ইসলাম ধর্মে হালাল উপার্জনের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একজন মুসলিমের ইবাদত কবুল হওয়া এবং জীবনে বরকত আসার প্রধান শর্ত হলো তার উপার্জন পবিত্র হওয়া। এই কারণেই ইসলামে সুদ বা ‘রিবা’ সম্পূর্ণ হারাম এবং এটিকে অন্যতম বড় কবিরা গুনাহ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
তবে বর্তমান যুগে আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে, অনিচ্ছাকৃতভাবে অনেকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টেই সুদের টাকা জমা হয়ে যায়। তখন আমাদের মনে একটি প্রশ্ন জাগে সুদের টাকা দান করা যাবে কি? এই টাকা গরিব মানুষকে দিলে কি কোনো সওয়াব পাওয়া যাবে? নাকি এটিও গুনাহের কাজ? চলুন ইসলামী শরিয়তের আলোকে এই প্রশ্নের সহজ উত্তর খুঁজে নিই।
ইসলামে সুদের ভয়াবহতা ও আল্লাহর নিষেধাজ্ঞা
সুদ সাধারণ কোনো পাপ নয়, বরং এটি মানব সমাজের জন্য একটি বড় অভিশাপ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা সুদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।
সূরা আল-বাকারার ২৭৮-২৭৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন:
‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যে অংশ অবশিষ্ট আছে তা পরিত্যাগ করো, যদি তোমরা সত্যিকার মুমিন হও। আর যদি তা না করো, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা গ্রহণ করো।’
এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, সুদের সাথে জড়িত হওয়া মানে সরাসরি আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া।
হাদিস শরিফেও রাসুলুল্লাহ (সা.) সুদ গ্রহণকারী, সুদ প্রদানকারী, সুদের হিসাব লেখক এবং এর সাক্ষীদের ওপর লানত বা অভিশাপ দিয়েছেন এবং বলেছেন তারা সবাই সমান অপরাধী (সহীহ মুসলিম: ১৫৯৮)।
ব্যাংক থেকে পাওয়া সুদের টাকা কী করবেন?
যদি কোনো জরুরি বা বাধ্যতামূলক কারণে প্রচলিত বাণিজ্যিক ব্যাংকে টাকা রাখতে হয় এবং সেখান থেকে অ্যাকাউন্টে সুদের টাকা চলে আসে, তবে সেই টাকা নিজের কোনো ব্যক্তিগত কাজে (যেমন: খাবার কেনা, পোশাক কেনা বা ঘর তৈরিতে) ব্যবহার করা একেবারেই বৈধ নয়।
কারণ, হারাম বা অবৈধ সম্পদ ভোগ করা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে ইসলামী ফিকহবিদদের স্পষ্ট নির্দেশনা হলো অ্যাকাউন্টে জমা হওয়া অতিরিক্ত সুদের টাকা নিজের কাছে না রেখে তা কোনো গরিব-দুঃখী, অসহায় মানুষ অথবা জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করে দিতে হবে।
সুদের টাকা দান করলে কি সওয়াব বা নেকি পাওয়া যাবে?
এখানে একটি বিষয় খুব পরিষ্কারভাবে মনে রাখা প্রয়োজন। সুদের টাকা কোনো অসহায় বা দরিদ্র মানুষকে দিলে তার জন্য কোনো দান বা সদকার সওয়াব পাওয়া যাবে না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, আর তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া অন্য কিছুই গ্রহণ করেন না।’ (সহীহ মুসলিম: ১০১৫)
যেহেতু সুদের অর্থ একটি অপবিত্র ও হারাম সম্পদ, তাই এটি দান করে আল্লাহর কাছে নেকি বা সওয়াব আশা করা যাবে না। তাহলে কেন আমরা এই টাকা গরিবদের দেব? এর উদ্দেশ্য হলো নিজের অ্যাকাউন্ট বা সম্পদকে হারাম উপার্জনের হাত থেকে মুক্ত করা এবং সমাজকে উপকৃত করা। অর্থাৎ, এটি কোনো পুণ্য অর্জনের মাধ্যম নয়, বরং অবৈধ অর্থ থেকে নিজেকে বাঁচানোর একটি উপায় মাত্র।
গরিব আত্মীয়-স্বজনকে কি সুদের টাকা দেওয়া যাবে?
আপনার পরিচিত বা নিকটাত্মীয়দের মধ্যে যদি কেউ সত্যিই অত্যন্ত দরিদ্র, অভাবগ্রস্ত ও নিঃস্ব হন, তবে তাকে সুদের এই টাকা দেওয়া যাবে। তবে এক্ষেত্রে দুটি প্রধান শর্ত মনে রাখতে হবে:
- এই টাকা দেওয়ার বিনিময়ে মনে মনে কোনো সওয়াব বা আখেরাতের কল্যাণের আশা করা যাবে না।
- যাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব আপনার ওপর আবশ্যক (যেমন: বাবা-মা, স্ত্রী বা সন্তান), তাদের প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর জন্য এই টাকা ব্যবহার করা যাবে না।
শুধু দান করার উদ্দেশ্যে সুদ নেওয়া কি জায়েজ?
অনেকের মনে এমন ভুল ধারণা থাকে যে, “আমি তো নিজের জন্য সুদের টাকা নিচ্ছি না, ব্যাংক থেকে টাকাটা তুলে গরিবদের দান করে দেব, এতে তো গরিবের লাভ হবে।”
ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে এই ধারণা পুরোপুরি ভুল এবং গুনাহের কাজ। জেনেশুনে সুদের চুক্তিতে প্রবেশ করা বা সুদের উদ্দেশ্যে এফডিআর (FDR) বা সেভিংস অ্যাকাউন্ট খোলা কোনোভাবেই জায়েজ নয়। দান করার মহৎ উদ্দেশ্য থাকলেও সুদের মতো একটি হারাম চুক্তি করা ইসলাম সমর্থন করে না।
একজন সচেতন মুসলিম হিসেবে আমাদের করণীয়
সুদের মতো বড় পাপ থেকে নিজের জীবন ও পরিবারকে বাঁচাতে আমাদের নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া উচিত:
- সব ধরনের সুদভিত্তিক লেনদেন ও চুক্তি থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা।
- প্রয়োজন ছাড়া প্রচলিত সুদী ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট না খোলা।
- অনিচ্ছাকৃতভাবে অ্যাকাউন্টে সুদের টাকা চলে আসলে তা অবিলম্বে নিজের হিসাব থেকে আলাদা করা।
- যাকাত, ফিতরা কিংবা সাধারণ নফল সদকার বিকল্প হিসেবে কখনোই সুদের টাকা ব্যবহার না করা।
- পদ্ধতিগতভাবে সুদমুক্ত এবং শরীয়াহসম্মত ইসলামিক ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ ব্যবস্থা বেছে নেওয়া।
ইসলাম আমাদের জীবনকে হালাল, পবিত্র এবং সুন্দর করার তাগিদ দেয়। সুদের ভয়াবহতা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা একজন মুমিনের প্রধান দায়িত্ব। তবে অনিচ্ছাকৃত কোনো পরিস্থিতিতে যদি সুদের টাকা চলেই আসে, তবে তা নিজের ভোগে ব্যবহার না করে নিঃস্বার্থভাবে গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দিতে হবে। এর মাধ্যমে কোনো সওয়াব না মিললেও, আপনি একটি বড় গুনাহ ও হারাম সম্পদ থেকে নিজের আমলনামাকে পবিত্র রাখতে পারবেন।




