শনিবার, জানুয়ারি ১০, ২০২৬

ডায়াবেটিস লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

বহুল পঠিত

ডায়াবেটিস

ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ যা বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি মানুষকে প্রভাবিত করে। এই অবস্থায় শরীরে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়। অগ্ন্যাশয় পর্যাপ্ত ইনসুলিন উৎপাদন করতে পারে না বা শরীর ইনসুলিন সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না। ইনসুলিন একটি হরমোন যা রক্তে শর্করা কোষে প্রবেশ করিয়ে শক্তি উৎপাদনে সাহায্য করে। ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত থাকলে হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি রোগ, চোখের সমস্যা এবং স্নায়ুর ক্ষতি হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪২ কোটি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং এই সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বাংলাদেশেও ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সঠিক জ্ঞান, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং নিয়মিত চিকিৎসার মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

ডায়াবেটিসের প্রকারভেদ ও কারণ

ডায়াবেটিস মূলত তিন প্রকার: টাইপ ১, টাইপ ২ এবং গর্ভকালীন ডায়াবেটিস। টাইপ ১ ডায়াবেটিসে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষগুলোকে আক্রমণ করে এবং ধ্বংস করে দেয়। ফলে ইনসুলিনের অভাব দেখা দেয়। এই ধরনের ডায়াবেটিস সাধারণত শৈশব বা কৈশোরে শুরু হয়। টাইপ ২ ডায়াবেটিস সবচেয়ে সাধারণ প্রকার, যা ডায়াবেটিস রোগীদের প্রায় ৯০% ক্ষেত্রে দেখা যায়। এতে শরীর ইনসুলিন উৎপাদন করলেও সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না (ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স) বা পর্যাপ্ত পরিমাণে ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না। অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক নড়াচড়ার অভাব, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং বংশগতি এর প্রধান কারণ। গর্ভকালীন ডায়াবেটিস গর্ভাবস্থায় প্রথমবার শনাক্ত হয় এবং সাধারণত সন্তান প্রসবের পর সেরে যায়।

ডায়াবেটিসের লক্ষণ ও পূর্বাভাস

ডায়াবেটিসের প্রাথমিক লক্ষণগুলো সবসময় স্পষ্ট হয় না, বিশেষ করে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে। সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ঘন ঘন প্রস্রাব, অস্বাভাবিক ক্ষুধা, অজানা কারণে ওজন হ্রাস, চরম ক্লান্তি, ঝাপসা দৃষ্টি, ধীর গতির ক্ষত নিরাময়, ঘন ঘন সংক্রমণ এবং হাত ও পায়ে অসাড়তা বা ঝিনঝিন ভাব। টাইপ ১ ডায়াবেটিসের লক্ষণগুলো সাধারণত দ্রুত এবং তীব্রভাবে প্রকাশ পায়, যেখানে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের লক্ষণগুলো ধীরে ধীরে বিকশিত হয় এবং কয়েক বছর ধরে থাকতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীরা কোনো লক্ষণ অনুভব না করেও থাকতে পারেন। কিছু লোকের ক্ষেত্রে, ডায়াবেটিস প্রথম শনাক্ত হয় যখন তারা হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি সমস্যা বা চোখের সমস্যার মতো জটিলতার সম্মুখীন হন। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের স্ক্রিনিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ডায়াবেটিস নির্ণয় পদ্ধতি

রক্তে শর্করার মাত্রা পরিমাপ করে ডায়াবেটিস শনাক্ত করা হয়। ফাস্টিং প্লাজমা গ্লুকোজ (FPG) পরীক্ষায় রাতে ৮ ঘণ্টা উপবাসের পর রক্তে শর্করার মাত্রা পরিমাপ করা হয়। ১২৬ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার বা তার বেশি হলে ডায়াবেটিস নির্ণয় করা হয়। অরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট (OGTT) পরীক্ষায় রাতে ৮ ঘণ্টা উপবাসের পর রক্তের শর্করা মাপা হয়, তারপর রোগীকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ গ্লুকোজ পান করানো হয় এবং ২ ঘণ্টা পর আবার রক্তের শর্করা মাপা হয়। ২ ঘণ্টা পর ২০০ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার বা তার বেশি হলে ডায়াবেটিস ধরা হয়। গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন (A1C) পরীক্ষায় গত ২-৩ মাসের গড় রক্ত শর্করার মাত্রা নির্ণয় করা হয়। ৬.৫% বা তার বেশি A1C মাত্রা ডায়াবেটিস নির্দেশ করে। র্যান্ডম প্লাজমা গ্লুকোজ পরীক্ষায় যেকোনো সময়ে রক্তের শর্করা মাপা হয় এবং ২০০ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার বা তার বেশি হলে এবং ডায়াবেটিসের লক্ষণ থাকলে ডায়াবেটিস নির্ণয় করা হয়।

