আধুনিক প্রযুক্তির “হৃৎপিন্ড” হিসেবে পরিচিত সেমিকন্ডাক্টর শিল্প বিশ্বের অর্থনীতি ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বিপুল প্রভাব বিস্তার করছে। স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, বৈদ্যুতিক গাড়ি থেকে শুরু করে স্যাটেলাইট—প্রায় সব ডিভাইসেই সেমিকন্ডাক্টরের ব্যবহার অপরিহার্য। বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারে এই শিল্পের মূল্য ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছুঁইছুঁই, যেখানে দক্ষ জনশক্তির তীব্র ঘাটতি রয়েছে।
বাংলাদেশও এই শিল্পে প্রবেশের পরিকল্পনা করছে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য এটি বিস্ময়কর ক্যারিয়ার সুযোগ হিসেবে উদ্ভাবিত হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের জন্য সেমিকন্ডাক্টর খাতে পথপ্রদর্শক
বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাদিম চৌধুরী জানান, সেমিকন্ডাক্টর খাতে সফল হতে হলে তিনটি বিষয় অপরিহার্য- শক্তিশালী শিক্ষা, লক্ষ্যনির্ধারণ এবং হাতে-কলমে কাজের অভিজ্ঞতা।
বিশেষভাবে শিক্ষার্থীরা একটি নির্দিষ্ট ট্র্যাক বেছে নিতে পারেন:
- ডিজিটাল ভিএলএসআই ও ভেরিফিকেশন
- ফিজিক্যাল ডিজাইন ও টাইমিং
- অ্যানালগ/মিক্সড-সিগন্যাল ডিজাইন
- পাওয়ার ইলেকট্রনিকস
ভেরিফিকেশন ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদা বর্তমানে বিশ্বব্যাপী অনেক বেশি। সেমিকন্ডাক্টরের মৌলিক ধারণা, সিএমওএস, ভিএলএসআই ডিজাইন, পাইথন ও লিনাক্সে দক্ষতা অর্জন শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাথমিক প্রবেশপথ হতে পারে।
হাতে-কলমে অভিজ্ঞতা অর্জনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ওপেন সোর্স টুল ব্যবহার করে নিজস্ব চিপ ডিজাইন, সিমুলেশন এবং ডকুমেন্টেশন শিক্ষার্থীদের জন্য মূল দক্ষতা। এসব প্রজেক্টের আর্কাইভ গিটহাবে সংরক্ষণ করলে আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সুবিধা হবে।
সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের মূল খাতসমূহ
সেমিকন্ডাক্টর শিল্প একটি বহুমাত্রিক ইকোসিস্টেম। প্রধান চারটি স্তর:
- চিপ ডিজাইন (ফ্যাবলেস ডিজাইন): আরটিএল ডিজাইন, ভেরিফিকেশন, ফিজিক্যাল ডিজাইন ও অ্যানালগ/মিক্সড-সিগন্যাল ডিজাইন। বাংলাদেশ থেকে এই খাতে দ্রুত প্রবেশ সম্ভব।
- টেস্টিং ও প্যাকেজিং (ওএসএটি/এটিপি): চিপ উৎপাদনের পর পরীক্ষা ও প্যাকেজিং; এটি বাংলাদেশে দ্রুত কর্মসংস্থান তৈরি করতে সক্ষম।
- ডিভাইস ও প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং: ফ্যাব নির্ভর প্রযুক্তি, যেখানে সিলিকন ওয়েফার উৎপাদন ও ফটোলিথোগ্রাফি সম্পন্ন হয়; দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন।
- ইকুইপমেন্ট ও ম্যাটেরিয়াল সাপোর্ট: উচ্চমানের যন্ত্রপাতি ও বিশেষায়িত উপকরণ; বাংলাদেশে ভারী উৎপাদনের জন্য এখনও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
বাংলাদেশে সম্ভাবনা ও প্রস্তুতি
সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক ফ্যাব স্থাপন ব্যয়বহুল হলেও মানসম্মত মানবসম্পদ গঠন দিয়ে বাংলাদেশ এই শিল্পে শক্ত অবস্থান গড়তে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা ল্যাব, পাইলট লাইন ও ছোট প্রোটোটাইপিং সুবিধা শিক্ষার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা দেবে।
বর্তমানে ক্রেস্ট (Center of Research Excellence in Semiconductor Technology) নামের একটি বিশেষায়িত গবেষণাকেন্দ্র ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করছে। আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ, শিল্প-সহযোগিতায় গবেষণা এবং যৌথ মেধাস্বত্ব উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে এটি চলমান।
উল্কাসেমি ভিএলএসআই ট্রেনিং ইনস্টিটিউটও শিক্ষার্থীদের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ও শিল্প অভিজ্ঞতা দিতে সক্ষম। ২০৩০ সালের মধ্যে তারা ৫ হাজার দক্ষ সেমিকন্ডাক্টর প্রকৌশলী তৈরি করতে চাইছে।
বাংলাদেশ সরকারের সিসিপ (Skills for Industry Competitiveness and Innovation Program) শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দেবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রশিক্ষিতদের অন্তত ৬৫% চাকরিতে যুক্ত হবে।
ভবিষ্যতের দিগন্ত
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, 5G/6G, অটোমোটিভ ইলেকট্রনিকস ও স্মার্ট ডিভাইস–এর বিস্তারে ২০৩৪ সালের মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বাজার ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস। বাংলাদেশের জন্য এটি কেবল একটি শিল্প নয়, বরং জাতীয় প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব এবং রপ্তানি কৌশলের মূল ভিত্তি।
উচ্চমানের প্রশিক্ষণ, শিল্প-সংযুক্ত পাঠ্যক্রম ও আন্তর্জাতিক মানের কাজের সংস্কৃতি নিশ্চিত করলে, বাংলাদেশ ডিজাইন এবং ডিজাইন-সংক্রান্ত সেবায় দ্রুত বিশ্ববাজারে অবস্থান স্থাপন করতে পারবে।
সুত্রঃ প্রথম আলো





