কুরআন মাজিদে আল্লাহ্ তায়ালা মোট ২৫ জন নবীর নাম সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, যাদের জীবন ও দাওয়াতের মাধ্যমে মানবজাতিকে সঠিক পথ দেখানো হয়েছে। এই নবীদের নাম, জীবন ও মিশন সম্পর্কে জ্ঞান রাখা প্রতিটি মুসলমানের জন্য ঈমানের অংশ।
কুরআনে নবীদের ভূমিকা ও গুরুত্ব
আল্লাহ্ এবং মানুষের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী হিসেবে নবীরা পৃথিবীতে এক পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
কেন নবী পাঠানো হয়েছে
মানুষ যখন আল্লাহ্র পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে, নিজেদের মনগড়া জীবন পদ্ধতি অবলম্বন করেছে, তখনই আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর বিশেষ অনুগ্রহে নবী ও রাসূলদের (আলাইহিমুস সালাম) পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। তাঁদের প্রেরণের প্রধান কারণ ছিল- মানুষকে একমাত্র সত্য পথ, অর্থাৎ তাওহিদ বা একত্ববাদের দিকে আহ্বান করা।
নবীদের সাধারণ মিশন
সকল নবীর মূল মিশন ছিল অভিন্ন। তাঁরা ছিলেন মানবতার শিক্ষক, যারা মানুষকে:
- আল্লাহ্র আনুগত্য ও ইবাদত করতে শিখিয়েছেন।
- নৈতিকতা, সততা ও ন্যায়বিচারের শিক্ষা দিয়েছেন।
- জান্নাতের সুসংবাদ ও জাহান্নামের ভীতি প্রদর্শন করেছেন।
তাওহিদের দাওয়াহ প্রচার
নবীদের মূল বার্তা ছিল একটিই:
“হে আমার কওম! তোমরা আল্লাহ্র ইবাদত করো। তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোনো ইলাহ্ (উপাস্য) নেই।” (সূরা আল-আ’রাফ, ৭:৫৯)।
সকল নবী এই একত্ববাদের দাওয়াহ নিয়েই প্রেরিত হয়েছিলেন।
কুরআনে বর্ণিত ২৫ জন নবীর নাম আরবিসহ তালিকা
কুরআনে সরাসরি উল্লেখিত ২৫ জন নবীর তালিকাটি নিচে আরবি, বাংলা ও ইংরেজি নামসহ দেওয়া হলো:
| ক্রম | আরবি নাম | বাংলা নাম | ইংরেজি নাম |
| ১ | آدم | আদম (আ.) | Adam |
| ২ | نوح | নূহ (আ.) | Noah |
| ৩ | إدريس | ইদ্রিস (আ.) | Enoch |
| ৪ | صالح | সালিহ (আ.) | Saleh |
| ৫ | إبراهيم | ইবরাহিম (আ.) | Abraham |
| ৬ | لوط | লূত (আ.) | Lot |
| ৭ | إسماعيل | ইসমাইল (আ.) | Ishmael |
| ৮ | إسحاق | ইসহাক (আ.) | Isaac |
| ৯ | يعقوب | ইয়াকুব (আ.) | Jacob |
| ১০ | يوسف | ইউসুফ (আ.) | Joseph |
| ১১ | أيوب | আইয়ুব (আ.) | Job |
| ১২ | شعيب | শুআইব (আ.) | Jethro |
| ১৩ | موسى | মূসা (আ.) | Moses |
| ১৪ | هارون | হারুন (আ.) | Aaron |
| ১৫ | ذو الكفل | যুল-কিফ্ল (আ.) | Dhu al-Kifl |
| ১৬ | داود | দাউদ (আ.) | David |
