পিলখানা বিডিআর হত্যাকাণ্ডের ১৬ বছর পর অবশেষে সেই মর্মান্তিক ঘটনার আড়ালে লুকিয়ে থাকা বহু অজানা তথ্য উন্মোচিত হয়েছে স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে। ৩০ নভেম্বর ২০২৫ রোববার প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়া ৪০০ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে রাজনৈতিক নেতা, সাবেক সেনা কর্মকর্তা, গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য, প্রশাসন এবং গণমাধ্যম–সংশ্লিষ্ট অর্ধশতাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম।
নির্ভরযোগ্য সূত্র যুগান্তরকে জানায়, কমিশনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে-রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা এবং গোয়েন্দা ব্যর্থতা মিলেই পিলখানায় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের বিপর্যয়ের পথ তৈরি হয়েছিল। কারা এটি জানতেন অথচ ব্যবস্থা নেননি, কে ছিলেন নির্দেশদাতা এবং কেন সত্য দীর্ঘদিন চাপা ছিল-সবকিছুই বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে।
রাজনৈতিক অঙ্গনের একাধিক প্রভাবশালীর নাম
রাজনৈতিক অভিযুক্তদের তালিকার শীর্ষে রয়েছেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক এমপি ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস। এছাড়াও উল্লেখ করা হয়েছে-
শেখ ফজলুল করিম সেলিম, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মির্জা আজম, প্রয়াত মতিয়া চৌধুরী, আসাদুজ্জামান নূর, মেহের আফরোজ চুমকি, কামরুল ইসলামসহ আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার নাম।
তদন্ত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে-ফজলে নূর তাপস ছিলেন পুরো ঘটনার প্রধান সমন্বয়কারী। বিদ্রোহীদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করা, তথ্য আদান–প্রদান এবং পরিস্থিতি প্রভাবিত করার অভিযোগও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
জাহাঙ্গীর কবির নানক ও মির্জা আজমের বিরুদ্ধে আনা হয় ১৩ দফা অভিযোগ-যার মধ্যে সাদা পতাকা নিয়ে পিলখানায় প্রবেশ, বেরিয়ে এসে সত্য গোপন করা, লাশ গুমে সহায়তা ও প্রহসনমূলক অস্ত্র সমর্পণকে উৎসাহ দেওয়ার মতো অভিযোগ রয়েছে।
সাবেক সেনা কর্মকর্তারা তদন্তে আলোচিত
প্রতিবেদনে একাধিক সাবেক সেনা কর্মকর্তার নামও উঠে এসেছে-
সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ, সাবেক নৌবাহিনী প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল জহির উদ্দীন আহম্মেদ, সাবেক বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার মার্শাল এসএম জিয়াউর রহমানসহ আরও বহু কর্মকর্তা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে-বিদ্রোহ শুরুর পরপরই তৎকালীন ডিজি বিডিআর মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ উদ্ধার অভিযানের অনুমতি চাইলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এই বিলম্ব বিদ্রোহীদের আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে এবং ভেতরে প্রতিরোধের সুযোগ কমে গেছে।
তিনজন সাংবাদিকের নামও প্রতিবেদনে এসেছে বলে সূত্র জানিয়েছে-যদিও প্রক্রিয়ার স্বার্থে সেসব নাম এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
কীভাবে থেমে গেল সামরিক অভিযান?
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, স্বাধীন তদন্ত কমিশনের মতে-প্রাথমিক পর্যায়ে অভিযান পরিচালনায় দ্বিধা ও বিলম্ব একটি বড় ভূমিকা রেখেছিল। সেনা, র্যাব এবং অন্যান্য বাহিনী প্রস্তুত থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণে দোদুল্যমানতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছিল।
শেখ হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হয়েছে-তিনি র্যাবের প্রবেশে বাধা দেন এবং সেনা অভিযান চালানোর বিপক্ষে মত দেন।
গোয়েন্দা ব্যর্থতা: আরেকটি বড় প্রশ্ন
কমিশন বলছে, বিদ্রোহের আগে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর শক্ত কোনো সতর্কতা না থাকা একটি বড় ব্যর্থতা। বিদ্রোহের আগেই একাধিক বৈঠক, অসন্তোষ, অস্বাভাবিক গতিবিধি-সবই নজর এড়িয়ে যায়।
২০০৯ সালে গঠিত সেনা তদন্ত কমিটি এবং জাতীয় তদন্ত কমিটির কাজকেও প্রতিবেদনে “দায়হীন এবং অসম্পূর্ণ” বলা হয়েছে।
আরও নাম থাকতে পারে প্রতিবেদনে
স্বাধীন তদন্ত কমিশন–সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে-উল্লেখিত নাম ছাড়াও আরও অনেক নাম রয়েছে প্রতিবেদনে। জাতীয় স্বার্থে এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত কিছু তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
সরকারের প্রতিক্রিয়া
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.) বলেন-প্রতিবেদনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বড় আকারের। পুরো প্রতিবেদন পড়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ভারতের সম্পৃক্ততা বিষয়ে এখনই মন্তব্য উপযুক্ত হবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
পটভূমি
২০০৯ সালের ২৫–২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহে সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন। দীর্ঘদিন পুনঃতদন্তের দাবি থাকার পর অন্তর্বর্তী সরকার গত ২৪ ডিসেম্বর জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করে।
১৬ বছর পর সেই তদন্তের বিস্তৃত ছবি এখন সামনে এসেছে।
সুত্রঃ বাংলাএডিশন