ডায়াবেটিস প্রতিরোধের কৌশল

বিশেষ করে টাইপ ২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধের জন্য কিছু কার্যকর কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে। স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা ডায়াবেটিস প্রতিরোধের অন্যতম উপায়। অতিরিক্ত ওজন, বিশেষ করে পেটের চর্বি ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আঁশযুক্ত খাবার, শস্যদানা, ফলমূল, সবজি এবং চর্বিহীন প্রোটিন খাওয়া উচিত। প্রক্রিয়াজাত খাবার, মিষ্টি পানীয় এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাট জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলা উচিত। নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করা ডায়াবেটিস প্রতিরোধে সহায়ক। সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি তীব্রতার ব্যায়াম করা উচিত। ধূমপান এবং অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ এড়িয়ে চলা প্রয়োজন। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো এবং রক্তে শর্করার মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা উচিত। যাদের পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস আছে তাদের বিশেষ সতর্ক থাকা উচিত। স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট এবং পর্যাপ্ত ঘুমও ডায়াবেটিস প্রতিরোধে সহায়তা করে।

ডায়াবেটিসের চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা

ডায়াবেটিসের চিকিৎসা একটি আজীবন প্রক্রিয়া যার লক্ষ্য রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক রাখা এবং জটিলতা প্রতিরোধ করা। টাইপ ১ ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় ইনসুলিন গ্রহণ অপরিহার্য। ইনসুলিন ইনজেকশন, ইনসুলিন পাম্প বা অন্যান্য পদ্ধতিতে দেওয়া যেতে পারে। টাইপ ২ ডায়াবেটিসের চিকিৎসা শুরু হয় জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, নিয়মিত ব্যায়াম এবং ওজন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। যদি জীবনযাত্রার পরিবর্তন যথেষ্ট না হয়, তবে মুখে খাওয়া ওষুধ (যেমন মেটফর্মিন, সালফোনিলিউরিয়া, ডিপিপি-৪ ইনহিবিটর, এসজিএলটি২ ইনহিবিটর) দেওয়া হয়। কিছু ক্ষেত্রে টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীদেরও ইনসুলিন গ্রহণ করতে হতে পারে। গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন এবং নিয়মিত ব্যায়াম প্রধান ভূমিকা পালন করে। প্রয়োজনে ইনসুলিন দেওয়া হয়। ডায়াবেটিস রোগীদের নিয়মিত রক্তে শর্করা পরিমাপ করা, ওষুধ নিয়মিত গ্রহণ করা এবং চিকিৎসকের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা উচিত।

ডায়াবেটিস রোগীদের খাদ্যাভ্যাস

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সঠিক খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি সুষম খাদ্য পরিকল্পনা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। আঁশযুক্ত খাবার যেমন শস্যদানা, ডাল, ফলমূল এবং সবজি খাওয়া উচিত। আঁশ হজম ধীর করে এবং রক্তে শর্করা বৃদ্ধির হার কমিয়ে দেয়। শর্করাজাতীয় খাবারের পরিমাণ সীমিত রাখতে হবে। জটিল কার্বোহাইড্রেট যেমন বাদামী চাল, ওটস, পুরো শস্যদানা জাতীয় খাবার সাধারণ কার্বোহাইড্রেটের তুলনায় ভালো। চর্বিহীন প্রোটিন যেমন মাছ, মুরগির মাংস (ত্বক ছাড়া), ডিম, দই এবং ডাল খাওয়া উচিত। স্বাস্থ্যকর চর্বি যেমন জলপাই তেল, বাদাম, বীজ এবং অ্যাভোকাডো খাওয়া যেতে পারে। প্রক্রিয়াজাত খাবার, মিষ্টি পানীয়, সাদা চিনি, সাদা ময়দা এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাট জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলা উচিত। খাবার পরিবেশনের আকার নিয়ন্ত্রণ করা গুরুত্বপূর্ণ। প্লেট পদ্ধতি ব্যবহার করে খাবার পরিবেশন করা যেতে পারে: প্লেটের অর্ধেক ভর্তি সবজি, এক চতুর্থাংশ প্রোটিন এবং এক চতুর্থাংশ কার্বোহাইড্রেট দিয়ে ভর্তি করা। নিয়মিত খাবারের সময় মেনে চলা এবং খাবারের মধ্যে বিরতি বেশি না দেওয়া উচিত।

