রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের সংজ্ঞা ও পরিচয়
বৈদেশিক কর্মস্থল থেকে দেশে পাঠানো অর্থই মূলত রেমিট্যান্স বলে পরিচিত। বিশ্বজুড়ে কাজ করা মানুষের উপার্জন যখন নিজ দেশে আসে। এটি একটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। প্রবাসীরা কঠোর পরিশ্রম করে যে অর্থ উপার্জন করেন। সেই উপার্জন তারা পরিবারের জন্য বৈধ পথে প্রেরণ করে থাকেন। এই প্রেরণ প্রক্রিয়াটিকেই সাধারণত রেমিট্যান্স বা হুন্ডি বলা হয়। তবে আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এর ব্যবহার অনেক বেশি। এটি কোনো ঋণ নয় বরং বিনিময়ে কৃত কাজের ফল। একটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ বাড়ায়।
- বিদেশে বসবাসরত কর্মীদের আয়ের একটি অংশ দেশে পাঠানো।
- এটি সরকারি বা বেসরকারি ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
- বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান ও নির্ভরযোগ্য উৎস।
- এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জীবনরেখা হিসেবে কাজ করে।
- পারিবারিক ভোগব্যয় নির্বাহের জন্য এর গুরুত্ব অপরিসীম।
- রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে।
- এটি দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা পালন করে এবং জীবনযাত্রা উন্নয়ন করে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের গুরুত্ব
বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলো এই প্রবাসী আয়। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে এর ভূমিকা অপরিহার্য। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে প্রবেশ করে। যা জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে সরাসরি অবদান রাখে। রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি এটি প্রধান আয়ের খাত। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বজায় রাখতে এটি সহায়তা করে। সরকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে এই অর্থ ব্যবহার করতে পারে। এছাড়াও এটি দেশের ক্রয়ক্ষমতা বাড়িয়ে থাকে। লোকসানি খাত গুলোর ঘাটতি পূরণেও এর ভূমিকা আছে।
- স্থূল দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে রেমিট্যান্সের অবদান সর্বোচ্চ।
- আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য এটি প্রধান অর্থায়নের উৎস।
- দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করতে সাহায্য করে।
- অর্থনীতির গতিশীলতা ধরে রাখতে প্রবাসী আয় অপরিহার্য।
- দারিদ্র্যের হার কমাতে এই আর্থিক প্রবাহ কার্যকর ভূমিকা রাখে।
- জ্বালানি তেলের মতো পণ্য আমদানিতে ব্যবহৃত হয় এই অর্থ।
- বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করে তোলে।
রেমিট্যান্স প্রেরণের বৈধ পদ্ধতি ও চ্যানেল
প্রবাসীদের উপার্জন দেশে পাঠানোর অনেক নিরাপদ পথ রয়েছে। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে টাকা পাঠানো সবচেয়ে ভালো। ব্যাংকের মাধ্যমে ডলার সরাসরি হিসাবে জমা পড়ে। এতে প্রেরণকারী এবং গ্রহীতা উভয়েই নিরাপদ থাকে। বর্তমানে বেসরকারি বিনিময় হাউসও এই সেবা দিচ্ছে। তাদের নেটওয়ার্ক গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস রয়েছে। এই পদ্ধতিগুলো দ্রুত এবং নির্ভুল সেবা প্রদান করে।
- ব্যাংক ড্রাফট বা টেলিগ্রাফিক ট্রান্সফারের মাধ্যমে অর্থ প্রেরণ।
- এক্সচেঞ্জ হাউস বা বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠান।
- মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে সহজেই লেনদেন।
- অনলাইন ভিত্তিক পেমেন্ট গেটওয়ে ব্যবহার করে দ্রুত পেমেন্ট।
- বৈধ পথে টাকা পাঠালে সরকার তার সুযোগ সুবিধা দেয়।
- হুন্ডি বা অবৈধ পথের চেয়ে ব্যাংকিং চ্যানেল নিরাপদ।
- বৈধ প্রেরণ প্রমাণপত্র রাখা ভবিষ্যতের জন্য জরুরি।
ডিজিটাল রেমিট্যান্স: নতুন দিগন্ত
