প্যানিক অ্যাটাক কী?
প্যানিক অ্যাটাক হলো হঠাৎ করে তীব্র ভয় বা উদ্বেগের অনুভূতি যা কয়েক মিনিট স্থায়ী হতে পারে। এটি কোনো বাস্তব বিপদ ছাড়াই ঘটতে পারে এবং মানুষকে আতঙ্কিত করে তোলে। এই অবস্থায় হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, ঘাম হয়, শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় এবং মনে হতে পারে যেন মৃত্যুর কাছাকাছি চলে গেছে। প্যানিক অ্যাটাক সাধারণত ১০ মিনিটের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় এবং তারপর ধীরে ধীরে কমে আসে। এটি প্যানিক ডিসঅর্ডারের একটি লক্ষণ হতে পারে বা আলাদাভাবেও ঘটতে পারে। বিশ্বব্যাপী প্রায় ২-৩% মানুষ প্যানিক অ্যাটাকের সম্মুখীন হয়, এবং নারীদের মধ্যে এর হার পুরুষদের তুলনায় বেশি।
প্যানিক অ্যাটাকের লক্ষণসমূহ
প্যানিক অ্যাটাকের লক্ষণগুলো হঠাৎ করে প্রকাশ পায় এবং খুব দ্রুত তীব্র হয়ে ওঠে। প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে তীব্র হৃদস্পন্দন, বুক ধড়ফড় করা, ঘাম হওয়া, কাঁপুনি বা কম্পন, শ্বাসকষ্ট বা শ্বাস ফেলার অসুবিধা, গলা শুকিয়ে যাওয়ার অনুভূতি, বুকে ব্যথা বা অস্বস্তি, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা, হালকা বা ভাসমান অনুভূতি, ডিপারসোনালাইজেশন (নিজেকে অপরিচিত মনে হওয়া), ডিরিয়েলাইজেশন (পরিবেশকে অবাস্তব মনে হওয়া), নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলার ভয়, মৃত্যুর ভয়, ঠান্ডা বা গরম লাগা, এবং অস্বাভাবিক সংবেদনশীলতা। এই লক্ষণগুলো এতটাই তীব্র হতে পারে যে মানুষ মনে করে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক হচ্ছে।
প্যানিক অ্যাটাকের কারণসমূহ
প্যানিক অ্যাটাকের একক কোনো কারণ নেই; এটি বিভিন্ন কারণের সমন্বয়ে হতে পারে। জেনেটিক প্রবণতা একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ, যদি পরিবারের কেউ প্যানিক ডিসঅর্ডারে ভুগছেন তবে অন্য সদস্যদের ঝুঁকি বেশি থাকে। মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতা, বিশেষ করে সেরোটোনিন ও নরএপাইনেফ্রিনের অস্বাভাবিকতা প্যানিক অ্যাটাকের সাথে যুক্ত। মানসিক চাপ, ট্রমা বা অতীতের কোনো ভয়ানক ঘটনাও প্যানিক অ্যাটাকের কারণ হতে পারে। নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতি যেমন ভিড়, উচ্চস্থান, বদ্ধ জায়গা বা পাবলিক স্পিকিং কিছু মানুষের জন্য ট্রিগার হিসেবে কাজ করে। অতিরিক্ত ক্যাফেইন বা অ্যালকোহল সেবন, নিদ্রাহীনতা এবং কিছু শারীরিক রোগও প্যানিক অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়।
প্যানিক অ্যাটাক এবং উদ্বেগের পার্থক্য
প্যানিক অ্যাটাক এবং উদ্বেগ দুটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা যদিও এদের মধ্যে কিছু মিল রয়েছে। উদ্বেগ সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট হুমকি বা চাপের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ধীরে ধীরে তৈরি হয়, যেখানে প্যানিক অ্যাটাক হঠাৎ করে এবং কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই ঘটতে পারে। উদ্বেগের ক্ষেত্রে মানুষ সাধারণত বুঝতে পারে কী নিয়ে চিন্তিত, কিন্তু প্যানিক অ্যাটাকের সময় ভয় এতটাই তীব্র হয় যে ব্যক্তি বুঝতেও পারে না কী হচ্ছে। উদ্বেগ দীর্ঘকালীন হতে পারে, কিন্তু প্যানিক অ্যাটাক সাধারণত কয়েক মিনিট স্থায়ী হয়। উদ্বেগের লক্ষণগুলো তুলনামূলকভাবে কম তীব্র হয়, যেমন চিন্তা, অস্থিরতা, পেশী টান, ইত্যাদি, যেখানে প্যানিক অ্যাটাকের লক্ষণগুলো খুবই তীব্র হয় এবং শারীরিক উপসর্গ বেশি প্রকাশ পায়।
প্যানিক অ্যাটাকের সময় করণীয়
