নতুন বছরের হিমেল হাওয়ায় উষ্ণতা ছড়াতে আজ থেকে শুরু হলো দেশের পণ্য প্রদর্শনীর সবচেয়ে বড় আসর—৩০তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা (DITF-2026)। আজ শনিবার সকালে পূর্বাচলের বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারে (বিসিএফসি) এই মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন অন্তর্বর্তী সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। কেবল কেনাকাটা নয়, বিনোদন আর আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে এবারের মেলা হয়ে উঠেছে এক অনন্য মিলনমেলা।
শোক কাটিয়ে উৎসবের আমেজ
নতুন বছরের প্রথম দিনে মেলা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয় শোকের কারণে তা দুই দিন পিছিয়ে দেওয়া হয়। রাষ্ট্রীয় শোকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে আজ ৩ জানুয়ারি মেলা প্রাঙ্গণ উন্মুক্ত করা হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন,
"এই মেলা আমাদের জাতীয় অর্থনীতির দর্পণ। দেশীয় উদ্যোক্তাদের তৈরি বিশ্বমানের পণ্য প্রদর্শনের মাধ্যমে আমরা রপ্তানি বাজারে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে চাই।"
স্মার্ট প্রযুক্তিতে বদলে যাওয়া মেলা
এবারের মেলার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর ডিজিটাল সুযোগ-সুবিধা। মেলা কর্তৃপক্ষ (ইপিবি) এবার পূর্ণাঙ্গ **‘স্মার্ট মেলা’**র ধারণা বাস্তবায়িত করেছে।
- ই-টিকিটিং ও কিউআর কোড: দর্শনার্থীরা বাড়িতে বসেই মেলার টিকিট কাটতে পারছেন। গেটে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর কষ্ট ছাড়াই ফোনের কিউআর কোড স্ক্যান করে দ্রুত প্রবেশ নিশ্চিত করা হচ্ছে।
- অনলাইন স্টল ম্যানেজমেন্ট: ব্যবসায়ীদের স্টল বরাদ্দ থেকে শুরু করে সব ধরনের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবার অনলাইনে সম্পন্ন হয়েছে, যা মেলার ইতিহাসে এক বড় মাইলফলক।
- ফ্রি ওয়াই-ফাই ও ডিজিটাল ম্যাপ: মেলা প্রাঙ্গণের কোথায় কোন প্যাভিলিয়ন তা খুঁজে পেতে এবার ডিজিটাল ম্যাপ এবং দর্শনার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট জোনে ফ্রি ওয়াই-ফাইয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
যাতায়াতে দুশ্চিন্তার অবসান: বিআরটিসি ও পাঠাওয়ের বিশেষ সেবা
পূর্বাচলের স্থায়ী ভেন্যুতে মেলা হওয়ায় যাতায়াত নিয়ে একসময় যে শঙ্কা ছিল, তা দূর করতে এবার সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
- বিআরটিসি শাটল সার্ভিস: কুড়িল বিশ্বরোড থেকে মেলা প্রাঙ্গণ পর্যন্ত ১০০টিরও বেশি ডেডিকেটেড বিআরটিসি বাস নিয়মিত চলাচল করবে। মাত্র ২০-৩০ মিনিটের ব্যবধানে দর্শনার্থীরা মেলায় যাতায়াত করতে পারবেন।
- পাঠাও (Pathao) অফার: মেলা উপলক্ষে জনপ্রিয় রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ‘পাঠাও’ বিশেষ প্রোমো কোড ও ডিসকাউন্টের ঘোষণা দিয়েছে। ফলে ব্যক্তিগত বাইক বা কারে যারা আসবেন, তারা সাশ্রয়ী মূল্যে যাতায়াত করতে পারবেন।
- প্রশস্ত রাস্তা ও পার্কিং: ৩০০ ফিট রাস্তার আধুনিকায়ন এবং মেলার বিশাল পার্কিং লট নিশ্চিত করছে যে কোনো যানজট ছাড়াই দর্শনার্থীরা মেলা উপভোগ করতে পারবেন।
দেশি-বিদেশি পণ্যের মেগা সমাহার
এবারের মেলায় বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, তুরস্ক, ইরান, থাইল্যান্ড এবং চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নামী-দামী প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করছে।
- ইলেকট্রনিক্স ও গ্যাজেট: ওয়ালটন, স্যামসাং থেকে শুরু করে নতুন সব ব্র্যান্ডের আধুনিক ফ্রিজ, টিভি ও ল্যাপটপে থাকছে বিশাল মূল্যছাড়।
- ফার্নিচার জোন: শৈল্পিক কারুকার্যখচিত কাঠের আসবাবপত্র এবং অফিস ফার্নিচারের বিশাল সংগ্রহ নিয়ে সেজেছে প্যাভিলিয়নগুলো।
- তৈরি পোশাক ও চামড়াজাত পণ্য: এক্সপোর্ট কোয়ালিটির জ্যাকেট, সুয়েটার এবং বিশ্বমানের চামড়াজাত জুতা ও ব্যাগের বিপুল সমাহার ক্রেতাদের নজর কাড়ছে।
- গৃহস্থালি ও প্রসাধনী: গৃহিণীদের জন্য প্রয়োজনীয় তৈজসপত্র থেকে শুরু করে নামী ব্র্যান্ডের কসমেটিকস—সবই মিলছে এক ছাদের নিচে।
আগামীর প্রত্যাশা
করোনা মহামারির ধকল কাটিয়ে গত কয়েক বছরে বাণিজ্য মেলা নতুন রূপ পেয়েছে। পূর্বাচলের মনোরম পরিবেশে সাজানো স্টলগুলো এবং শিশুদের জন্য তৈরি বিশেষ ‘কিডস জোন’ মেলাটিকে একটি পরিপূর্ণ পারিবারিক আউটিং স্পটে পরিণত করেছে। আয়োজকদের প্রত্যাশা, এবার গত বছরের তুলনায় দর্শনার্থী ও বেচাকেনার পরিমাণ রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে।