আমাদের সমাজে এখনো মানবতার গল্পগুলো বেঁচে আছে কিছু মানুষের ভালো কাজের মাধ্যমে। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই যে প্রকৃত নেতার কাজ, তা আবার প্রমাণ হলো। পটুয়াখালীর বাউফলে চরম অসহায় অবস্থায় দিন কাটানো সনাতন ধর্মের তিন প্রতিবন্ধী ভাইয়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি জেনারেল ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ। তিনি এই অসহায় তিন ভাইয়ের আজীবন ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়েছেন।
আজ বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক ভিডিও বার্তার মাধ্যমে তিনি নিজেই এই চমৎকার তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন। তার এই মানবিক উদ্যোগটি সোশ্যাল মিডিয়ায় আসার পর থেকেই সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক প্রশংসিত হচ্ছে।
ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের মানবিক ঘোষণা
ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বর্তমানে একজন সংসদ সদস্য (এমপি)। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন যে, সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি যে সরকারি বেতন ও ভাতা পান, তার পুরো টাকাটাই তিনি এই তিন প্রতিবন্ধী ভাইয়ের কল্যাণে ব্যয় করবেন।
তিনি তার ভিডিও বার্তায় বলেন, মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব। আমার নির্বাচনী এলাকার এই অসহায় পরিবারটির কষ্ট আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমার এমপি পদের প্রথম মাসের পুরো বেতন ও ভাতা আজই এই পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে।
তিন ভাইয়ের দুঃখের দিন শেষ হতে চলেছে
পটুয়াখালী-২ (বাউফল) আসনের ধুলিয়া ইউনিয়নের চাঁদকাঠি গ্রামে বাস করেন এই তিন ভাই রিপন দাস, সাধু দাস ও নিধু দাস। জন্মগতভাবেই তারা তিন ভাই শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী। তাদের দেখাশোনা করার মতো বা পরিবারে উপার্জন করার মতো তেমন কেউ নেই। দীর্ঘদিন ধরে তারা অত্যন্ত কষ্টকর জীবনযাপন করছিলেন।
ড. মাসুদ কেবল তাদের বেতনের টাকা দিয়েই ক্ষান্ত হননি। তিনি এই তিন ভাইয়ের পরিবারের জন্য আরও কিছু বড় উদ্যোগ নিয়েছেন:
- নতুন বাড়ি নির্মাণ: তিন ভাইয়ের বর্তমান থাকার ঘরটি খুবই জরাজীর্ণ। ড. মাসুদ তাদের থাকার জন্য একটি নতুন ও নিরাপদ বসতবাড়ি তৈরি করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
- নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থা: পরিবারটির তিন বেলা খাবারের কষ্ট দূর করতে প্রতি মাসে নিয়মিত খাদ্যসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
- আজীবন পাশে থাকার অঙ্গীকার: তিনি সামাজিক মাধ্যমে সবার কাছে দোয়া চেয়ে বলেছেন, “যতদিন আল্লাহ তাদের বাঁচিয়ে রাখবেন, আমরা আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের পাশে থেকে সবটুকু করার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।”
সাংবাদিক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা
এই মানবিক কাজটি একা ড. মাসুদের পক্ষে জানা সম্ভব হতো না। কিছু সচেতন মানুষ এবং স্থানীয় সাংবাদিকরা এই প্রতিবন্ধী তিন ভাইয়ের কষ্টের কথা গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুলে ধরেছিলেন।
ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ তার বক্তব্যে সেইসব সাংবাদিকদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সাথে যে সব শুভানুধ্যায়ীরা এই তিন ভাইয়ের অসহায়ত্বের বিষয়টি তার নজরে এনেছেন, তাদের প্রতিও তিনি সমান শ্রদ্ধা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। তিনি মনে করেন, সমাজের সবাই এভাবে এগিয়ে এলে কোনো মানুষ আর অসহায় থাকবে না।
সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ
আমাদের দেশে অনেক সময় রাজনীতি বা ধর্ম নিয়ে নানামুখী বিতর্ক তৈরি হয়। কিন্তু এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, বিপদের সময় মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে একজন মানুষ। একজন মুসলিম রাজনৈতিক নেতা হয়েও ড. মাসুদ যেভাবে সনাতন ধর্মাবলম্বী (হিন্দু) একটি পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
চাঁদকাঠি গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দারা ড. মাসুদের এই উদ্যোগে অত্যন্ত খুশি। তারা জানান, এই তিন ভাইয়ের পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে খুব কষ্টে ছিল। আজ তাদের মুখে হাসি ফুটেছে। এই উদ্যোগ বাউফল তথা পুরো দেশের মানুষের কাছে একটি শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে থাকবে।