প্যানিক অ্যাটাকের সময় শান্ত থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমেই মনে রাখতে হবে যে এটি ক্ষতিকর নয় এবং এটি অবশ্যই কেটে যাবে। গভীর শ্বাস নিতে হবে: নাক দিয়ে ৪ সেকেন্ড শ্বাস নিন, ৪ সেকেন্ড ধরে রাখুন, এবং মুখ দিয়ে ৬ সেকেন্ডে শ্বাস ছাড়ুন। এই প্রক্রিয়া কয়েকবার পুনরাবৃত্তি করুন। বর্তমান মুহূর্তে মনোযোগ দিন: আপনার চারপাশের ৫টি জিনিস দেখুন, ৪টি জিনিস স্পর্শ করুন, ৩টি শব্দ শুনুন, ২টি গন্ধ নিন এবং ১টি জিনিসের স্বাদ অনুভব করুন। নিজেকে বলুন যে এটি কেবল একটি প্যানিক অ্যাটাক এবং এটি শীঘ্রই শেষ হবে। ঠান্ডা পানি পান করুন বা মুখে পানি ঢালুন। যদি সম্ভব হয়, হালকা হাঁটুন বা কিছু শারীরিক কাজ করুন যা আপনার মনোযোগ অন্যদিকে নিয়ে যায়। ক্যাফেইন বা অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে চিকিৎসকের সাহায্য নিন।
প্যানিক অ্যাটাকের চিকিৎসা
প্যানিক অ্যাটাকের চিকিৎসা দুটি প্রধান পদ্ধতিতে করা হয়: মনোচিকিৎসা এবং ওষুধ। কগনিটিভ বিহেভিয়রাল থেরাপি (সিবিটি) প্যানিক অ্যাটাকের জন্য সবচেয়ে কার্যকর মনোচিকিৎসা হিসেবে পরিচিত। সিবিটিতে রোগীকে শেখানো হয় কীভাবে নেতিবাচক চিন্তাভাবনা পরিবর্তন করতে হয় এবং কীভাবে প্যানিক আক্রমণের সময় শান্ত থাকতে হয়। এক্সপোজার থেরাপিতে রোগীকে ধীরে ধীরে ভয়ের কারণগুলোর মুখোমুখি করা হয় যাতে তিনি সেগুলোকে মোকাবিলা করতে শেখেন। ওষুধের মধ্যে সিলেক্টিভ সেরোটোনিন রিআপটেক ইনহিবিটর (এসএসআরআই), সেরোটোনিন-নরএপাইনেফ্রিন রিআপটেক ইনহিবিটর (এসএনআরআই) এবং বেনজোডিয়াজেপাইন ব্যবহার করা হয়। ওষুধ সাধারণত মনোচিকিৎসার সাথে একসাথে দেওয়া হয় সেরা ফলাফলের জন্য। চিকিৎসা শুরু করার আগে একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করা অত্যন্ত জরুরি।
প্যানিক অ্যাটাক প্রতিরোধের উপায়
প্যানিক অ্যাটাক প্রতিরোধের জন্য কিছু জীবনধারা পরিবর্তন কার্যকর হতে পারে। নিয়মিত ব্যায়াম করুন, কারণ এটি মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে এবং মেজাজ উন্নত করে। পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমানোর চেষ্টা করুন, কারণ ঘুমের অভাব প্যানিক অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়। ক্যাফেইন, নিকোটিন ও অ্যালকোহল সেবন সীমিত করুন বা এড়িয়ে চলুন, কারণ এগুলো উদ্বেগ ও প্যানিক অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ধ্যান, যোগব্যায়াম বা প্রাণায়ামের মতো শিথিলকরণ কৌশল অনুশীলন করুন, যা মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন এবং নিয়মিত খাবার খান, কারণ অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস রক্তে শর্করার মাত্রা অস্থিতিশীল করতে পারে যা প্যানিক অ্যাটাকের কারণ হতে পারে। সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখুন এবং আপনার অনুভূতিগুলো বন্ধুবান্ধব বা পরিবারের সাথে শেয়ার করুন। প্রয়োজনে পেশাদার সাহায্য নিন এবং নিয়মিত চিকিৎসা ফলোআপ করুন।
প্যানিক অ্যাটাক এবং জীবনধারা
প্যানিক অ্যাটাক একজন ব্যক্তির জীবনধারাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। এটি দৈনন্দিন কাজকর্মে বাধা সৃষ্টি করতে পারে এবং সামাজিক সম্পর্কের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অনেকেই প্যানিক অ্যাটাকের ভয়ে নির্দিষ্ট স্থান বা পরিস্থিতি এড়িয়ে চলতে শুরু করেন, যা ধীরে ধীরে অ্যাগোরাফোবিয়া বা উন্মুক্ত স্থানের ভয়ের দিকে নিয়ে যেতে পারে। কেউ কেউ এতটাই ভয় পান যে ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দেন, যা তাদের কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত জীবনে গুরুতর সমস্যা তৈরি করে। প্যানিক অ্যাটাকের কারণে অনেকে ড্রাইভিং, শপিং বা জনসমাগমস্থলে যাওয়া এড়িয়ে চলেন। এটি আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয় এবং বিষণ্নতার কারণ হতে পারে। তবে সঠিক চিকিৎসা ও সহায়তা পেলে প্যানিক অ্যাটাকে আক্রান্ত ব্যক্তিরাও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন এবং তাদের জীবনমান উন্নত করতে পারেন।
