/সবজি (যেমন টমেটো) দ্রুত পাকানো বা কৃত্রিমভাবে রঙ আনা। |
| ফরমালিন (Formalin) | পচন রোধ করে সবজিকে দীর্ঘদিন সতেজ রাখা। |
| অতিরিক্ত কীটনাশক | পোকামাকড় বা রোগ দমন এবং ফলন বৃদ্ধি। (যেমন: ডাইমেথোয়েট, ম্যালাথিয়ন) |
| রঙিন রাসায়নিক | সবজিকে উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয় রঙ দেওয়া (যেমন: কাঁচা মরিচ বা শিমের উজ্জ্বলতা বাড়ানো)। |
এসব রাসায়নিক কী ক্ষতি করে?
এই রাসায়নিকগুলো মানবদেহের জন্য খুবই ক্ষতিকর এবং তাৎক্ষণিক বা দীর্ঘমেয়াদী, উভয় ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
স্বল্পমেয়াদী সমস্যা
রাসায়নিক মিশ্রিত সবজি খাওয়ার অল্প সময়ের মধ্যে নিম্নলিখিত সমস্যাগুলো দেখা দিতে পারে:
- পেট ব্যথা, বমি: হজমতন্ত্রে রাসায়নিকের বিষক্রিয়ার কারণে।
- মাথা ঘোরা ও দুর্বলতা: স্নায়ুতন্ত্রে প্রভাবের কারণে।
- ডায়রিয়া: পরিপাকতন্ত্রের প্রদাহের ফলে।
- শ্বাসকষ্ট (তীব্র ক্ষেত্রে): কীটনাশকের তীব্র বিষক্রিয়ায়।
দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি
নিয়মিত অল্প পরিমাণে বিষাক্ত রাসায়নিক শরীরে প্রবেশ করলে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়:
- কিডনি ও লিভারের ক্ষতি (Liver and Kidney Damage): রাসায়নিকগুলো মূলত লিভার ও কিডনি দ্বারা প্রক্রিয়াজাত ও নিষ্কাশিত হয়। দীর্ঘমেয়াদী বিষক্রিয়ায় এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো বিকল হতে পারে।
- ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি: ফরমালিন এবং কিছু কীটনাশক (Organophosphates) কার্সিনোজেনিক (ক্যান্সার সৃষ্টিকারী) হিসেবে পরিচিত।
- হরমোনাল সমস্যা: কিছু রাসায়নিক হরমোনের কাজে হস্তক্ষেপ করে, যা প্রজনন ও শিশুদের বৃদ্ধিতে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
- স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি: অতিরিক্ত কীটনাশক নিউরোটক্সিন হিসেবে কাজ করে, যা স্মৃতিশক্তি হ্রাস বা পারকিনসন্স রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সাধারণ ভোক্তারা কীভাবে বিষাক্ত সবজি চিহ্নিত করবেন?
যদিও শতভাগ নিশ্চিত হওয়া কঠিন, তবুও কিছু বাহ্যিক লক্ষণ দেখে বিষাক্ত রাসানিকযুক্ত সবজি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
- অস্বাভাবিক উজ্জ্বলতা ও খুব বেশি চকচকে: সবজির স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উজ্জ্বল বা কৃত্রিমভাবে চকচকে দেখাবে।
- কৃত্রিম রঙের চিহ্ন: সবজিতে এমন রঙ দেখা যাবে, যা দেখে মনে হবে এটি স্বাভাবিক নয় বা কৃত্রিম রং ব্যবহার করা হয়েছে (যেমন: অত্যধিক সবুজ বা অস্বাভাবিক লাল টমেটো)।
- হাতে লাগলে রঙ ছড়ানো: রঙিন রাসায়নিক ব্যবহার করলে সবজি বা ফলের গায়ে হাত দিলে রঙ ছড়িয়ে যেতে পারে।
- কীটনাশকের গন্ধ: কিছু ক্ষেত্রে তীব্র কীটনাশকের ঝাঁঝালো গন্ধ পাওয়া যেতে পারে।
সাবধানে সবজি পরিষ্কার করার নিরাপদ উপায়
সঠিকভাবে পরিষ্কার করলে সবজির উপরিভাগে লেগে থাকা বেশিরভাগ রাসায়নিকের অবশেষ দূর করা সম্ভব।
রাসায়নিক দূর করতে করণীয়
- লবণ-পানি ব্যবহার: এক লিটার পানিতে এক চা চামচ লবণ মিশিয়ে সেই দ্রবণে সবজি ২০ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন। এটি অনেক কীটনাশক ও রাসায়নিকের অবশেষ দূর করতে কার্যকর।
- ভিনেগার মেশানো পানি: এক মগ পানিতে এক চা চামচ সাদা ভিনেগার মিশিয়ে সবজি ১০-১৫ মিনিট ভিজিয়ে রাখা যেতে পারে।
- ভালোভাবে ধোয়া: ভিজিয়ে রাখার পর কলের পানির নিচে প্রবাহিত ধারায় নরম ব্রাশ বা হাত দিয়ে আলতোভাবে ঘষে ভালোভাবে ধুতে হবে।
- খোসা ছাড়ানো: সম্ভব হলে যেসব সবজির খোসা খাওয়া হয় না, সেগুলোর খোসা ছাড়িয়ে ব্যবহার করা সবচেয়ে নিরাপদ।
সরকার ও প্রশাসনের ভূমিকা: কী করা উচিত?
