দেশে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। গতকাল জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়েছে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ বিল, ২০২৬’।
এই নতুন আইনের আওতায় এতদিন আলাদাভাবে কাজ করা দেশের প্রধান ৩টি নিয়োগ উন্নয়ন ও বিকাশকারী সংস্থা বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষ (পিপিপিএ) একীভূত হতে যাচ্ছে। তিনটি প্রতিষ্ঠানকে বিলুপ্ত ও সমন্বিত করে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে গঠিত হচ্ছে দেশের শীর্ষ সমন্বিত বিনিয়োগ প্রচার সংস্থা ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’।
কেন এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত?
একই ধরনের কাজের জন্য বিনিয়োগকারীদের আগে বিডা, বেজা ও পিপিপিএ-এর মতো একাধিক প্রতিষ্ঠানে দৌড়ঝাঁপ করতে হতো। এতে একদিকে যেমন মূল্যবান সময় নষ্ট হতো, অন্যদিকে সৃষ্টি হতো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। নতুন আইনটি বাস্তবায়িত হলে উদ্যোক্তারা এখন থেকে এক ছাদের নিচেই সব ধরনের প্রশাসনিক ও নীতিগত সেবা পাবেন।
এই ঐতিহাসিক অর্জন প্রসঙ্গে বিডা ও বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং পিপিপিএ-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আশিক চৌধুরী বলেন:
“বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ, বিনিয়োগকারীদের সহায়তা এবং নীতি-সমর্থনের ক্ষেত্রে বাস্তব প্রভাব রাখবে এমন উদ্যোগগুলোতে সরকারের সুস্পষ্ট মনোযোগের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্য অর্জনে দেশের যে বিনিয়োগ প্রয়োজন, তা আনতে হলে বিনিয়োগকারীদের জন্য সত্যিকারের ওয়ান স্টপ সেবা কাঠামো জরুরি।”
তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, একটি একক ও শক্তিশালী বিনিয়োগ সংস্থা গঠন করা দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের বহুদিনের প্রত্যাশা ছিল। এমনকি জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থা (UNCTAD) বাংলাদেশের সামগ্রিক ব্যবসা পরিবেশ পর্যালোচনা করে এই একীভূতকরণের জোরালো সুপারিশ করেছিল। ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ গঠিত হওয়ায় বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশ বিলে যেসব বিশেষ সুবিধা থাকছে
পাস হওয়া নতুন এই আইনে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের স্বস্তি দিতে এবং কাজের গতি বাড়াতে বেশ কয়েকটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা হয়েছে:
- একক শিল্পাঞ্চল ব্যবস্থাপনা: দেশের সমস্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল (EZ), মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলসহ ঘোষিত নতুন শিল্পাঞ্চলগুলোকে একটি কেন্দ্রীয় সমন্বিত কাঠামোর আওতায় পরিচালনা করা হবে।
- দ্রুত লাইসেন্স ও ছাড়পত্র: লাইসেন্স প্রদান, ব্যবসার অনুমোদন এবং আনুষঙ্গিক সেবা দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা ও আধুনিক পদ্ধতি নির্ধারণ করে দেওয়া হচ্ছে।
- সহজ শর্তে পিপিপি (PPP) প্রকল্প: সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) অনুমোদন প্রক্রিয়া আরও সহজ করা হয়েছে। বিশেষ করে ছোট বা ক্ষুদ্র আকারের পিপিপি প্রকল্পগুলো এখন থেকে সরাসরি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের মাধ্যমেই দ্রুত অনুমোদন পাবে।
- অব্যবহৃত সরকারি সম্পদের সদ্ব্যবহার: এতদিন অলস পড়ে থাকা সরকারি জমি, খালি অবকাঠামো, শেয়ার বা সরকারি স্বত্বকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ও উৎপাদনশীল শিল্পকাজে ব্যবহারের নতুন সুযোগ উন্মোচিত হলো।
- একটিই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম: বিনিয়োগ, কোম্পানি নিবন্ধন থেকে শুরু করে ব্যবসায়িক যাবতীয় সেবা এখন থেকে একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের (One-Stop Digital Portal) মাধ্যমে প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
কবে চালু হচ্ছে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’?
সরকারি গেজেট বা প্রজ্ঞাপন জারির নির্ধারিত দিন থেকেই আইনটি কার্যকর হবে। একই দিনে নতুন নাম ও আঙ্গিকে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’-এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
অর্থনীতিবিদ ও খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশে বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ (FDI) উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে এবং জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জন সহজ হবে।




