ইসলামের ইতিহাসে মেরাজ শরিফ এক বিস্ময়কর ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। এটি মহান আল্লাহর অসীম ক্ষমতা এবং প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অতুলনীয় মর্যাদার এক অনন্য প্রকাশ। ‘মেরাজ’ শব্দের অর্থ ঊর্ধ্বগমন- আর এই ঊর্ধ্বগমন ছিল মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ অলৌকিক সফর।
মহান আল্লাহর বিশেষ আমন্ত্রণে নবীজি (সা.) সশরীরে, পূর্ণ সচেতন ও জাগ্রত অবস্থায় জিবরাইল (আ.)-এর সঙ্গে বোরাক নামক বিশেষ বাহনে প্রথমে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় গমন করেন। সেখান থেকে একে একে সপ্তম আসমান অতিক্রম করে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত পৌঁছান। অতঃপর তিনি একাকী আরশে আজিমে উপস্থিত হয়ে মহান আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করেন এবং জান্নাত ও জাহান্নামের বাস্তব দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন। শরিয়তের পরিভাষায় এই সম্পূর্ণ ঘটনাকেই বলা হয় মেরাজ।
এই মহিমান্বিত সফর সংঘটিত হয়েছিল এমন এক সময়, যখন নবীজি (সা.) তাঁর জীবনের সবচেয়ে কষ্টকর অধ্যায় পার করছিলেন। প্রিয় সহধর্মিণী হজরত খাদিজা (রা.) ও আশ্রয়দাতা চাচা আবু তালিবের ইন্তেকালে তিনি পারিবারিক ও সামাজিকভাবে গভীর আঘাত পান। তায়েফে দ্বিনের দাওয়াত দিতে গিয়ে তাঁকে সহ্য করতে হয় নির্মম নির্যাতন। ইতিহাসে এই সময়কাল ‘আমুল হুজন’ বা শোকের বছর নামে পরিচিত। ঠিক এই দুঃসহ মুহূর্তেই মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসুলকে সম্মানিত করেন মেরাজের মাধ্যমে- যা ছিল কষ্টের পর আশার এক উজ্জ্বল বার্তা।
মেরাজ কোন তারিখে সংঘটিত হয়েছিল- এ বিষয়ে নির্দিষ্ট ও সর্বসম্মত তথ্য নেই। রজব মাসের কথা অনেক ঐতিহাসিক উল্লেখ করলেও নির্ভরযোগ্য সূত্রে নির্দিষ্ট দিন-তারিখ সংরক্ষিত হয়নি। কারণ সাহাবায়ে কেরাম মূলত সেই বিষয়গুলোই সংরক্ষণ করতেন, যেগুলোর সঙ্গে সরাসরি কোনো ফরজ বা সুন্নত আমল জড়িত। যেহেতু মেরাজের নির্দিষ্ট তারিখকে কেন্দ্র করে কোনো বিশেষ আমল নির্ধারিত হয়নি, তাই তা সংরক্ষণ তাদের কাছে অগ্রাধিকার পায়নি।
এই অলৌকিক সফরে নবীজি (সা.) বহু বিস্ময়কর দৃশ্য অবলোকন করেন। তিনি জিবরাইল (আ.)-কে তাঁর প্রকৃত রূপে ৬০০ ডানা বিশিষ্ট অবস্থায় দেখেন, যার প্রতিটি ডানা দিগন্তজুড়ে বিস্তৃত। আসমানসমূহে তিনি বিভিন্ন নবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন- প্রথম আসমানে আদম (আ.), দ্বিতীয়তে ঈসা (আ.), তৃতীয়তে ইউসুফ (আ.), চতুর্থতে ইদ্রিস (আ.), পঞ্চমে হারুন (আ.), ষষ্ঠে মুসা (আ.) এবং সপ্তম আসমানে ইব্রাহিম (আ.)।
মেরাজের রাতে জান্নাত ও জাহান্নামের দৃশ্য নবীজির হৃদয়কে গভীরভাবে আলোড়িত করে। তিনি জাহান্নামে গিবতকারীদের ভয়াবহ পরিণতি, আমলবিহীন বক্তাদের শাস্তি এবং সুদখোরদের যন্ত্রণাদায়ক অবস্থার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন। এসব দেখে উম্মতের প্রতি গভীর মমতায় তিনি বলেন- মানুষ যদি এসব বাস্তব দৃশ্য দেখতে পেত, তবে দুনিয়ার ভোগবিলাস ভুলে আল্লাহর সামনে অশ্রুসিক্ত হতো।
এই ঐতিহাসিক সফরের সবচেয়ে বড় উপহার ছিল পাঁচ ওয়াক্ত সালাত। শুরুতে ৫০ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হলেও উম্মতের দুর্বলতার কথা বিবেচনায় এনে তা পাঁচ ওয়াক্তে সীমিত করা হয়- কিন্তু সওয়াব রাখা হয় ৫০ ওয়াক্তের সমান। লক্ষণীয় বিষয় হলো, নামাজের বিধান অন্য কোনো ইবাদতের মতো দুনিয়াতে অবতীর্ণ হয়নি; বরং নবীজি (সা.)-কে সরাসরি আসমানে ডেকে নিয়ে তা দান করা হয়েছে। এতে ইসলামে নামাজের মর্যাদা ও গুরুত্ব স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
ইমানদারের জীবনে নামাজ কোনো অবস্থাতেই উপেক্ষণীয় নয়। যুদ্ধক্ষেত্র, সফর, অসুস্থতা- সব পরিস্থিতিতেই নামাজ আদায়ের নির্দেশ রয়েছে। কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব নেওয়া হবে- এই সতর্কবার্তাও হাদিসে স্পষ্টভাবে এসেছে।
মেরাজ আমাদের শেখায়- অটল বিশ্বাস, ধৈর্য ও আল্লাহর সঙ্গে গভীর সম্পর্কই মুমিন জীবনের মূল শক্তি। ইসলামের প্রতিটি বিধানের প্রতি এই দৃঢ় আস্থাই হোক আমাদের জীবনে মেরাজের প্রকৃত শিক্ষা।