ডায়াবেটিসের জটিলতা ও প্রতিরোধ

হৃদরোগ এবং স্ট্রোক ডায়াবেটিসের প্রধান জটিলতা। ডায়াবেটিস রক্তনালীগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং হৃদপিণ্ডের রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথি বা কিডনি রোগ একটি গুরুতর জটিলতা। এতে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে এবং ডায়ালিসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে। ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি চোখের রেটিনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং অন্ধত্বের কারণ হতে পারে। ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি স্নায়ুকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, বিশেষ করে পায়ে। এতে পায়ে অসাড়তা, ঝিনঝিনি ভাব, ব্যথা এবং ক্ষত হতে পারে। ডায়াবেটিস রোগীদের পায়ের ক্ষত নিরাময়ে বিলম্ব হয় এবং ক্ষত সংক্রমিত হয়ে পা কেটে ফেলার প্রয়োজন হতে পারে। ডায়াবেটিস ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা, মুখের স্বাস্থ্য সমস্যা এবং শ্রবণশক্তি হ্রাসের ঝুঁকি বাড়ায়। এছাড়া ডায়াবেটিস ডিমেনশিয়া এবং অ্যালঝাইমারের ঝুঁকিও বাড়ায়। রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা, নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে এই জটিলতাগুলো প্রতিরোধ বা বিলম্বিত করা সম্ভব।

ডায়াবেটিস ও মানসিক স্বাস্থ্য

ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে অবসাদ, উদ্বেগ এবং স্ট্রেস দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। দীর্ঘস্থায়ী রোগ হিসেবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, নিয়মিত ব্যায়াম এবং রক্তে শর্করা পরিমাপের প্রয়োজন হয়, যা অনেক সময় মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। ডায়াবেটিস রোগীরা অনেক সময় ডায়াবেটিস বার্নআউট বা ক্লান্তি অনুভব করেন, যখন তারা রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য ক্লান্ত হয়ে পড়েন। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়ার ভয়, জটিলতার আশঙ্কা এবং জীবনযাত্রার সীমাবদ্ধতা মানসিক চাপ বাড়ায়। একইসাথে, মানসিক চাপ এবং অবসাদ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণকে আরও কঠিন করে তোলে, যা একটি দুষ্টচক্র তৈরি করে। ডায়াবেটিস রোগীদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার ও বন্ধুদের সমর্থন, ডায়াবেটিস শিক্ষা, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট কৌশল (যেমন ধ্যান, যোগব্যায়াম, গভীর শ্বাসপ্রশ্বাস), নিয়মিত ব্যায়াম এবং প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাদারের সাহায্য নেওয়া উচিত। ডায়াবেটিস রোগীদের স্ব-যত্নের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া উচিত এবং নিজেকে সময় দেওয়া উচিত।

