একসময় ঢাকাই মসলিনের খ্যাতি ছিল সমগ্র বিশ্বে। ফুটি কার্পাস তুলা থেকে সুতা বানিয়ে বয়ন করা হতো অতিসূক্ষ্ম কাপড়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী মসলিন শিল্প বিলুপ্ত হয়ে যায়। দীর্ঘদিনের বিরতির পরে, বাংলাদেশের কারিগররা এক চমকপ্রদ উদ্যোগে পুনরায় মসলিন শিল্পকে পুনর্জীবিত করেছেন। এবার পদ্মফুলের ডাঁটা থেকে তৈরি করা হলো পদ্মরেশম বা লোটাস সিল্ক, যা আন্তর্জাতিক বাজারেও নিজেদের পরিচিতি ছড়াতে শুরু করেছে।
পদ্মরেশমের উৎপাদন ও অনন্য বৈশিষ্ট্য
পদ্মরেশম সুতার রং হালকা দুধে–হলুদ। গোলাপি পদ্মের ডাঁটায় থাকা আঠাসদৃশ পদার্থ থেকে সুতা তৈরি করা হয়। এই সুতা সাধারণ সিল্কের তুলনায় অনেক বেশি টেকসই, পরিবেশবান্ধব এবং ব্যবহারযোগ্য।
পদ্মরেশমের বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
- প্রাকৃতিক উজ্জ্বলতা ও কোমলতা
- শতভাগ পানিরোধী
- বায়ু চলাচল সহজ
- কোঁচকায় না
- অন্যান্য সিল্কের তুলনায় পরিবেশবান্ধব ও কেমিক্যাল-মুক্ত
এক কেজি পদ্মরেশম সুতার আন্তর্জাতিক বাজার মূল্য ২,০০০–৩,৫০০ ডলার, এবং প্রতি গজ কাপড়ের দাম ২৫–১,০০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছায়।
উৎপাদন প্রক্রিয়া: প্রাকৃতিক ও পরিবেশবান্ধব
ছবি: সংগৃহীত
পদ্মরেশম তৈরির প্রক্রিয়া অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও শ্রমসাধ্য। সাধারণ পদ্মফুলের ১৫,০০০–৩০,০০০ ডাঁটা ব্যবহার করে এক কেজি সুতা তৈরি করা হয়।
উৎপাদন ধাপসমূহ:
- ডাঁটা সংগ্রহ: সরকারি ও ব্যক্তিগত মালিকানাধীন পদ্মবিল থেকে ডাঁটা সংগ্রহ করা হয়।
- আঠা নির্গমন: ডাঁটার কূপ থেকে আঠাসদৃশ পদার্থ সংগ্রহ করা হয়।
- সুতা তৈরি: আঠা পাকিয়ে সূক্ষ্ম সুতা বানানো হয়।
- বোনা ও রং করা: জামদানি বয়নকৌশল অবলম্বনে কাপড় বোনা হয়, প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম রং প্রয়োগ করা যায়।
ফরিদপুরের নারীরা মাত্র তিন দিনের প্রশিক্ষণে চমৎকার সুতা কেটে ফেলেছেন। এই প্রক্রিয়ায় পানি বা জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার না হওয়ায় এটি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই।
পদ্মরেশমের বৈশ্বিক পরিচিতি ও ব্যবহার
পদ্মরেশমের উৎপাদন বাংলাদেশের নতুন হলেও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো যেমন মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া তে এর দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। পদ্মরেশম কাপড়ের গুণাগুণ ও বিলাসবহুল বৈশিষ্ট্য আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা সৃষ্টি করেছে।
পদ্মফুলের বিভিন্ন অংশের ব্যবহার:
- পাপড়ি থেকে সুগন্ধি ও ভেষজ চা তৈরি
- ডাঁটা ও কচিপাতা রান্নার জন্য ব্যবহারযোগ্য
- কন্দ থেকে কার্বোহাইড্রেট পাওয়া যায়
বাংলাদেশে প্রায় ৩৫–৪০টি পদ্মবিল রয়েছে, যেখানে সারা বছর পানি থাকে। ফলে বছরে পাঁচবার পর্যন্ত পদ্মফুল সংগ্রহ করা সম্ভব, যা গ্রামীণ নারীদের নতুন আয়ের উৎস হতে পারে।
গবেষণা ও উদ্যোগ: বাংলাদেশের পদ্মরেশমের ভবিষ্যৎ
স্কার্ফটি তৈরি হয়েছে ‘পদ্মফুলের বৈচিত্র্য, ব্যবহার উপযোগিতা ও সংরক্ষণ’ প্রকল্পের অধীনে। গবেষণায় অংশ নিয়েছেন বিপিআরডি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, তাঁত বোর্ড এবং বাংলাদেশ ইউনেসকো জাতীয় কমিশন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যথাযথ পরিকল্পনা ও প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমে বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে সুতা উৎপাদন ও লোটাস সিল্কের শিল্প প্রসার সম্ভব, যা দেশের বস্ত্রবয়নশিল্পকে নতুন দিগন্তে পৌঁছে দিতে পারে।
পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কাপড়
পদ্মরেশমের সুতা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদান থেকে তৈরি, যা কেমিক্যাল-মুক্ত এবং পরিবেশ বান্ধব। এই কাপড় টেকসই হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারেও এর চাহিদা বেড়েছে। এছাড়া, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কোনও প্রাণীর ক্ষতি হয় না।
বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা
বাংলাদেশে পদ্মরেশম উৎপাদনের সুবিধা:
- কম খরচে উৎপাদন সম্ভব
- গ্রামীণ নারীদের জন্য আয়ের নতুন উৎস
- বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করা সহজ
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পদ্মরেশমের সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক লোটাস সিল্ক মার্কেটে নেতৃত্ব দিতে পারে।