| ১৭ | سليمان | সুলাইমান (আ.) | Solomon |
| ১৮ | إلياس | ইলিয়াস (আ.) | Elijah |
| ১৯ | الْيَسَع | আল-ইয়াসা’ (আ.) | Elisha |
| ২০ | يونس | ইউনুস (আ.) | Jonah |
| ২১ | زكريا | যাকারিয়া (আ.) | Zechariah |
| ২২ | يحيى | ইয়াহইয়া (আ.) | John (the Baptist) |
| ২৩ | عيسى | ঈসা (আ.) | Jesus |
| ২৪ | محمد | মুহাম্মাদ (সাঃ) | Muhammad |
| ২৫ | هود | হূদ (আ.) | Hud |
দ্রষ্টব্য: আরবি উচ্চারণে ‘হূদ’ এবং ‘সালিহ’ কে অনেক সময় তালিকা প্রণয়নের সুবিধার্থে শেষে রাখা হয়।
নবীদের নাম সহজ করে মনে রাখার উপায়
২৫ জন নবীর নাম মুখস্থ করা সহজ করতে নিম্নলিখিত পদ্ধতিগুলো অবলম্বন করতে পারেন:
- ছড়া বা তাল সিস্টেম: কয়েকটি নবীর নাম এক সাথে করে ছন্দের মতো করে পড়লে দ্রুত মুখস্থ হয়। যেমন: আদম, নূহ, ইব্রাহিম, লূত, ইসমাঈল…
- ৫ ভাগে ভাগ করে মুখস্থ: সম্পূর্ণ তালিকাটিকে ৫টি ভাগে ভাগ করে প্রতিদিন একটি ভাগ মুখস্থ করুন। এতে বোঝা মনে হবে না।
- আরবি–বাংলা তুলনা: আরবি নামটির সঙ্গে বাংলা নামের উচ্চারণ এবং অর্থের মিল খুঁজে মুখস্থ করুন।
নবীদের নামগুলো কোন কোন সূরায় এসেছে
কুরআনের বিভিন্ন সূরায় বিভিন্ন নবীর জীবনীর বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। নবীর নামের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি সূরার উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো:
- আদম (আ.) → সূরা আল-বাকারাহ (২:৩০)
- নূহ (আ.) → সূরা হুদ (১১:২৫)
- ইবরাহিম (আ.) → সূরা ইবরাহিম (নামেই রয়েছে)
- মূসা (আ.) → সূরা কাসাস (২৮)
- মুহাম্মাদ (সাঃ) → সূরা মুহাম্মাদ (৪৭)
প্রতিটি নবীর সংক্ষিপ্ত পরিচয়
প্রত্যেক নবীর জীবনই মহান শিক্ষায় পরিপূর্ণ। নিচে ২৫ জন নবীর গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
| নবী (আ.) | সংক্ষিপ্ত পরিচয় |
| আদম (আ.) | প্রথম মানব ও প্রথম নবী, যিনি শয়তানের প্ররোচনা থেকে তওবার শিক্ষা দেন। |
| নূহ (আ.) | দীর্ঘকাল তাওহিদের আহ্বানকারী এবং মহাপ্লাবনের সময় নৌকার মাধ্যমে রক্ষা পান। |
| ইবরাহিম (আ.) | ‘খলিলুল্লাহ’ (আল্লাহ্র বন্ধু), তাওহিদের প্রতীক এবং মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন। |
| মূসা (আ.) | ‘কালীমুল্লাহ’ (আল্লাহ্র সাথে কথাবর্তাকারী), বনী ইসরাঈলের নেতা ও ফির’আউনের অত্যাচার থেকে মুক্তিদাতা। |
| ঈসা (আ.) | ‘রুহুল্লাহ’ (আল্লাহ্র পক্ষ থেকে আত্মা), আল্লাহর রসূল ও মাতৃগর্ভ থেকেই মু‘জিযাধারী। |
| মুহাম্মাদ (সাঃ) | সর্বশেষ নবী ও রাসূল, যিনি সর্বজনীন ও পূর্ণাঙ্গ দ্বীন ইসলাম নিয়ে এসেছেন। |
