শুরু হলো অগ্নিঝরা মার্চ- বাঙালির স্বাধীনতার ইতিহাসে এক অনন্য, গৌরবোজ্জ্বল ও সংগ্রামী অধ্যায়ের মাস। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে অধিকার প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্ন এই মার্চ। ১৯৭১ সালের এই মাসেই রচিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের সূচনা, উচ্চারিত হয়েছিল স্বাধীনতার অমর ঘোষণা।
গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জির ধারাবাহিকতায় প্রতি বছরের মতো এবারও ১ মার্চের সূর্যোদয়ে শুরু হলো স্বাধীনতার মাস। তবে এবারের প্রেক্ষাপট কিছুটা আলাদা। দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের গ্লানি পেরিয়ে দেশ এখন পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক পরিবেশে স্বাধীনতার মাস উদযাপন করছে- এ যেন মার্চের চেতনার বাস্তব প্রতিফলন।
গণতান্ত্রিক আবহে স্বাধীনতার মাস
স্বাধীনতার মাস উপলক্ষে দেশজুড়ে নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। মাসের প্রথম দিন থেকেই শুরু হবে আলোচনা সভা, সমাবেশ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোকচিত্র প্রদর্শনী ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নানা আয়োজন। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো আয়োজন করছে বিশেষ কর্মসূচি।
তবে পবিত্র রমজান মাসের প্রতি সম্মান জানিয়ে এবারের কর্মসূচি কিছুটা সীমিত রাখা হয়েছে বলে আয়োজকরা জানিয়েছেন। তবুও জাতীয় পতাকার লাল-সবুজ রঙে সেজে উঠবে দেশ, নতুন প্রজন্ম জানবে ইতিহাসের অমর সেই দিনগুলোর কথা।
১ মার্চ: আন্দোলনের বিস্ফোরণ
১৯৭১ সালের ১ মার্চ ছিল ইতিহাসের এক মোড় ঘোরানো দিন। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ আহূত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন হঠাৎ স্থগিত ঘোষণা করলে সারাদেশে বিক্ষোভের ঝড় ওঠে।
রেডিওতে ঘোষণাটি প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকাসহ সারা দেশে প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। পল্টন ও গুলিস্তান এলাকা হয়ে ওঠে বিক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দু। সেই ক্ষোভ ও প্রতিবাদ ক্রমেই রূপ নেয় অসহযোগ আন্দোলনে, যা পরিণত হয় পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ গণআন্দোলনে।
২৫ মার্চের কালরাত্রি: ইতিহাসের নির্মম অধ্যায়
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানি বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পরিকল্পিত গণহত্যা শুরু করে। ঢাকার রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হয়। নির্বিচারে হত্যা করা হয় নিরস্ত্র মানুষকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চালানো হয় বর্বর হামলা; শহীদ হন অসংখ্য ছাত্র, শিক্ষক ও সাধারণ নাগরিক।
এই নির্মম হত্যাযজ্ঞই বাঙালিকে চূড়ান্ত লড়াইয়ের দিকে ঠেলে দেয়।
স্বাধীনতার ঘোষণা ও সশস্ত্র সংগ্রামের সূচনা
২৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞের পরপরই চট্টগ্রামে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। ২৬ ও ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারিত হয়, যা সারা জাতিকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করে।
২৬ মার্চ ঘোষণার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ ২৩ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের চূড়ান্ত অধ্যায় শুরু হয়। টানা ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বিশ্ব মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।
মার্চের চেতনায় এগিয়ে চলার অঙ্গীকার
অগ্নিঝরা মার্চ কেবল একটি মাস নয়—এটি সাহস, ত্যাগ, ঐক্য ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। স্বাধীনতার মাসে জাতি আবারও শপথ নেয়- মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।
লাল-সবুজের পতাকায় আজও জ্বলজ্বল করে শহীদদের রক্তের স্মারক, আর মার্চের বাতাসে ভেসে আসে স্বাধীনতার অমর ডাক।





