রমযান কেবল একটি মাস নয়, এটি হলো আত্মিক জাগরণের সময়। এই মাসে মানুষের হৃদয় আলোর প্রতিফলনে ভরে ওঠে, মন শান্ত হয় এবং আত্মা আল্লাহর দিকে ঝুঁকে। কিন্তু রমযানের পূর্ণ বরকত উপভোগ করতে হলে রমযানের প্রস্তুতি অপরিহার্য।
১. রমযানের প্রস্তুতি: অন্তর থেকে শুরু
রমযানের আসল প্রস্তুতি শুরু হয় হৃদয় ও মন থেকে। অপরাধ ও অহংকারে ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে মাসে প্রবেশ করা মানে নোংরা পোশাক পরে রাজদরবারে যাওয়ার সমান।
রমযানের প্রস্তুতির জন্য অন্তরের প্রস্তুতি অন্তর্ভুক্ত করে:
- গোনাহের ক্ষমা চাওয়া এবং তওবা করা
- নেগেটিভ চিন্তা ও অহংকার থেকে মুক্তি পাওয়া
- নিয়্যত খাঁটি এবং দৃঢ় করা
নিয়্যত খাঁটি না হলে রমযান আসে যায়, কিন্তু অন্তরের কোনো পরিবর্তন হয় না। তাই এটি হলো রমযানের প্রস্তুতির প্রথম ধাপ।
২. শারীরিক প্রস্তুতি: শক্তি ও স্বাস্থ্য
শরীর সুস্থ না হলে দীর্ঘ ছিয়াম, তারাবীহ এবং কুরআনের তেলাওয়াত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই শা‘বানের সময় কিছু শারীরিক পরিবর্তন আনা জরুরি:
- খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করা
- অতিরিক্ত রাত জাগা কমানো
- ঘুমের সুষমা ঠিক করা
- প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া
এক সুস্থ শরীর নিশ্চিত করে যে রমযানের ইবাদত সহজ এবং ফলপ্রসূ হবে। এটি রমযানের প্রস্তুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
৩. কুরআনের সাথে পুনঃসংযোগ
রমযান হলো কুরআনের মাস। তাই রমযানের প্রস্তুতির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত:
- কুরআন তেলাওয়াত করা
- আয়াতের অর্থ বোঝার চেষ্টা করা
- তাফসীর অধ্যয়ন
- দৈনন্দিন জীবনে কুরআনের শিক্ষা প্রয়োগ
কুরআনের সাথে ঘনিষ্ঠতা রমযানের ইবাদতকে মধুর করে তোলে এবং আত্মাকে আল্লাহর দিকে নিক্ষেপ করে।
৪. সময় ব্যবস্থাপনা
রমযানে প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান। পরিকল্পনা ছাড়া সময় হারিয়ে যায়- খাবারে, ঘুমে বা অযথা আড্ডায়।
রমযানের প্রস্তুতির জন্য সময় ব্যবস্থাপনা অন্তর্ভুক্ত:
- প্রতিদিন কতটুকু কুরআন পড়ব
- কতটুকু দান করব
- কোন কাজ বাড়াবো, কোন কমাবো
- ইফতার ও সেহরির সময় সঠিকভাবে ব্যবহার করা
পরিকল্পনা করা হলে রমযানের প্রতিটি মুহূর্ত পূর্ণ বরকত নিয়ে আসে।
৫. পরিবার ও সামাজিক প্রস্তুতি
পরিবারের সহযোগিতা রমযানকে আরও সুন্দর ও ফলপ্রসূ করে তোলে। রমযানের প্রস্তুতির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত:
- ঘরে কুরআনের আসর বসানো
- একসাথে ইবাদত করা
- সরল ও স্বাস্থ্যসম্মত ইফতার করা
- দরিদ্র ও দুঃস্থদের মনে রাখা
এতে পরিবারের মধ্যে মিলন ও আল্লাহর পথে একতা তৈরি হয়।
৬. দান ও ছাদাক্বা
রমযান হলো দান ও সহানুভূতির মাস। দানের মাধ্যমে মন নরম হয়, আত্মা প্রশান্তি লাভ করে এবং আখেরাতে নূর হয়ে জ্বলে ওঠে।
