বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের সর্বশেষ আসরে বিপিএলে ফিক্সিং অভিযোগ ঘিরে আলোচনার ঝড় ওঠে দেশজুড়ে। সন্দেহভাজন তালিকায় ছিলেন জাতীয় দলের অভিজ্ঞ ব্যাটার এনামুল হক বিজয় এবং মোসাদ্দেক হোসেনও। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের প্রতি জনগণের বিশ্বাস নড়বড়ে হওয়ায় ভবিষ্যতে যেন কোনো দুর্নীতি বা ফিক্সিং ছায়াও না পড়ে-সে লক্ষ্যেই বড় উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।
আগামী মৌসুম থেকে প্রতিটি দলে বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-এর সদস্য যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বোর্ড। বিপিএল নিলাম শেষে রোববার (৩০ নভেম্বর) সাংবাদিকদের এই তথ্য জানান বিসিবির সহ-সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন।
খেলার স্বচ্ছতায় বিসিবির কঠোর অবস্থান
বিসিবির ইন্টেগ্রিটি ইউনিট দীর্ঘদিন ধরে খেলোয়াড়দের আচরণ, যোগাযোগ ও সন্দেহজনক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে নিয়মিত রিপোর্ট দিয়ে আসছে। তবে এবার সেই পর্যবেক্ষণ আরো শক্তিশালী করতে সিআইডির সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সাখাওয়াত হোসেন বলেন-
“খেলার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আমরা নতুন উদ্যোগ নিয়েছি। প্রতিটি দলে সিআইডির দুই কর্মকর্তা-একজন ইউনিফর্মে ও একজন সাদা পোশাকে—সংযুক্ত থাকবেন। খেলার মধ্যে যেন কোনো ধরনের দুর্নীতি ঢুকে পড়তে না পারে, সেটিই আমাদের লক্ষ্য।”
তিনি জানান, এই লক্ষ্যে বাংলাদেশ পুলিশের সিআইডির সঙ্গে শিগগিরই একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করা হবে। ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোকে বিষয়টি লিখিতভাবে জানানোও হবে।
কেন সিআইডি যুক্ত হচ্ছে?
সিআইডির কাছে আধুনিক প্রযুক্তি, সাইবার বিশ্লেষণ ব্যবস্থা এবং উচ্চমানের ফরেনসিক সক্ষমতা রয়েছে। ফলে ম্যাচ ফিক্সিংসহ যেকোনো দুর্নীতি রোধে তাদের দায়িত্ব পালন হবে অত্যন্ত কার্যকর।
বিসিবির সহ-সভাপতি জানান-
“সিআইডি দেশের সবচেয়ে উন্নত অপরাধ তদন্ত সংস্থা। প্রয়োজন হলে তারা হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো, মেসেঞ্জার-যেকোনো কথোপকথন বিশ্লেষণ করতে পারে। তাদের আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের কাজে বড় সহায়তা করবে।”
এর ফলে খেলোয়াড়, কোচ, বিদেশি স্টাফ ও দলীয় সদস্যদের ওপর নজরদারি আরো উন্নত হবে। ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিক, ম্যানেজার, ও টিম অফিসিয়ালদের যোগাযোগও খতিয়ে দেখা সম্ভব হবে।
সাম্প্রতিক ফিক্সিং বিতর্ক পেছনে কারণ
প্রতিযোগিতাকে ঘিরে যে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে, তার মূল কারণ হলো-
- কয়েকজন খেলোয়াড়ের অস্বাভাবিক পারফরম্যান্স,
- সন্দেহজনক ফোন কল,
- গোপন যোগাযোগ,
- এবং এজেন্টদের মাধ্যমে ফিক্সিং প্রস্তাব পাওয়ার অভিযোগ।
এ কারণে শেষ বিপিএলে সাতজন ক্রিকেটারকে সরাসরি নিলাম থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। বিসিবি চায় না ভবিষ্যতে এমন ঘটনা পুনরায় ঘটুক।
ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোও সন্তুষ্ট
বিপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো ইতোমধ্যেই সামগ্রিক সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। কারণ,
- খেলার স্বচ্ছতা নিশ্চিত হলে টুর্নামেন্টের মান বাড়বে,
- দর্শকদের বিশ্বাস ফিরবে,
- আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণও বাড়বে।
আগামী মৌসুমে কী হতে পারে
বিসিবির এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে-
- খেলোয়াড়দের চলাফেরা, যোগাযোগ ও আচরণ পর্যবেক্ষণে কড়া নজরদারি থাকবে,
- সন্দেহজনক কার্যকলাপ দ্রুত চিহ্নিত করা যাবে,
- মাঠের বাইরে ‘দালালচক্র’ নিয়ন্ত্রণে থাকবে,
- আগেই সতর্ক করে ঝুঁকি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
এতে একটা বার্তা স্পষ্ট—
“ফিক্সিং করলে ছাড় নেই। ক্রিকেটের ওপর আঘাত করলে কঠোর ব্যবস্থা।”
বাংলাদেশ ক্রিকেটে আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি মাইলফলক সিদ্ধান্ত। প্রতিটি দলে দুইজন সিআইডি কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হলে ফিক্সিংকারীদের পক্ষে কোনো ফাঁকফোকর খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে।
বিপিএলের জনপ্রিয়তা দিনে দিনে বাড়ছে। এখন প্রয়োজন স্বচ্ছতা, সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতা—আর এই উদ্যোগ সেটিই নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখবে।