প্রাথমিক জীবন ও শিক্ষা
খালেদা জিয়া ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট বগুড়া জেলার দিনাজপুর মহকুমার জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ইস্কান্দার মজুমদার একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি ঢাকার সিন্ধুরীকুণ্ডু উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং পরবর্তীতে সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। তিনি ১৯৬০ সালে জিয়াউর রহমানের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিবাহের পর তিনি সংসার সামলাতে শুরু করেন এবং স্বামীর সামরিক পেশার কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে বসবাস করেন। তিনি দুই সন্তানের জননী – তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি রাজনীতির সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন না।
রাজনৈতিক জীবনের সূচনা
১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ঘটে। সে সময় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে। দলের নেতৃত্ব নিতে অনেকেই অনিচ্ছুক ছিলেন সামরিক সরকারের চাপে। এমন পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়া ১৯৮২ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রথমে তিনি রাজনীতিতে আসতে অনিচ্ছুক ছিলেন, কিন্তু দলের নেতা-কর্মীদের অনুরোধে তিনি এই দায়িত্ব পালন করতে সম্মত হন। ১৯৮৪ সালে তিনি বিএনপির পূর্ণাঙ্গ চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হন এবং তখন থেকেই তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন
১৯৮০-এর দশকে খালেদা জিয়া এরশাদের স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। তিনি বিএনপিকে সংগঠিত করে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দলে পরিণত করেন। ১৯৮৩ সালে তিনি প্রথমবারের মতো গ্রেফতার হন এবং এরপর একাধিকবার কারাবরণ করেন। তিনি ৭ দলীয় জোট গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং এই জোটের মাধ্যমে এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে সম্মিলিত আন্দোলন পরিচালনা করেন। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে তিনি অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করেন। এই আন্দোলনের ফলে এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়।
প্রথম মেয়াদের প্রধানমন্ত্রিত্ব (১৯৯১–১৯৯৬)
১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হলে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তার সরকার দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে এবং রাষ্ট্রপতি শাসন থেকে সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় ফিরে যায়। তার প্রথম মেয়াদে অর্থনৈতিক উদারীকরণ, বেসরকারিকরণ এবং বিদেশী বিনিয়োগের প্রসার ঘটে। এছাড়া তিনি নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেন। তার সরকার বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাথে কাজ করে অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে। তবে তার শাসনামলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট দেখা দেয় এবং বিরোধী দলের আন্দোলনের মুখে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
দ্বিতীয় মেয়াদের প্রধানমন্ত্রিত্ব (২০০১–২০০৬)
২০০১ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট বিজয়লাভ করলে খালেদা জিয়া দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তার দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন। তার সরকারের সময় তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয় এবং মোবাইল ফোন ব্যবহার সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তার সরকার বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের জন্য বিভিন্ন সুবিধা প্রদান করে এবং প্রবাসী আয় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। তবে এই মেয়াদে দুর্নীতির অভিযোগ উঠে এবং বিরোধী দলের আন্দোলনের মুখে ২০০৬ সালের অক্টোবরে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।
রাজনৈতিক আদর্শ ও দর্শন
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক আদর্শ বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যা তার স্বামী জিয়াউর রহমান প্রবর্তন করেছিলেন। তার রাজনৈতিক দর্শনে গণতন্ত্র, জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং অর্থনৈতিক মুক্তি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন। তিনি বিশ্বাস করেন যে বাজার অর্থনীতি ও বেসরকারিকরণের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব। তিনি ইসলামী মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং ইসলামিক দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষপাতী। তার রাজনৈতিক দর্শনে নারী ক্ষমতায়ন ও সামাজিক উন্নয়নও গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে।
বিএনপির সংগঠন ও নেতৃত্ব
খালেদা জিয়া বিএনপিকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি দলকে সংগঠিত করতে এবং জনগণের কাছে জনপ্রিয় করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার নেতৃত্বে বিএনপি দেশের বিভিন্ন স্থানে শাখা সম্প্রসারিত করে এবং সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করে। তিনি দলের মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালু রাখার চেষ্টা করেন এবং নিয়মিত কাউন্সিল অনুষ্ঠান করেন। তিনি দলের নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন এবং দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে ঐক্য রক্ষায় সচেষ্ট থাকেন। তার নেতৃত্বে বিএনপি বিভিন্ন জোট গঠন করে এবং জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।
বিদেশ নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক
খালেদা জিয়ার সরকারের সময় বাংলাদেশের বিদেশ নীতি ছিল সুষম ও সুদূরপ্রসারী। তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার সময় ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নত হয়। তিনি মুসলিম বিশ্বের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার করেন এবং ওআইসি, আরব লীগ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংগঠনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করেন। তিনি জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সাথে সম্পর্ক জোরদার করেন এবং এসব সংস্থা থেকে সাহায্য ও সহযোগিতা আদায় করেন। তার সরকারের সময় বাংলাদেশ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে।
অর্থনৈতিক নীতি ও উন্নয়ন কর্মসূচি
খালেদা জিয়ার সরকারের অর্থনৈতিক নীতি ছিল মুক্ত বাজার অর্থনীতি ও বেসরকারিকরণের উপর ভিত্তি করে। তার সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেসরকারি খাতে হস্তান্তর করে এবং বিদেশী বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে। তার সময় রপ্তানি খাতে ব্যাপক প্রবৃদ্ধি হয় এবং পোশাক শিল্পের বিকাশ ঘটে। তিনি কৃষি খাতের উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেন এবং কৃষকদের সার, বীজ ও কৃষি ঋণের সুবিধা প্রদান করেন। তার সরকার গ্রামীণ উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। তিনি তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন এবং দেশে কম্পিউটার শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
সামাজিক উন্নয়ন ও নারী ক্ষমতায়ন
খালেদা জিয়া সামাজিক উন্নয়ন ও নারী ক্ষমতায়নের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেন। তিনি নারী শিক্ষার প্রসারের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন এবং নারীদের শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি করেন। তার সরকার নারীদের জন্য বিভিন্ন সরকারি চাকরিতে কোটা বৃদ্ধি করে এবং নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে। তিনি নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি চালু করেন এবং নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তা প্রদান করেন। তার সরকার নারী নির্যাতন ও সহিংসতা প্রতিরোধের জন্য বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করে এবং নারীদের আইনি সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা করে। তিনি মাতৃত্বকালীন ছুটি বৃদ্ধি করেন এবং কর্মজীবী নারীদের জন্য বিভিন্ন সুবিধা প্রদান করেন।
বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবে ভূমিকা
খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকাকালীন এবং বিরোধী দলে থাকাকালীন উভয় অবস্থায়ই বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবে তিনি সরকারের বিভিন্ন নীতির বিরোধিতা করেছেন এবং জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করেছেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে হরতাল, অবরোধ ও সমাবেশের মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন পরিচালনা করেছেন। তিনি নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কারের জন্য দাবি জানিয়েছেন এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনে ভূমিকা রাখেন। তিনি গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষার জন্য সোচ্চার ছিলেন এবং সরকারের সমালোচনা করতে দ্বিধা করেননি। তিনি বিভিন্ন দেশি ও আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে কথা বলেছেন।
আইনি জটিলতা ও কারাবরণ
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন সময়ে আইনি জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং দুর্নীতির মামলায় আটক রাখা হয়। ২০০৮ সালে তিনি মুক্তি পান এবং পরবর্তীতে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে বাড়িয়ে ১০ বছর করা হয়। এছাড়া তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে তিনি কারাবন্দী অবস্থায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন এবং তিনটি আসনে জয়লাভ করেন। ২০২০ সালের মার্চে করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে তাকে সাময়িক মুক্তি দেওয়া হয়।
স্বাস্থ্যগত সমস্যা ও চিকিৎসা
খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভুগছেন। তিনি আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও ফুসফুসের সমস্যাসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। তার চিকিৎসার জন্য তাকে বিভিন্ন সময়ে দেশে-বিদেশে নিতে হয়েছে। ২০১৮ সালে কারাবন্দী অবস্থায় তার স্বাস্থ্যের অবনতি হলে তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে তার পরিবারের পক্ষ থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার আবেদন করা হলেও সরকার তা প্রত্যাখ্যান করে। ২০১৯ সালে তাকে অস্ত্রোপচার করা হয় এবং দীর্ঘ সময় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকেন। ২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে তাকে সাময়িক মুক্তি দেওয়া হয় এবং তার চিকিৎসার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়।
পারিবারিক জীবন ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
খালেদা জিয়ার পারিবারিক জীবন রাজনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী ছিলেন। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তিনি রাজনীতিতে আসেন এবং বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তাদের দুই সন্তান – তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো। তারেক রহমান বর্তমানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আরাফাত রহমান কোকো ২০১৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন। খালেদা জিয়ার ভাই সাঈদ ইস্কান্দারও বিএনপির একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন। তার পরিবারের অনেক সদস্য রাজনীতির সাথে জড়িত। তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার রেখে গেছেন এবং তার পরিবার এই উত্তরাধিকার এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব
খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছেন। তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নারী ক্ষমতায়নের জন্য একটি উদাহরণ স্থাপন করেছেন। তিনি দুই মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং দেশের উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তিনি বিএনপিকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং দলটিকে জনগণের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছেন। তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত এবং তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো দেশের রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছেন।
সমালোচনা ও বিতর্ক
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন সময়ে সমালোচনা ও বিতর্কের সম্মুখীন হতে হয়েছে। তার শাসনামলে দুর্নীতি, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক সমস্যার জন্য তিনি সমালোচিত হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে এবং একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে। তিনি তার দুই মেয়াদের শাসনামলে বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন চালানোর অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন। তিনি তার ছেলে তারেক রহমানকে রাজনীতিতে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্যও সমালোচিত হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে পরিবারতন্ত্র প্রবর্তনের অভিযোগও উঠেছে। তিনি বিভিন্ন সময়ে বিতর্কিত বক্তব্য দেওয়ার জন্যও সমালোচিত হয়েছেন। তবে তার সমর্থকগণ এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন।
ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা ও উত্তরাধিকার
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। তার স্বাস্থ্যগত সমস্যা ও আইনি জটিলতার কারণে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে পারছেন না। তবে তিনি এখনো বিএনপির চেয়ারপার্সন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং দলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো তার সম্মতিতেই নেওয়া হয়। তার পুত্র তারেক রহমান বর্তমানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার রেখে গেছেন। তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নারী ক্ষমতায়নের জন্য একটি উদাহরণ স্থাপন করেছেন এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করবে।
প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন ১: খালেদা জিয়া কবে এবং কোথায় জন্মগ্রহণ করেন?
উত্তর: খালেদা জিয়া ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট বগুড়া জেলার দিনাজপুর মহকুমার জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন।
প্রশ্ন ২: খালেদা জিয়া কবে বিএনপির চেয়ারপার্সন হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন?
উত্তর: খালেদা জিয়া ১৯৮৪ সালে বিএনপির পূর্ণাঙ্গ চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হন এবং তখন থেকেই তিনি এই দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রশ্ন ৩: খালেদা জিয়া কতবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন?
উত্তর: খালেদা জিয়া দুইবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন – প্রথমবার ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত এবং দ্বিতীয়বার ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত।
প্রশ্ন ৪: খালেদা জিয়ার স্বামী কে ছিলেন এবং তিনি কী পেশায় ছিলেন?
উত্তর: খালেদা জিয়ার স্বামী জিয়াউর রহমান ছিলেন, যিনি বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি এবং একজন সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন।
প্রশ্ন ৫: খালেদা জিয়ার দুই মেয়াদের প্রধানমন্ত্রিত্বে কী কী উন্নয়ন হয়েছিল?
উত্তর: খালেদা জিয়ার দুই মেয়াদের প্রধানমন্ত্রিত্বে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক উদারীকরণ, বেসরকারিকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন, নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন এবং রপ্তানি খাতের বিকাশ সাধিত হয়।
প্রশ্ন ৬: খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনি জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে?
উত্তর: খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতির মামলা দায়ের করা হয়েছে। ২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে বাড়িয়ে ১০ বছর করা হয়।
প্রশ্ন ৭: খালেদা জিয়ার সন্তানগণ কারা এবং তারা কী করছেন?
উত্তর: খালেদা জিয়ার দুই সন্তান – তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো। তারেক রহমান বর্তমানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং আরাফাত রহমান কোকো ২০১৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
প্রশ্ন ৮: খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলেছেন?
উত্তর: খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছেন। তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নারী ক্ষমতায়নের জন্য একটি উদাহরণ স্থাপন করেছেন এবং বিএনপিকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
প্রশ্ন ৯: খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যগত অবস্থা কেমন?
উত্তর: খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভুগছেন। তিনি আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও ফুসফুসের সমস্যাসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত।
প্রশ্ন ১০: খালেদা জিয়া কবে সাময়িক মুক্তি পান?
উত্তর: খালেদা জিয়া ২০২০ সালের মার্চে করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে সাময়িক মুক্তি পান।
প্রশ্ন ১১: খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক আদর্শ কী?
উত্তর: খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক আদর্শ বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যা তার স্বামী জিয়াউর রহমান প্রবর্তন করেছিলেন। তার রাজনৈতিক দর্শনে গণতন্ত্র, জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং অর্থনৈতিক মুক্তি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।