প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে পাল্লা দিয়ে ডিজিটাল লেনদেন বেড়েছে। এখন আর ঘন্টার পর ঘন্টা ব্যাংকের লাইনে দাঁড়াতে হয় না। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে কয়েক মুহূর্তেই টাকা পাঠানো সম্ভব। বিকাশ, নগদ বা রকেটের মতো সেবা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এতে খরচও তুলনামূলকভাবে কম হয়। গ্রামের দূরবর্তী এলাকায়ও এই সেবা পৌঁছে গেছে। প্রবাসীরা এখন স্মার্টফোন দিয়েই সব হিসাব দেখতে পান। ফলে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
- স্মার্টফোন অ্যাপের মাধ্যমে সহজ এবং দ্রুত লেনদেন।
- ব্যাংকের শাখায় না গিয়ে ঘরে বসেই অর্থ উত্তোলন।
- ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবহার করে নিরাপদ ভাবে টাকা সংরক্ষণ।
- লেনদেনের ফি বা খরচ কমে যাওয়ায় লাভবান হন গ্রাহক।
- ২৪ ঘণ্টা সেবা প্রাপ্তির সুযোগ থাকায় সুবিধাজনক।
- ডিজিটাল রেকর্ড বা ইতিহাস দেখা যায় সহজেই।
- সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সহায়ক।
রেমিট্যান্সে সরকারি প্রণোদনা ও পুরস্কার
প্রবাসীদের উৎসাহিত করতে সরকার নানা ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। বৈধ পথে টাকা পাঠালে দুই শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হয়। এই অর্থ সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়। এছাড়াও যারা বেশি আয় পাঠান তাদের সম্মাননা দেওয়া হয়। সরকারি এনআরবি কমার্সিয়াল ব্যাংক বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে। বিজিবি সেটেলমেন্টের মাধ্যমেও সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া যায়। বিমান বন্দরে প্রবাসীদের জন্য বিশেষ লাউঞ্জ রয়েছে। এই সুযোগ সুবিধাগুলো বৈধ চ্যানেল ব্যবহার বাড়ায়।
- প্রতি ডলারের বিপরীতে দুই টাকা হারে নগদ প্রণোদনা।
- বার্ষিক সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স প্রেরণকারীদের সম্মাননা প্রদান।
- প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণের সুযোগ।
- বিনিয়োগের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে।
- বিমানবন্দরে এক্সপ্রেস সার্ভিস এবং লাউঞ্জ ব্যবহারের সুবিধা।
- বৈদেশিক মুদ্রা কেনার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ভিত্তিক সেবা।
- হুন্ডি প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পুরস্কার।
হুন্ডির কুফল এবং অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব
হুন্ডি হলো অবৈধ পথে টাকা পাঠানোর একটি অশুভ প্রথা। এতে দেশের কোনো লাভ হয় না বরং ক্ষতি হয়। সরকার নির্ধারিত রেট না মেনে কম দরে টাকা দেওয়া হয়। ফলে প্রবাসী এবং দেশ উভয়েই মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এই টাকা দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হয় না। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ে না এবং মানি লন্ডারিং হয়। সন্ত্রাসী কার্যকলাপে অর্থায়নেরও অন্যতম মাধ্যম এটি। তাই হুন্ডি এড়িয়ে চলা সবার দায়িত্ব।
- জাতীয় অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি তৈরি করে।
- সরকার নির্ধারিত উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করে।
- অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে মানি লন্ডারিং বৃদ্ধি পায়।
- প্রবাসীদের কম দরে তাদের কষ্টের উপার্জনের মূল্য দেওয়া হয়।
- দেশের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্ষুণ্ণ হয়ে পড়ে।
- অপরাধমূলক কাজে এই অর্থ ব্যবহৃত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
- বৈধ ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
রেমিট্যান্স এবং গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন
প্রবাসী আয়ের সিংহভাগই গ্রামের দরিদ্র পরিবারে পৌঁছায়। এই অর্থ গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রার মান বদলে দিয়েছে। পাকা বাড়ি নির্মাণ, ক্রয় করা কৃষি জমি এবং শিক্ষা ব্যয় বহন করা হয়। ফলে গ্রামে নতুন নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে উঠেছে। কৃষি এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায় বিনিয়োগ বেড়েছে। গ্রামের বেকারত্ব কমে এসেছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নেও এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। গ্রামের ইটের রাস্তা এবং বিদ্যুৎ সংযোগের কাজ এগিয়েছে।
- গ্রামীণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় জীবনযাত্রা উন্নত হয়।
- কৃষি যন্ত্রপাতি কেনার মাধ্যমে আধুনিক কৃষি কাজে সহায়তা।
- গ্রামে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাওয়ায় দারিদ্র্য নিরসন সম্ভব হয়।
- স্বাস্থ্যসেবা এবং পুষ্টির মান উন্নয়নে বৈদেশিক আয়ের ভূমিকা।
- ছোট ছোট কুটির শিল্প গড়ে ওঠায় মহিলাদের ভূমিকা।
- গ্রামের আবাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং পরিকল্পিত উন্নয়ন।
- সামাজিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসা এবং অপরাধ প্রবণতা কমে যাওয়া।
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ভূমিকা ও সেবা
প্রবাসীদের কল্যাণের জন্যই এই বিশেষায়িত ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটি সরকারি মালিকানাধীন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। বিদেশ যাওয়ার আগে ঋণ প্রদান করা হয় এখান থেকে। ভিসা প্রসেসিং ফি এবং টিকেট কেনার জন্য আর্থিক সহায়তা দেয়। এছাড়াও দেশে ফিরে এসে পুনর্বাসনের ঋণ পাওয়া যায়। ব্যাংকটি রেমিট্যান্স প্রেরণে কম ফি নির্ধারণ করে। প্রবাসীদের বিনিয়োগের জন্য বিশেষ স্কিম রয়েছে এখানে। এটি প্রবাসীদের অধিকার আদায়েও সহায়তা করে থাকে।
- শ্রমিক অভিবাসনের জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করা।
- বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণে সর্বনিম্ন চার্জ বা ফি।
- দেশে ফিরে এসে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য বিশেষ ঋণ স্কিম।
- প্রবাসীদের সঞ্চয়ের অর্থ নিরাপদ রাখার নিশ্চয়তা বিধান।
- বিমান টিকিট কেনার ক্ষেত্রে রিয়েলাইজেশন ফ্যাসিলিটি।
- প্রবাসীদের পরিবারের সদস্যদের জন্য ডেপোজিট স্কিম।
- ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট এবং রেমিট্যান্স অ্যাক্ট অনুযায়ী কাজ করা।
বিশ্ববাজারে রেমিট্যান্স প্রবাহ ও বাংলাদেশের অবস্থান
বিশ্বব্যাপী রেমিট্যান্স প্রেরণকারী দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ অন্যতম। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে সবচেয়ে বেশি আয় আসে। সৌদি আরব, আমিরাত, কাতার এবং ওমান প্রধান উৎস। এছাড়াও ইউরোপ এবং আমেরিকায় বসবাসরত প্রবাসীরাও অনেক অর্থ পাঠান। সাম্প্রতিক সময়ে এশিয়ান দেশগুলোতেও কর্মসংস্থান বেড়েছে। যেমন মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুর। বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যানে বাংলাদেশ শীর্ষ দশে স্থান করে নিয়েছে। এই অবস্থান ধরে রাখতে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি জরুরি।
- বিশ্বের শীর্ষ রেমিট্যান্স গ্রহীতা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।
- মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা অর্থের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি।
- ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে আসা আয়ও উল্লেখযোগ্য।
- দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি বৃদ্ধি পেলে আয় বাড়বে।
- নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানে সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- বিশ্বজুড়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংখ্যা বৃদ্ধির ইতিবাচক ধারা।
- আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে বাংলাদেশের প্রভাব দিন দিন বাড়ছে।
রেমিট্যান্সের ওপর করোনা ভাইরাসের প্রভাব
