বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এক সময় গভীর সংকটে নিমজ্জিত ছিল। অনিয়ম, ঋণখেলাপি সংস্কৃতি, দুর্বল তদারকি এবং আস্থার সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে পুরো আর্থিক ব্যবস্থা। ঠিক সেই কঠিন সময়ে দায়িত্ব নেন আহসান এইচ মনসুর– যিনি অনেকের চোখে শুধু একজন গভর্নর নন, বরং ব্যাংকিং সিস্টেম পুনরুদ্ধারের নায়ক।
সংকটের সময়ে দৃঢ় নেতৃত্ব
অভ্যুত্থান-পরবর্তী অস্থির বাস্তবতায় যখন দেশের ব্যাংকিং খাত প্রায় অচল হয়ে পড়েছিল, তখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল- আস্থা ফিরিয়ে আনা। আহসান এইচ মনসুর দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমেই জোর দেন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নীতিনির্ভর ব্যবস্থাপনায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতর থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো পর্যন্ত কঠোর বার্তা পৌঁছে দেন- অনিয়মের জায়গা আর থাকবে না।
খেলাপি ঋণ ও শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ
দীর্ঘদিনের জমে থাকা খেলাপি ঋণ, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপ এবং দুর্বল ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ ছিল বড় বাধা। মনসুরের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ব্যাংক তদারকি জোরদার করে, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকগুলোর ওপর বিশেষ নজরদারি আরোপ করা হয় এবং নিয়মভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়। এতে ধীরে ধীরে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরতে থাকে।
আস্থা ফেরানোই ছিল সবচেয়ে বড় অর্জন
ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল সাধারণ আমানতকারীদের আস্থা পুনর্গঠন। বাজারে তারল্য ব্যবস্থাপনা, নীতিগত সিদ্ধান্তে ধারাবাহিকতা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করার ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর মানুষের বিশ্বাস বাড়তে শুরু করে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই আস্থাই ছিল আর্থিক স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি।
সমালোচনা থাকলেও অবদান অস্বীকার করা কঠিন
নীতিগত সংস্কার কখনোই জনপ্রিয় হয় না। কঠোর সিদ্ধান্তের কারণে সমালোচনাও এসেছে। তবে বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, স্বল্পমেয়াদি অসন্তোষ সত্ত্বেও দীর্ঘমেয়াদে এসব পদক্ষেপই ব্যাংকিং খাতকে টিকিয়ে রাখার পথ তৈরি করেছে। সে কারণেই অনেকেই মনে করেন- মনসুরের অবদান ইতিহাসে আলাদা করে মূল্যায়িত হবে।
ইতিহাসে মনসুরের স্থান
বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে এমন সময় খুব কম এসেছে, যখন একজন গভর্নরকে দায়িত্ব নিতে হয়েছে প্রায় ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে। সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর যে প্রচেষ্টা- তার নেতৃত্বে সেটিই শুরু হয়েছিল। তাই অনেকের চোখে, ধ্বংসপ্রাপ্ত ব্যাংকিং সিস্টেম পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে আহসান এইচ মনসুরই ছিলেন নায়ক।





