রিজার্ভ ছাড়াল ৩৪.৫ বিলিয়ন ডলার
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আজ যুক্ত হলো আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বকাল আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। একই দিনে শান্তিপূর্ণভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি জোট।
এই ঐতিহাসিক ক্ষমতা হস্তান্তরের দিনেই অর্থনীতিতে এসেছে বড় সুখবর। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় বা রিজার্ভ বেড়ে সাড়ে ৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে—যা অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের মুহূর্তকে করেছে আরও তাৎপর্যপূর্ণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিশ্চিতকরণ
রিজার্ভ বৃদ্ধির তথ্য নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংক-এর নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ১৭ ফেব্রুয়ারি দিন শেষে গ্রস রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪.৫৪ বিলিয়ন ডলার।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে হিসাব করলে দেশের রিজার্ভ হয়েছে ২৯.৮৬ বিলিয়ন ডলার।
ইউনূস সরকারের অর্থনৈতিক উত্তরাধিকার
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে-
- প্রবাসী আয়ের প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে
- বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রবণতা শক্তিশালী হয়েছে
- আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রিত থেকেছে
- রফতানি আয় তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল
এই সম্মিলিত প্রভাবেই রিজার্ভে বড় উত্থান সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রেমিট্যান্সে রেকর্ড গতি
তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ৩১৭ কোটি মার্কিন ডলার। ফেব্রুয়ারিতেও সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে। মাসটির প্রথম ১৬ দিনেই প্রবাসী বাংলাদেশিরা পাঠিয়েছেন ১৮০ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই রেমিট্যান্স প্রবাহ ডলার সংকট দূর করতে এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
ডলার বাজারে স্থিতিশীলতা রক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা
প্রবাসী আয়ের উল্লম্ফনের ফলে ব্যাংকগুলোতে ডলারের উদ্বৃত্ত তৈরি হওয়ায় বাজারে ডলারের দাম কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে বাজারে ভারসাম্য ধরে রাখতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কিনছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৪.৯০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার কিনেছে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে।
অতীত সংকট থেকে বর্তমান স্বস্তি
২০২২ সালে ডলার বাজার ভয়াবহ অস্থির হয়ে পড়ে। একসময় ডলারের দাম ৮৫ টাকা থেকে বেড়ে ১২২ টাকায় পৌঁছায়। সে সময় টানা তিন অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করতে হয় বাজার সামাল দিতে।
তবে স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অর্থপাচার রোধে কঠোর অবস্থান নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এর ফলেই রফতানি ও রেমিট্যান্স-দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসে।
নতুন সরকারের জন্য স্বস্তিদায়ক সূচনা
অর্থনীতিবিদদের মতে, ৩৪.৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি রিজার্ভ–
- আমদানি ব্যয় মেটাতে
- বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধে
- মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখতে
একটি শক্ত ভিত তৈরি করবে। রাজনৈতিক পালাবদলের এই সময়ে শক্তিশালী রিজার্ভ নতুন সরকারের জন্য একটি স্বস্তিদায়ক ও আশাব্যঞ্জক সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রফেসর ইউনূস দায়িত্ব ছাড়লেন এমন এক সময়ে, যখন অর্থনীতি ছিল স্থিতিশীল, রিজার্ভ ঊর্ধ্বমুখী এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজার নিয়ন্ত্রণে-যা তার সরকারের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।