মহামারী করোনাভাইরাস সারা বিশ্বের অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। লকডাউনের কারণে অনেকে চাকরি হারিয়েছিলেন। ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহে ভাটা পড়েছিল প্রাথমিক পর্যায়ে। তবে পরবর্তীতে প্রবাসীরা সংকট কাটিয়ে উঠেছেন। ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেন বেড়েছে অনেক বেশি। অনেকে নিজেদের সঞ্চয় দেশে পাঠাতে বাধ্য হয়েছেন। এতে দেশের রিজার্ভ অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়ে যায়। করোনাকালে প্রবাসীদের সহায়তায় সরকার বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিল। দেশে ফেরা এবং বিদেশে যাওয়ার ব্যবস্থাও সীমিত ছিল।
- লকডাউনের কারণে প্রাথমিকভাবে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যায়।
- বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠানোর হার বৃদ্ধি পায় বিপুলভাবে।
- অনেক প্রবাসী চাকরি হারালেও কিছু নতুন সুযোগ তৈরি হয়।
- বিমান যোগাযোগ বন্ধ থাকায় মানবিক ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়।
- প্রবাসীদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা এবং আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা।
- ডিজিটাল লেনদেনের ওপর মানুষের নির্ভরতা অনেক গুণ বেড়েছে।
- মহামারী পরবর্তী সময়ে আবারও শ্রমবাজার সচল হওয়া শুরু হয়েছে।
দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধি
অদক্ষ শ্রমিকের চেয়ে দক্ষ জনশক্তি বেশি আয় করতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে বেশিরভাগ শ্রমিক নিম্ন মানের কাজ করেন। তাই আয়ের পরিমাণ তুলনামূলক কম। যদি টেকনিশিয়ান এবং প্রফেশনাল রপ্তানি করা যায়। তবে রেমিট্যান্সের পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। সরকার এ লক্ষ্যে কারিগরি শিক্ষায় জোর দিচ্ছে। বিভিন্ন ট্রেডিং কোর্সের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করানো হচ্ছে। বিদেশের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে তরুণদের। এতে তারা ভালো বেতনের চাকরি পাবে।
- কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে দক্ষ শ্রমিক তৈরি।
- উচ্চ বেতনের চাকরির জন্য ভাষা শিক্ষার ওপর গুরুত্ব প্রদান।
- বিদেশের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী কোর্স তৈরি করা।
- সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে প্রশিক্ষণ।
- দক্ষ জনশক্তি রপ্তানিতে ব্রোকার বা দালালদের প্রতারণা রোধ।
- বেসরকারি খাতের সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা অর্জন।
- দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি বাড়লে দেশের ভাবমূর্তি উন্নত হয়।
নারী প্রবাসীদের অবদান ও রেমিট্যান্স
নারীরাও এখন বৈদেশিক কর্মস্থলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তারা শুধু গৃহকর্মী হিসেবে নয়। অনেকেই স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং প্রকৌশল খাতে কাজ করছেন। নারী প্রবাসীদের পাঠানো অর্থও পরিবারের ভাগ্য বদলাচ্ছে। তারা সন্তানদের শিক্ষার খরচ এবং পরিবারের চিকিৎসার ব্যয় বহন করেন। নারী উদ্যোক্তা হিসেবেও তারা এগিয়ে আসছেন। সরকার নারী শ্রমিকদের সুরক্ষায় বিশেষ আইন প্রণয়ন করেছে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে দূতাবাসগুলো কাজ করছে।
- গৃহকর্মী হিসেবে নারীদের উপার্জন পরিবারের ভরসা।
- স্বাস্থ্যখাতে কর্মরত নারী প্রবাসীদের আয় অত্যন্ত সম্মানজনক।
- নারীদের রেমিট্যান্স প্রেরণ দারিদ্র্য বিমোচনে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
- শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ায় মা এবং বোনদের পাঠানো অর্থের ভূমিকা।
- দক্ষ নারী জনশক্তি রপ্তানির জন্য প্রশিক্ষণ ও সুযোগ বৃদ্ধি।
- প্রবাসী নারীদের অধিকার রক্ষায় সরকারের বিশেষ পদক্ষেপ।
- নারী ক্ষমতায়নে প্রবাস আয় একটি বড় শক্তি হিসেবে কাজ করে।
রেমিট্যান্স থেকে বিনিয়োগের সুযোগ ও সম্ভাবনা