ডায়াবেটিসের সাম্প্রতিক গবেষণা ও ভবিষ্যৎ

নতুন ওষুধ, ইনসুলিন ডেলিভারি সিস্টেম এবং প্রযুক্তি ডায়াবেটিস রোগীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করছে। কন্টিনিউয়াস গ্লুকোজ মনিটরিং (CGM) সিস্টেম রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে সাহায্য করে। এই সিস্টেমগুলো স্মার্টফোনের সাথে সংযুক্ত থাকে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে গেলে বা কমে গেলে সতর্ক করে। আর্টিফিশিয়াল প্যাংক্রিয়াস বা ক্লোজড-লুপ সিস্টেম একটি উন্নত প্রযুক্তি যা CGM এবং ইনসুলিন পাম্পকে একসাথে কাজ করে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইনসুলিন সরবরাহ করে। নতুন ওষুধ যেমন GLP-1 রিসেপ্টর অ্যাগনিস্ট, SGLT2 ইনহিবিটর এবং ডুয়াল অ্যাগনিস্ট ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। সেল থেরাপি এবং স্টেম সেল গবেষণা ডায়াবেটিসের সম্ভাব্য নিরাময়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ইনসুলিন পিল, নাকের স্প্রে এবং ইনসুলিন প্যাচের মতো নতুন ইনসুলিন ডেলিভারি পদ্ধতি গবেষণাধীন রয়েছে। ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসা, জিনোমিক্স এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। ভবিষ্যতে, ডায়াবেটিসের চিকিৎসা আরও সুনির্দিষ্ট, কার্যকর এবং রোগী-বান্ধব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রশ্নোত্তর

. ডায়াবেটিস কী?

ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ যেখানে শরীরে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়। এটি ঘটে যখন অগ্ন্যাশয় পর্যাপ্ত ইনসুলিন উৎপাদন করতে পারে না বা শরীর ইনসুলিন সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না। ইনসুলিন একটি হরমোন যা রক্তে শর্করা কোষে প্রবেশ করিয়ে শক্তি উৎপাদনে সাহায্য করে।

. ডায়াবেটিসের প্রধান লক্ষণগুলো কী কী?

ডায়াবেটিসের প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ঘন ঘন প্রস্রাব, অস্বাভাবিক ক্ষুধা, অজানা কারণে ওজন হ্রাস, চরম ক্লান্তি, ঝাপসা দৃষ্টি, ধীর গতির ক্ষত নিরাময়, ঘন ঘন সংক্রমণ এবং হাত ও পায়ে অসাড়তা বা ঝিনঝিন ভাব।

. ডায়াবেটিস কয় প্রকার?

ডায়াবেটিস মূলত তিন প্রকার: টাইপ ১, টাইপ ২ এবং গর্ভকালীন ডায়াবেটিস। টাইপ ১ ডায়াবেটিসে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষগুলোকে আক্রমণ করে। টাইপ ২ ডায়াবেটিসে শরীর ইনসুলিন সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না। গর্ভকালীন ডায়াবেটিস গর্ভাবস্থায় প্রথমবার শনাক্ত হয়।

. ডায়াবেটিস নির্ণয়ের পদ্ধতিগুলো কী কী?

ডায়াবেটিস নির্ণয়ের জন্য বেশ কয়েকটি পরীক্ষা রয়েছে: ফাস্টিং প্লাজমা গ্লুকোজ (FPG) পরীক্ষা, অরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট (OGTT), গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন (A1C) পরীক্ষা এবং র্যান্ডম প্লাজমা গ্লুকোজ পরীক্ষা। এই পরীক্ষাগুলো রক্তে শর্করার মাত্রা পরিমাপ করে ডায়াবেটিস শনাক্ত করতে সাহায্য করে।

. ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব কিনা?

টাইপ ১ ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, কিন্তু টাইপ ২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধের জন্য কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা, নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করা, ধূমপান এবং অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ এড়িয়ে চলা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো টাইপ ২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধে সহায়তা করে।

. ডায়াবেটিস রোগীদের খাদ্যাভ্যাসে কী কী পরিবর্তন আনতে হবে?

ডায়াবেটিস রোগীদের সুষম খাদ্য পরিকল্পনা অনুসরণ করা উচিত। আঁশযুক্ত খাবার যেমন শস্যদানা, ডাল, ফলমূল এবং সবজি খাওয়া উচিত। শর্করাজাতীয় খাবারের পরিমাণ সীমিত রাখতে হবে। চর্বিহীন প্রোটিন এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি খাওয়া উচিত। প্রক্রিয়াজাত খাবার, মিষ্টি পানীয়, সাদা চিনি, সাদা ময়দা এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাট জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলা উচিত। খাবার পরিবেশনের আকার নিয়ন্ত্রণ করা এবং নিয়মিত খাবারের সময় মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ।

. ডায়াবেটিসের জটিলতাগুলো কী কী?

ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত থাকলে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে হৃদরোগ এবং স্ট্রোক, ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথি বা কিডনি রোগ, ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি বা চোখের সমস্যা, ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি বা স্নায়ুর ক্ষতি, পায়ের ক্ষত এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতা। এছাড়া ডায়াবেটিস ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা, মুখের স্বাস্থ্য সমস্যা, শ্রবণশক্তি হ্রাস, ডিমেনশিয়া এবং অ্যালঝাইমারের ঝুঁকিও বাড়ায়।

. ডায়াবেটিস রোগীদের কি ব্যায়াম করা উচিত?

ডায়াবেটিস রোগীদের নিয়মিত ব্যায়াম করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি তীব্রতার ব্যায়াম করা উচিত। হাঁটা, সাঁতার, সাইকেল চালানো, নাচ এবং জিমে ব্যায়াম করা যেতে পারে। ব্যায়াম শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ব্যায়ামের সময় রক্তে শর্করার মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজনে খাবার বা ওষুধ গ্রহণ করা উচিত।

. ডায়াবেটিস রোগীদের কি ইনসুলিন নিতেই হবে?

সব ডায়াবেটিস রোগীদের ইনসুলিন নিতে হয় না। টাইপ ১ ডায়াবেটিস রোগীদের ইনসুলিন গ্রহণ অপরিহার্য, কারণ তাদের শরীরে ইনসুলিন উৎপাদন হয় না। টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীদের প্রথমে জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং মুখে খাওয়া ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা শুরু করা হয়। যদি এই চিকিৎসায় রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে না আসে, তবে ইনসুলিন দেওয়া হতে পারে।

১০. ডায়াবেটিস রোগীদের পায়ের যত্ন কেমন হওয়া উচিত?

ডায়াবেটিস রোগীদের পায়ের যত্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন পা পরিষ্কার করে শুকিয়ে নিতে হবে। পায়ের ত্বকে কোনো ক্ষত, ফোঁড়া বা ফাটা আছে কিনা তা নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। আরামদায়ক এবং সঠিক আকারের জুতা পরিধান করতে হবে। খালি পায়ে হাঁটা এড়িয়ে চলতে হবে।

আরো পড়ুন

ভাজাপোড়া খাবার খেলে কী হয়? মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বাঁচার উপায়

বিকেলে চায়ের সাথে একটু সিঙ্গারা, পুরি কিংবা ফ্রেঞ্চ ফ্রাই—আমাদের অনেকেরই নিত্যদিনের অভ্যাস। ভাজাপোড়া খাবার বা Fried Food খেতে সুস্বাদু হলেও নিয়মিত এটি গ্রহণ করা শরীরের জন্য বড় ধরনের বিপদের কারণ হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, অতিরিক্ত ভাজা খাবার হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং ক্যানসারের মতো মারণব্যাধী ডেকে আনতে পারে।

জাপানের স্মার্ট টয়লেট মল স্ক্যান করে জানাবে আপনার স্বাস্থ্যের অবস্থা

প্রযুক্তি আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে প্রতিনিয়ত সহজ ও বুদ্ধিমান করে তুলছে। স্মার্টফোন, স্মার্টওয়াচের পর এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো- স্মার্ট টয়লেট। অবাক লাগলেও সত্য, জাপানের বিশ্বখ্যাত স্যানিটেশন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান টোটো (Toto Ltd.) এমন এক টয়লেট তৈরি করেছে, যা ব্যবহারকারীর মল বিশ্লেষণ করে তার স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানাতে সক্ষম।

এক হাতেই দুই হাজার কিডনি প্রতিস্থাপন: মানবসেবাকে ইবাদত বানানো ডা. কামরুল

একজন চিকিৎসক যখন পেশাকে শুধু জীবিকা নয়, বরং ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করেন, তখন তার কাজ হয়ে ওঠে হাজারো মানুষের বেঁচে থাকার গল্প। ঠিক তেমনই এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম- যিনি একাই সম্পন্ন করেছেন দুই হাজার কিডনি প্রতিস্থাপন, অথচ বিনিময়ে নেননি কোনো সার্জন ফি। টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ কমপক্ষে ২০ কোটি টাকা।
- Advertisement -spot_img

আরও প্রবন্ধ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ প্রবন্ধ