প্যানিক অ্যাটাক এবং শারীরিক স্বাস্থ্য
প্যানিক অ্যাটাক শুধু মানসিক সমস্যা নয়, এটি শারীরিক স্বাস্থ্যের উপরও ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। প্যানিক অ্যাটাকের সময় হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, রক্তচাপ বৃদ্ধি এবং শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গগুলো হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। দীর্ঘমেয়াদী প্যানিক ডিসঅর্ডার হৃদপিণ্ডের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে। প্যানিক অ্যাটাকের কারণে ঘুমের সমস্যা দেখা দিতে পারে, যা শারীরিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অনেকেই প্যানিক অ্যাটাকের সময় অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ করেন বা খাওয়া বন্ধ করে দেন, যা ওজন বৃদ্ধি বা হ্রাস এবং পুষ্টিহীনতার কারণ হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ প্রতিরোধব্যবস্থা দুর্বল করে দিতে পারে, ফলে বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এছাড়া, প্যানিক অ্যাটাকের কারণে পেশীতে টান, মাথাব্যথা এবং পাচনতন্ত্রের সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
প্যানিক অ্যাটাক এবং সম্পর্ক
প্যানিক অ্যাটাক একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্পর্কের উপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। অনেকেই প্যানিক অ্যাটাকের ভয়ে সামাজিক অনুষ্ঠান, পার্টি বা মিটিং এড়িয়ে চলেন, যা তাদের বন্ধুবান্ধব ও সহকর্মীদের থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। পরিবারের সদস্যরা প্যানিক অ্যাটাক সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকলে রোগীর অবস্থা ভুল বুঝতে পারেন এবং তাদের মধ্যে হতাশা বা বিরক্তি তৈরি হতে পারে। অনেক সময় প্যানিক অ্যাটাকে আক্রান্ত ব্যক্তি তাদের অবস্থা লুকিয়ে রাখেন, যার ফলে তাদের সঙ্গী বা পরিবারের সদস্যরা তাদের আচরণ বুঝতে পারেন না এবং সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়। প্যানিক অ্যাটাকের কারণে যৌন জীবনেও সমস্যা দেখা দিতে পারে, কারণ উদ্বেগ ও মানসিক চাপ যৌন ইচ্ছা কমিয়ে দিতে পারে। তবে, সঠিক যোগাযোগ, পারিবারিক সমর্থন এবং কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে এই সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
প্যানিক অ্যাটাক এবং কর্মজীবন
প্যানিক অ্যাটাক একজন ব্যক্তির কর্মজীবনের উপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। অনেকেই প্যানিক অ্যাটাকের ভয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং, উপস্থাপনা বা জনসমক্ষে কথা বলা এড়িয়ে চলেন, যা তাদের কর্মক্ষমতা ও পদোন্নতির সুযোগের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কেউ কেউ প্যানিক অ্যাটাকের কারণে অফিসে নিয়মিত উপস্থিত থাকতে পারেন না, যা তাদের চাকরি হারানোর ঝুঁকি বাড়ায়। অনেক সময় প্যানিক অ্যাটাকে আক্রান্ত ব্যক্তিরা তাদের সমস্যা লুকিয়ে রাখেন, কারণ তারা ভয় পান যে তাদের সহকর্মী বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাদের দুর্বল ভাববেন। এই লুকিয়ে রাখার ফলে তারা প্রয়োজনীয় সহায়তা পান না এবং তাদের অবস্থা আরও খারাপ হয়। তবে, সঠিক চিকিৎসা নিলে এবং কর্মক্ষেত্রে সহায়ক পরিবেশ পেলে প্যানিক অ্যাটাকে আক্রান্ত ব্যক্তিরাও সফল কর্মজীবন গড়তে পারেন। অনেক কোম্পানি এখন মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি করছে এবং কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার জন্য সহায়তা প্রদান করছে।