প্রবাসী আয় শুধু ভোগব্যয় নয় বরং বিনিয়োগেও আসতে পারে। অনেক প্রবাসী এখন দেশে শিল্প কারখানা করছেন। এতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। সরকার তাদের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা করেছে। বিডিয়িং এবং আইটি সেক্টরে বিনিয়োগ বাড়ছে। প্রবাসী বন্ড কেনার মাধ্যমে সরকারকে সাহায্য করা যায়। এছাড়াও শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে লাভবান হওয়া যায়। ব্যাংকগুলো প্রবাসীদের জন্য লোন সুবিধা দিচ্ছে। ফলে তারা সহজেই ব্যবসা শুরু করতে পারছেন।
- প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সুযোগ।
- শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে রিটার্ন বা লাভ অর্জন।
- বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটির সহায়তা।
- ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনীতি সচল।
- সঞ্চয়পত্র কেনা এবং ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট করা।
- আবাসন প্রকল্পে বিনিয়োগ করে মাসিক আয়ের পথ সুগম।
- প্রবাসীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা জাতীয় দায়িত্ব।
ব্যাংকিং খাতে রেমিট্যান্সের প্রভাব
রেমিট্যান্স ব্যাংকিং খাতের জন্য এক বিরাট তরল মূলধন। এই অর্থ ব্যাংকে জমা থাকায় ঋণ দেওয়া সহজ হয়। ব্যাংকগুলো এই অর্থ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করে। ফলে ব্যবসায়িক কার্যক্রম বৃদ্ধি পায়। প্রবাসী আয়ের ওপর ভিত্তি করে অনেক আর্থিক পণ্য তৈরি হয়েছে। যেমন প্রবাসী ডিপোজিট স্কিম এবং পেনশন স্কিম। ব্যাংকের লেনদেনের ভলিউম বা পরিমাণ বাড়ে। এতে ব্যাংকের লাভজনক অবস্থান আরও মজবুত হয়। সামষ্টিক অর্থনীতিতেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে।
- ব্যাংকের তরলতা বা লিকুইডিটি বজায় রাখতে সহায়তা করে।
- বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের মাধ্যমে ব্যাংকের আয় বৃদ্ধি।
- প্রবাসীদের জন্য বিশেষ সেবা এবং প্যাকেজ তৈরি করা হয়।
- ঋণ বিতরণের ক্ষমতা বাড়িয়ে অর্থনীতির গতি বৃদ্ধি।
- ব্যাংকের অনাকাঙ্ক্ষিত খেলাপি ঋণ কমাতে এটি ভূমিকা রাখে।
- আর্থিক খাতের উন্নয়নে এই আমানত অত্যন্ত জরুরি।
- ব্যাংকিং প্রযুক্তি আধুনিকায়নে রেমিট্যান্স সেবা অবদান রাখে।
রেমিট্যান্স এবং সামাজিক উন্নয়ন
প্রবাসী আয় শুধু অর্থনীতি নয়, সমাজকেও বদলে দেয়। এই অর্থে গ্রামে স্কুল, কলেজ এবং মাদ্রাসা নির্মাণ হয়। গরীব ছাত্ররা বৃত্তি পেয়ে পড়াশোনা করতে পারে। এছাড়াও এলাকায় হাসপাতাল এবং ক্লিনিক স্থাপিত হয়। সামাজিক কাজে প্রবাসীদের অংশগ্রহণ লক্ষ্যণীয়। তারা বিয়ের অনুষ্ঠান এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অর্থ দান করেন। ফলে সামাজিক উৎসবে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে। দারিদ্র্য কমে যাওয়ায় সামাজিক অপরাধও কমে আসে।
- শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও ছাত্রদের লেখাপড়ার খরচ বহন।
- গ্রামের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ক্লিনিক স্থাপনা।
- সামাজিক অসহায় মানুষদের আর্থিক সহায়তা প্রদান।
- ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণে প্রবাসীদের উদ্যোগ ও অনুদান।
- যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে রাস্তাঘাট নির্মাণে অবদান।
- সামাজিক অনুষ্ঠান এবং সংস্কৃতি চর্চায় আর্থিক সহযোগিতা।
- সমাজের উন্নতি এবং মানুষের মানসিক পরিবর্তনে ভূমিকা।
ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স প্রবাহের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
ভবিষ্যতে রেমিট্যান্সের সম্ভাবনা অনেক উজ্জ্বল। নতুন শ্রমবাজার অন্বেষণ করা হচ্ছে। আফ্রিকা এবং পূর্ব এশিয়ায় কাজের সুযোগ বাড়ছে। রোবোটিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কম দক্ষ শ্রমিকদের কাজ হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। তাই দক্ষতা বৃদ্ধি ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা আবারও আসতে পারে। তাই বিকল্প আয়ের উৎস খুঁজে বের করতে হবে। প্রবাসীদের অধিকার রক্ষায় কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে।
- নতুন শ্রমবাজার অন্বেষণ করে কর্মী পাঠানোর সুযোগ।
- প্রযুক্তিনির্ভর কাজে দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব প্রদান।
- চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুতি।
- বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবেলায় করণীয় নির্ধারণ।
- প্রবাসীদের নিরাপত্তা এবং কল্যাণ নিশ্চিতে কূটনৈতিক পদক্ষেপ।
- দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি বাড়িয়ে আয়ের ধারাবাহিকতা রক্ষা।
- আন্তর্জাতিক শ্রম আইন মেনে কাজের পরিবেশ উন্নয়ন।
রেমিট্যান্স ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে রেমিট্যান্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুধা নিরসন এবং শিক্ষার প্রসারে এটি সহায়ক। প্রবাসীরা দেশের উন্নয়নের অংশীদার। তাদের কষ্টের ফসলে দেশ আজ স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে। সবাইকে বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত করতে হবে। সরকারকে প্রবাসীদের সেবা নিশ্চিত করতে হবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে পারি। রেমিট্যান্স আমাদের অর্থনীতির শক্তি এবং ভবিষ্যতের আশার আলো।
- দারিদ্র্য দূরীকরণে এসডিজি লক্ষ্যে রেমিট্যান্সের ভূমিকা।
- জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বৈদেশিক আয়ের গুরুত্ব অপরিসীম।
- প্রবাসীদের অধিকার এবং সম্মান রক্ষা করা জাতীয় দায়িত্ব।
- বৈধ চ্যানেলে লেনদেন বৃদ্ধি করে দেশের স্বার্থ রক্ষা।
- টেকসই অর্থনীতি গড়তে প্রবাসী বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা।
- আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যয়।
- রেমিট্যান্সকে সম্মান জানিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
প্রশ্ন এবং উত্তর
১. রেমিট্যান্স বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: বৈদেশিক কর্মস্থল থেকে কোনো ব্যক্তি তার দেশে যে অর্থ পাঠান তাকে রেমিট্যান্স বলে। এটি মূলত বিনিময়ে কৃত কাজের ফলে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা।
২. বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের প্রভাব কী?
উত্তর: বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলো রেমিট্যান্স। এটি জিডিপিতে বড় অবদান রাখে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বজায় রাখতে সাহায্য করে।
৩. প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স পাঠানোর সেরা উপায় কী?
উত্তর: ব্যাংকিং চ্যানেল বা বৈধ এক্সচেঞ্জ হাউসের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানো সবচেয়ে নিরাপদ এবং সেরা উপায়। এতে সরকার দ্বারা নির্ধারিত সুযোগ সুবিধা পাওয়া যায়।
৪. হুন্ডি কী এবং কেন এটি ক্ষতিকর?
উত্তর: হুন্ডি হলো অবৈধ পথে অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়া। এটি ক্ষতিকর কারণ এতে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয় এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ে না।
৫. সরকার রেমিট্যান্স প্রেরণে কী ধরনের প্রণোদনা দিয়ে থাকে?
উত্তর: সরকার বৈধ পথে প্রতি ডলারের বিপরীতে দুই শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা দিয়ে থাকে। এছাড়াও বার্ষিক সেরা রেমিট্যান্স প্রেরণকারীদের সম্মাননা প্রদান করা হয়।
৬. ডিজিটাল রেমিট্যান্স ব্যবস্থার সুবিধা কী?
উত্তর: ডিজিটাল রেমিট্যান্স ব্যবস্থায় টাকা পাঠাতে সময় কম লাগে এবং খরচও কম। এটি স্বচ্ছ এবং দ্রুত লেনদেনের সুযোগ করে দেয়।
৭. প্রবাসীদের কল্যাণে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ভূমিকা কী?
উত্তর: প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক প্রবাসীদের ঋণ প্রদান, বিনিয়োগের সুযোগ এবং রেমিট্যান্স প্রেরণে কম ফি নিশ্চিত করে তাদের কল্যাণ সাধন করে।