| অন্যান্য নবী | ইদ্রিস (আ.), সালিহ (আ.), লূত (আ.), ইসমাইল (আ.), ইসহাক (আ.), ইয়াকুব (আ.), ইউসুফ (আ.), আইয়ুব (আ.), শুআইব (আ.), হারুন (আ.), দাউদ (আ.), সুলাইমান (আ.), ইলিয়াস (আ.), আল-ইয়াসা’ (আ.), ইউনুস (আ.), যাকারিয়া (আ.), ইয়াহইয়া (আ.), হূদ (আ.), যুল-কিফ্ল (আ.)। |
কুরআনের ২৫ নবীর তালিকাটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এই তালিকাটি শুধু মুখস্থ করার জন্য নয়, বরং এর গুরুত্ব আমাদের ঈমান ও জীবন পথের সাথে গভীরভাবে জড়িত।
ঈমানের ছয় রুকনের অংশ
রাসূলদের প্রতি ঈমান হলো ঈমানের ছয়টি মূল স্তম্ভের অন্যতম। নবীদের (আঃ) প্রতি বিশ্বাস রাখা ছাড়া একজন ব্যক্তি মুমিন হতে পারে না।
নবীদের অনুসরণে জীবনের দিকনির্দেশনা
নবীদের জীবনীতে রয়েছে ধৈর্য, সহনশীলতা, তাওয়াক্কুল (আল্লাহ্র উপর নির্ভরতা) এবং কঠিন পরিস্থিতিতে অবিচল থাকার শিক্ষা। তাঁদের জীবন আমাদের জন্য উসওয়াতুন হাসানাহ বা সর্বোত্তম আদর্শ।
নৈতিকতা, ধৈর্য, তাওয়াক্কুলের শিক্ষা
প্রত্যেক নবীর জীবন থেকে আমরা নৈতিকতা, সত্যের পথে অবিচল ধৈর্য এবং শত প্রতিকূলতার মধ্যেও আল্লাহ্র উপর পূর্ণ নির্ভরতার গভীর শিক্ষা পাই।
শিশু ও শিক্ষার্থীদের জন্য নবীদের নাম শেখার কৌশল
শিশুদের কাছে এই মহান ব্যক্তিত্বদের পরিচয় আকর্ষণীয় করে তোলা উচিত।
- কার্ড/চার্ট ব্যবহার: নবীদের নাম, তাঁদের প্রধান উপাধি ও সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়ে ফ্ল্যাশ কার্ড বা চার্ট তৈরি করা।
- ভিডিও গল্প: ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে তৈরি নির্ভরযোগ্য শিক্ষামূলক ভিডিওর মাধ্যমে তাঁদের জীবনের মূল ঘটনাগুলো দেখানো।
- ছোট ছোট গল্পে পরিচয় করানো: প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে একজন নবীর সংক্ষিপ্ত ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সহজ ভাষায় গল্প আকারে বলা।
কুরআনে বর্ণিত ২৫ জন নবীর নাম FAQs (Frequently Asked Questions)
১. কুরআনে মোট কতজন নবীর নাম উল্লেখ আছে?
উত্তর: ২৫ জন।
২. মোট নবীর সংখ্যা কত ছিল?
উত্তর: মোট নবীর সঠিক সংখ্যা অজানা, তবে হাদিস অনুযায়ী এই সংখ্যা ১,২৪,০০০ থেকে ২,২৪,০০০ পর্যন্ত হতে পারে। অন্যদিকে, কুরআনে মাত্র ২৫ জন নবীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
৩. প্রথম নবী কে?
উত্তর: আদম (আ.)
৪. শেষ নবী কে?
উত্তর: মুহাম্মদ (সা.) – শেষ নবী ও রাসূল।
৫. সব নবী কি একই বার্তা নিয়ে এসেছেন?
উত্তর: হ্যাঁ- তাওহিদ ও এক আল্লাহর ইবাদত।