এই সমস্যা সমাধানে সরকার ও প্রশাসনের সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
- বাজারে নিয়মিত অভিযান: খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ, বিএসটিআই এবং স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে সকল স্তরের বাজারে (পাইকারি, খুচরা ও ভ্রাম্যমাণ) নিয়মিত ও আকস্মিক অভিযান জোরদার করা।
- দ্রুত রাসায়নিক পরীক্ষার ব্যবস্থা: প্রতিটি বড় বাজারে ‘অন স্পট’ বা দ্রুত রাসায়নিক পরীক্ষার ল্যাব স্থাপন করা, যাতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
- কৃষকদের প্রশিক্ষণ: কৃষকদের নিরাপদ কৃষি পদ্ধতি (যেমন: জৈব সার ও জৈব কীটনাশকের ব্যবহার), সঠিক পরিমাণে কীটনাশক ব্যবহার এবং ‘অপেক্ষা সময়’ সম্পর্কে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া।
- ভেজাল নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগ: রাসায়নিক ব্যবহারকারী কৃষক ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা, যাতে অন্যদের মধ্যে ভয় তৈরি হয়।
কৃষকের দিক থেকেও দায়িত্ব রয়েছে
কৃষক হলেন উৎপাদনের মূল স্তম্ভ। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে তাদের ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
- সঠিক পরিমাণে কীটনাশক ব্যবহার: ফসলে ক্ষতিকর কীটনাশকের ব্যবহার সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা এবং কৃষি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনে সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করা।
- নির্ধারিত সময় না পেরোনো পর্যন্ত সবজি বাজারজাত না করা: কীটনাশক প্রয়োগের পর সবজি বা ফল তোলার জন্য যে ‘অপেক্ষা সময়’ (Withdrawal period) নির্ধারিত থাকে, তা অবশ্যই মেনে চলতে হবে। এই সময়ে কীটনাশকের বিষাক্ততা কমে আসে।
- নিরাপদ কৃষি (Organic Farming) উৎসাহ দেওয়া: ধীরে ধীরে রাসায়নিক নির্ভরশীলতা কমিয়ে জৈব বা প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে চাষাবাদে উৎসাহিত হওয়া এবং সরকারি সহায়তা গ্রহণ করা।
শীতের সবজি সম্পর্কিত প্রশ্নোত্তর FAQs Section
ঢাকায় শীতের কোন সবজিতে সবচেয়ে বেশি বিষাক্ত পদার্থ থাকে?
গবেষণা অনুযায়ী, ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো এবং বেগুন এর মতো সবজিতে কীটনাশক এবং ফল পাকানোর রাসায়নিকের অবশেষ তুলনামূলকভাবে বেশি পাওয়া যায়।
ঘরে বসে কীভাবে সবজি থেকে বিষাক্ত রাসায়নিক দূর করা যায়?
সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হলো সবজিকে লবণ-পানি বা ভিনেগার মেশানো পানিতে ১৫-২০ মিনিট ভিজিয়ে রাখা এবং এরপর প্রবাহিত পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালোভাবে ঘষে ধুয়ে নেওয়া।
ফরমালিন কি সবজিতে থাকে?
হ্যাঁ, ফরমালিন প্রধানত দীর্ঘদিন সতেজ রাখার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়। বিশেষত টমেটো, শিম বা সতেজ শাকসবজি পচনরোধে অসাধু ব্যবসায়ীরা ফরমালিন বা ফরমালডিহাইডের দ্রবণ ব্যবহার করে থাকেন।
বিষাক্ত সবজি খেলে কী ধরনের সমস্যা হয়?
তাৎক্ষণিক সমস্যা হিসেবে পেট ব্যথা, বমি, ডায়রিয়া ও মাথা ঘোরা হতে পারে। আর দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা হিসেবে কিডনি ও লিভারের ক্ষতি, ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি, এবং হরমোনাল ভারসাম্যহীনতা দেখা দিতে পারে।