ঢাকা-৯ আসনের নির্বাচনী রাজনীতিতে এক নতুন ধারা ও নৈতিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সংসদ সদস্য প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা। পোস্টারবিহীন, নিয়ম মেনে পরিচালিত প্রচারণা এবং আইনের বাইরে এক টাকাও বেশি খরচ না করার অঙ্গীকার করেন তিনি। সাধারণ মানুষের ক্ষুদ্র অনুদানের ওপর ভর করে মাত্র সাত ঘণ্টায় ১২ লাখ টাকারও বেশি সংগ্রহ করে তিনি দেখিয়েছেন- ” রাজনীতি শুধু অর্থশক্তির নয়, মানুষের বিশ্বাসই আসল শক্তি।”
শৈশবের স্মৃতি থেকে রাজনৈতিক অবস্থান
একটি আবেগঘন স্মৃতিচারণার মাধ্যমে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করেন ডা. তাসনিম জারা। খিলগাঁওয়ে শৈশবের একটি অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, কীভাবে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের সাদা করে রঙ করা দেয়াল রাজনৈতিক পোস্টারে ঢেকে গিয়েছিল, অনুমতি ছাড়াই।
নির্বাচন শেষে সেই দেয়াল আর কেউ পরিষ্কার করতে আসেনি। এই অভিজ্ঞতাই তাকে শিখিয়েছে-
রাজনীতিতে ক্ষমতার চর্চা অনেক সময় সাধারণ মানুষের অধিকারকে উপেক্ষা করে।
পোস্টার নিষেধাজ্ঞা ও বাস্তবতার বৈপরীত্য
নির্বাচন কমিশনের পোস্টার নিষেধাজ্ঞার ঘোষণায় তিনি আশাবাদী হয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, অন্তত এবার শহরের দেয়ালগুলো বাঁচবে, নিয়মের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।
কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। দেখা যাচ্ছে, যারা আইন মানছে না তারাই বেশি দৃশ্যমান, আর যারা নিয়ম মেনে চলছে তারা আড়ালে।
তবুও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে ডা. তাসনিম জারা বলেন-
“নিয়ম ভেঙে জিতলেও আমি নিজের কাছেই হেরে যাব।”
আইনের বাইরে এক টাকাও নয়- স্বচ্ছ রাজনীতিই নতুন বাংলাদেশের পথ।
এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন-
"আইনে অনুমদিত টাকার বাইরে একটা টাকাও আমি খরচ করবো না। অনেকেই বলেন এত অল্প বাজেটে নির্বাচন করা সম্ভব না। আমি বেশি আদর্শিক এভাবে নির্বাচন হয়না। কিন্তু নতুন বাংলাদেশ গড়তে আমাদের এইটাই করতে হবে এইটা করা ছাড়া কোন বিকল্প নাই । কারন নির্বাচনের খরচ যখন ১০ কোটি ২০ কোটি টাকা পার হয়ে যায় তখন নির্বাচিত হওয়ার পর সেই টাকাটা তুলতে চাদাবাজি টেন্ডারবাজি প্রায় বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। এবং এভাই রাজনীতি চলে যায় মুষ্টিমেয় কিছু সিন্ডিকেটের হাতে "
ক্ষুদ্র অনুদানে গড়া বড় আস্থা
আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ও নৈতিক অবস্থানের পাশাপাশি মানুষের অভূতপূর্ব সাড়া তাকে নতুন অনুপ্রেরণা দিয়েছে। অনুদানের বড় অংশ এসেছে ৫, ১০, ২০, ৫০ ও ১০০ টাকার মতো ক্ষুদ্র অঙ্কে।
একজন শিক্ষার্থীর পাঠানো একটি বার্তা যেন পুরো আন্দোলনের প্রতীক হয়ে উঠেছে-
“আমি স্টুডেন্ট। সামর্থ্য অনুযায়ী দিলাম।”
এই ছোট ছোট অনুদানই প্রমাণ করছে, রাজনীতিতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ এখন আর কল্পনা নয়- এটি বাস্তব।
স্বচ্ছতা ও নির্দিষ্ট লক্ষ্যের প্রতিশ্রুতি
ডা. তাসনিম জারা জানিয়েছেন, মোট তহবিল সংগ্রহের লক্ষ্য ৪৬ লাখ ৯৩ হাজার ৫৮০ টাকা। লক্ষ্য পূরণ হলেই ফান্ডরেইজিং বন্ধ করা হবে।
আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে শুরু থেকেই আলাদা অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে এবং প্রতিটি লেনদেনের সম্পূর্ণ হিসাব জনসম্মুখে প্রকাশ করা হবে।
সাত ঘণ্টায় ১২ লাখ, এরপর কী?
মাত্র সাত ঘণ্টায় ১২ লাখ টাকারও বেশি সংগ্রহ হওয়ার পর তিনি আরও জানান,
আর ৩৪ লাখ টাকা সংগ্রহ সম্পন্ন হলেই ফান্ডরেইজিং বন্ধ করে দেওয়া হবে।
কারণ এই আন্দোলনের লক্ষ্য প্রয়োজনের বেশি অর্থ নয়- প্রয়োজন মানুষের বিশ্বাস।
বর্তমানে রাত ২টার পর নির্ধারিত লিমিট অতিক্রম করার কারণে বিকাশের মাধ্যমে অনুদান পাঠানো সাময়িকভাবে সম্ভব হচ্ছে না। তবে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ডোনেশন গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে।
অর্থের বাইরে একটি শক্ত বার্তা
এই সাড়া কেবল অর্থ সংগ্রহের হিসাব নয়- এটি একটি শক্ত বার্তা।
মানুষ এখন পোস্টার, প্রভাব বা কালো টাকা নয়-
স্বচ্ছতা, নীতি ও সততার পক্ষে দাঁড়াতে চায়।
এই যাত্রা তাই শুধু একটি নির্বাচনী প্রচারণা নয়,
এটি একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা।
রাজনীতি হতে পারে পরিচ্ছন্ন ও মানবিক
এই উদ্যোগ দেখিয়ে দিচ্ছে-
রাজনীতি মানেই পোস্টার, দাপট বা অস্বচ্ছ অর্থ নয়।
রাজনীতি হতে পারে পরিচ্ছন্ন, মানবিক ও অংশগ্রহণমূলক।
ক্ষুদ্র অনুদানে গড়া এই তহবিল কেবল অর্থ সংগ্রহ নয়-
এটি একটি মূল্যবোধের আন্দোলন।