প্যানিক অ্যাটাক এবং শিশু
শিশুরাও প্যানিক অ্যাটাকের সম্মুখীন হতে পারে, যদিও তাদের লক্ষণগুলো প্রাপ্তবয়স্কদের থেকে কিছুটা আলাদা হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে প্যানিক অ্যাটাকের লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে হঠাৎ করে কাঁদা, বুক ধড়ফড় করা, শ্বাসকষ্ট, পেটব্যথা, মাথাব্যথা, ঘাম হওয়া, কাঁপুনি, বাবা-মা বা অভিভাবকের কাছ থেকে দূরে যেতে না চাওয়া, স্কুলে যেতে অস্বীকৃতি জানানো, এবং ঘুমের সমস্যা। শিশুদের প্যানিক অ্যাটাকের কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে পারিবারিক সমস্যা, স্কুলের চাপ, বন্ধুত্বের সমস্যা, বুলিং, বা কোনো আঘাতজনিত ঘটনা। শিশুদের প্যানিক অ্যাটাক চিকিৎসা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অপরিচালিত প্যানিক অ্যাটাক তাদের বিকাশ, শিক্ষা ও সামাজিক দক্ষতার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শিশুদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্লে থেরাপি, ফ্যামিলি থেরাপি এবং কগনিটিভ বিহেভিয়রাল থেরাপি কার্যকর হতে পারে। বাবা-মা বা অভিভাবকদের সচেতন হওয়া উচিত এবং তাদের সন্তানের আচরণের পরিবর্তন লক্ষ্য করে প্রয়োজনে পেশাদার সাহায্য নেওয়া উচিত।
প্যানিক অ্যাটাক থেকে সেরে ওঠার গল্প
প্যানিক অ্যাটাক থেকে সেরে ওঠা সম্ভব, এবং অনেক মানুষ সঠিক চিকিৎসা ও সহায়তার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন। রহিম, একজন ৩২ বছর বয়সী ব্যাংক কর্মকর্তা, প্রথম প্যানিক অ্যাটাকের সম্মুখীন হন যখন তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং উপস্থাপন করছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন যে তিনি হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়েছেন এবং জরুরি বিভাগে ভর্তি হন। চিকিৎসক তাকে জানান যে এটি প্যানিক অ্যাটাক ছিল। প্রাথমিকভাবে তিনি ভয় পেয়েছিলেন এবং মিটিং এড়িয়ে চলতে শুরু করেন, যা তার কর্মজীবনের উপর প্রভাব ফেলে। পরে, তিনি একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেন এবং কগনিটিভ বিহেভিয়রাল থেরাপি শুরু করেন। তিনি ধ্যান এবং শ্বাসব্যায়াম অনুশীলন করা শুরু করেন এবং তার জীবনধারা পরিবর্তন করেন। ছয় মাসের মধ্যে, তিনি আবার আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন এবং সফলভাবে উপস্থাপনা দিতে শুরু করেন। তার গল্পটি প্রমাণ করে যে প্যানিক অ্যাটাক থেকে সেরে ওঠা সম্ভব এবং সঠিক চিকিৎসা ও সহায়তার মাধ্যমে কেউই এই সমস্যাকে তার জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে দেবেন না।
প্রশ্ন ও উত্তর
১. প্যানিক অ্যাটাক কী?
প্যানিক অ্যাটাক হলো হঠাৎ আতঙ্কের তীব্র অনুভূতি যা কোনো বাস্তব বিপদ ছাড়াই ঘটে। এটি একধরনের মানসিক প্রতিক্রিয়া যা শারীরিক উপসর্গগুলোর সাথে সম্পর্কিত।
২. প্যানিক অ্যাটাকের লক্ষণগুলো কী কী?
এর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে: হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি, ঘাম ঝরা, কাঁপুনি, শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, অস্বাভাবিক তাপমাত্রা অনুভব, বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি, নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়, এবং মৃত্যুর ভীতি।
৩. প্যানিক অ্যাটাকের কারণ কী?
নির্দিষ্ট কারণ সম্পূর্ণরূপে জানা না গেলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন জেনেটিক প্রবণতা, মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতা, এবং মানসিক চাপ এর জন্য দায়ী হতে পারে।
৪. কারা এই সমস্যার ঝুঁকিতে থাকেন?
ঝুঁকি সাধারণত কিশোর বয়স থেকে প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় বেশি থাকে। পারিবারিক ইতিহাস, নারী হওয়া, মানসিক অস্থিরতা, দুর্ঘটনা বা আঘাতের অভিজ্ঞতা, এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
৫. এটি সাধারণত কতক্ষণ স্থায়ী হয়?
এই অবস্থা সাধারণত ৫ থেকে ২০ মিনিট স্থায়ী হয়, তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি আরও দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে। সবচেয়ে তীব্র উপসর্গগুলো সাধারণত ১০ মিনিটের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
৬. এটি এবং অন্যান্য চিকিৎসাগত অবস্থার মধ্যে পার্থক্য কীভাবে বোঝা যায়?
এটি এবং অন্যান্য চিকিৎসাগত সমস্যার মধ্যে পার্থক্য করতে হলে লক্ষণগুলোর সময়কাল, প্রকৃতি, এবং ট্রিগার বিবেচনা করতে হবে। হৃদরোগ, থাইরয়েড সমস্যা, বা শ্বাসযন্ত্রের রোগের লক্ষণগুলো এর সাথে মিল থাকতে পারে, তাই সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
৭. প্যানিক অ্যাটাক এবং প্যানিক ডিসঅর্ডারের মধ্যে পার্থক্য কী?
প্যানিক অ্যাটাক হলো একটি নির্দিষ্ট ঘটনা, যেখানে প্যানিক ডিসঅর্ডার হলো একটি দীর্ঘস্থায়ী অবস্থা যেখানে ব্যক্তি পুনরায় এর আশঙ্কায় ভুগেন এবং এর ফলে তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা প্রভাবিত হয়।
৮. এটি কীভাবে নির্ণয় করা হয়?
নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক রোগীর লক্ষণগুলো, চিকিৎসাগত ইতিহাস, এবং শারীরিক পরীক্ষা করেন। অন্যান্য সম্ভাব্য চিকিৎসাগত সমস্যাগুলো বাতিল করার জন্য রক্ত পরীক্ষা, ইসিজি, বা অন্যান্য ডায়াগনস্টিক টেস্ট করা হতে পারে।
৯. এর জন্য কী ধরনের চিকিৎসা কার্যকর?
চিকিৎসার মধ্যে রয়েছে মনোচিকিৎসা (বিশেষ করে কগনিটিভ বিহেভিয়রাল থেরাপি), ওষুধ (যেমন অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট বা অ্যান্টিঅ্যাংজাইটি ওষুধ), শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যায়াম, এবং রিল্যাক্সেশন কৌশল। একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
১০. এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব কিনা?
সম্পূর্ণরূপে প্রতিরোধ করা সবসময় সম্ভব না হলেও, কিছু পদক্ষেপ নিলে ঝুঁকি কমানো যেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে: নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল পরিহার, মানসিক চাপ ব্যবস্থাপনা, এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন।
১১. কেউ যখন এর সম্মুখীন হয় তখন অন্যরা কীভাবে সাহায্য করতে পারে?
কেউ এর সম্মুখীন হলে, তাকে শান্ত করুন, নিরাপদ পরিবেশে নিয়ে যান, ধীরে ধীরে শ্বাস নিতে উৎসাহিত করুন, এবং তাকে বোঝান যে এই অবস্থা অস্থায়ী। তার সাথে কথা বলুন এবং তার মনোযোগ অন্যদিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করুন।
১২. এটি কি বিপজ্জনক?
নিজে থেকে এটি সাধারণত জীবননাশের ঝুঁকি তৈরি করে না, তবে এটি অত্যন্ত ভয়ঙ্কর অনুভূতি দেয়। তবে, যদি কেউ অ্যাটাকের সময় গাড়ি চালাচ্ছেন বা উচ্চ স্থানে থাকেন, তবে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকতে পারে। এছাড়া, দীর্ঘস্থায়ী অবস্থা মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
১৩. কোন ধরনের জীবনধারা পরিবর্তন এর ব্যবস্থাপনায় সাহায্য করতে পারে?
ব্যবস্থাপনায় সহায়ক জীবনধারা পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে: নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, সুষম খাদ্যাভ্যাস, ধ্যান বা যোগব্যায়াম, পরিস্থিতিগত চাপ কমানো, এবং সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা। এছাড়া, নিকোটিন, ক্যাফেইন এবং অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা উপকারী হতে পারে।