রমযানের প্রস্তুতির একটি অংশ হলো:
- দরিদ্রদের পাশে দাঁড়ানো
- আত্মীয়দের সহায়তা করা
- গোপনে দান ও ছাদাক্বা প্রদান
৭. ছিয়াম ও তাকওয়া
ছিয়াম মানে শুধুই ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করা নয়। এটি হলো নিজেকে নিয়ন্ত্রণে আনা:
- চোখ ও কানের হেফাজত করা
- জিহ্বা ও হাত-পা নিয়ন্ত্রণ করা
- নফসকে দাসত্বের শৃঙ্খলে ফিরিয়ে আনা
এই নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মুমিনের ভেতরের গুণাবলি জাগে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জিত হয়।
৮. শেষ দশকের গুরুত্ব
রমযানের শেষ দশকে লায়লাতুল ক্বদরের সন্ধান এবং ই‘তিকাফের মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ। এই দশকের রাতগুলো হলো মাসের আসল রূহ গ্রহণের সেরা সময়।
৯. প্রার্থনা ও মনোভাব
রমযানের দরজায় দাঁড়িয়ে আমাদের অন্তর থেকে উচ্চারিত হোক প্রার্থনা:
“হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরকে পবিত্র করো, নিয়্যতকে সুস্থ করো, আমাদের আমল কবুল করো এবং এই রমযানকে আমাদের জীবনের সবচেয়ে বরকতময় রমযান বানাও।”
এই প্রার্থনা এবং পরিকল্পনার মাধ্যমে রমযান আসুক আমাদের জীবন পরিবর্তনের মাস হয়ে- আমীন।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর
রমজান কি ও কেন?
রমজান হলো ইসলামি বর্ষপঞ্জির নবম মাস। এটি মুসলমানদের জন্য সিয়াম সাধনার মাস। এর মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং আত্মিক শুদ্ধি লাভ করা।
রোজা রাখার উদ্দেশ্য কী?
কুরআনের ঘোষণা অনুযায়ী রোজার প্রধান উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জন করা। এটি মানুষকে ধৈর্য, সহমর্মিতা এবং আত্মসংযম শেখায়।
আরবিতে রমজান মোবারক কী?
আরবিতে ‘রমজান মোবারক’ (رمضان مبارক) মানে হলো “রমজান আপনার জন্য বরকতময় হোক”। এটি একটি প্রচলিত সম্ভাষণ।
রমজান শব্দের অর্থ কী?
‘রমজান’ শব্দটি আরবি ‘রামাদ’ (Ramad) থেকে এসেছে, যার অর্থ তীব্র উত্তাপ বা দহন। এটি মানুষের পাপকে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয় বলে একে রমজান বলা হয়।
রমজানের গুরুত্ব কি?
এই মাসেই পবিত্র কুরআন নাযিল হয়েছে। এ মাসে জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এটি ক্ষমা ও নাজাতের মাস।
রমজানের ইতিহাস?
দ্বিতীয় হিজরিতে মদিনায় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর রোজা ফরয হয়। এরপর থেকেই মুসলমানরা প্রতি বছর এই মাসটি পালন করে আসছেন।
রমজান মাস কেন পালন করা হয়?
আল্লাহর আদেশ পালন করতে, দরিদ্রদের কষ্ট অনুভব করতে এবং নিজের নফসকে পবিত্র করতে এই মাস পালন করা হয়।
মাহে রমজান শব্দের অর্থ কি?
‘মাহ’ একটি ফারসি শব্দ যার অর্থ মাস। ‘মাহে রমজান’ মানে হলো রমজান মাস। এটি অত্যন্ত পবিত্র এবং বরকতময় একটি সময়।





