সূরা লাহাব পরিচিতি | Sura Lahab
সূরার সংক্ষিপ্ত পরিচয়
সূরা লাহাব (আরবি: المسد বা اللهب), কুরআনের ১১১তম সূরা। পবিত্র কুরআনে সূরা ইখলাসের পূর্বে এই সূরার অবস্থান। এটি মক্কায় অবতীর্ণ একটি ছোট সূরা, যার আয়াত সংখ্যা ৫টি। এর মূল বিষয়বস্তু হলো আল্লাহর নবী মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর ঘোর বিরোধী ও চাচা আবু লাহাবের ধ্বংস এবং তাঁর স্ত্রীর শাস্তির ভবিষ্যদ্বাণী। এটি এমন একটি সূরা যা ব্যক্তির কুফরি, শত্রুতা ও জুলুমের অনিবার্য ধ্বংসাত্মক পরিণতির এক চরম উদাহরণ হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।
কেন এই সূরাকে “মাসাদ” বলা হয়
সূরাটির শেষ শব্দ হলো “মাসাদ” (مَسَد), যার অর্থ শক্ত পাকানো দড়ি বা রশি। এই শব্দটি দিয়ে মূলত আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামিলের কঠিন শাস্তির ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে- জাহান্নামে তার গলায় খেজুরের শক্ত পাকানো রশি পরানো হবে। এই গুরুত্বপূর্ণ শব্দের কারণেই সূরাটির একটি নাম সূরা আল-মাসাদ।
সূরার বৈশিষ্ট্য
- এটি ইসলামের ইতিহাসে প্রথম দিককার নাজিলকৃত সূরাগুলোর মধ্যে অন্যতম।
- এই সূরার মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা একজন জীবিত ব্যক্তির নাম ধরে তাঁকে ধ্বংস বা জাহান্নামে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন, যা কুরআনে অত্যন্ত বিরল।
- এটি নবী (সাঃ)-এর প্রতি পারিবারিক শত্রুতার তীব্রতা ও সেই শত্রুতার অনিবার্য ধ্বংসের প্রতীক।
- এটি আবু লাহাবের সম্পদ ও ক্ষমতার অহংকার যে আল্লাহর শাস্তির মোকাবিলায় সম্পূর্ণ অর্থহীন, তা স্পষ্ট করে।
সূরা লাহাব এর শানে নুযুল
আবু লাহাবের কুফরি ও বিরোধিতার গপ্ল
ইসলাম প্রচারের প্রাথমিক দিনগুলোতে, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবী মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে সাফা পর্বতে আরোহণ করে কুরাইশ গোত্রের সবাইকে একত্র করে প্রকাশ্য দাওয়াতের নির্দেশ দেন।
নবী (সাঃ) সবাইকে ডেকে যখন বললেন, “যদি আমি তোমাদের বলি, পর্বতের অপর প্রান্ত থেকে একদল শত্রু তোমাদের আক্রমণ করতে আসছে, তবে কি তোমরা বিশ্বাস করবে?” সবাই একবাক্যে বলল, “হ্যাঁ, অবশ্যই করব!” এরপর তিনি যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের কথা বললেন এবং ভবিষ্যৎ শাস্তির ভয় দেখালেন, তখন তাঁর আপন চাচা আবু লাহাব ইবনে আব্দুল মুত্তালিব অত্যন্ত ক্রোধের সাথে বলে ওঠেন: “তুব্বান লাকা! আ-লিহা-যা জামা’তানা?” অর্থাৎ, “তোমার ধ্বংস হোক! এই জন্যেই কি আমাদের একত্র করেছ?“
সূরা নাজিলের কারণ
আবু লাহাবের এই চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও ধৃষ্টতাপূর্ণ মন্তব্যের জবাবে তাৎক্ষণিকভাবে এই সূরাটি নাজিল হয়। এটি কেবল তার ধ্বংস কামনাই করেনি, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে তার ধ্বংস ও জাহান্নামী হওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী নিশ্চিত করে দেয়।
ইসলামের প্রথম দিকের কঠিন সময়
এই সূরার মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবীকে মানসিক সমর্থন এবং আশ্বাসের বার্তা দেন। এটি এমন এক সময়ে নাজিল হয় যখন নবী (সাঃ) ও প্রথম মুসলিমরা মক্কায় চরম শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে বয়কটের শিকার হচ্ছিলেন, বিশেষত আবু লাহাবের মতো নিকটাত্মীয়ের কাছ থেকে।
সূরা লাহাবের আরবি, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ
সূরা লাহাব আরবি
بِسْمِ ٱللَّهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ
تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ (١)
مَا أَغْنَى عَنْهُ مَالُهُ وَمَا كَسَبَ (٢)
سَيَصْلَى نَارًا ذَاتَ لَهَبٍ (٣)
وَامْرَأَتُهُ حَمَّالَةَ الْحَطَبِ (٤)
فِي جِيدِهَا حَبْلٌ مِنْ مَسَدٍ (٥)
সূরা লাহাব বাংলা উচ্চারণ | Sura Lahab Bangla Uccharon
১. তাব্বাত ইয়াদা আবি লা-হাবিউঁ ওয়া তাব্ব
২. মা- আগনা- ‘আনহু মা-লুহু ওয়া মা- কাসাব
৩. সাইয়াছলা- না-রান যা-তা লাহাব
৪. ওয়ামরাআতুহু হাম্মা-লাতাল হাতাব
৫. ফী জীদিহা- হাব্লুম মিম মাসাদ
সতর্কতা: বাংলা উচ্চারণ কেবল সহায়ক হিসেবে। তেলাওয়াত করার জন্য আরবি শেখা ও শুদ্ধভাবে উচ্চারণ করা আবশ্যক, না হলে অর্থের বিকৃতি ঘটতে পারে। ফলে গুনাহ হতে পারে।
সূরা লাহাব বাংলা অর্থ | Sura Lahab Bangla Meaning
প্রত্যেক আয়াতের সহজ ও পাঠযোগ্য অর্থ
১. ধংস হোক আবু লাহাবের দুই হাত এবং ধ্বংস হোক সে নিজেও।
২. তার সম্পদ এবং যা সে উপার্জন করেছে, তা তার কোনো কাজে আসবে না।
৩. অচিরেই সে দাউ দাউ করে জ্বলা আগুনে প্রবেশ করবে।
৪. এবং তার স্ত্রীও (জাহান্নামে যাবে), যে ইন্ধন বহন করত।
৫. তার গলায় শক্ত পাকানো রশি থাকবে।
সূরা লাহাবের তাফসীর | Sura Lahab Bangla Tafsir
আবু লাহাবের শাস্তি
“তাব্বাত ইয়াদা আবি লা-হাবিউঁ ওয়া তাব্ব” – এই আয়াতটি আবু লাহাবের জন্য ধ্বংসের অভিশাপ। এখানে “হাত” (ইয়াদ) শব্দটি দ্বারা তার ক্ষমতা, প্রচেষ্টা ও শক্তিকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, তার সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হোক এবং সে নিজেই ধ্বংস হোক। এই ধ্বংস কেবল ইহকালীন নয়, বরং পরকালের নিশ্চিত ধ্বংসও বটে।
সম্পদের অহংকারের পরিণতি
“মা- আগনা- ‘আনহু মা-লুহু ওয়া মা- কাসাব” – আবু লাহাব ছিল ধনী ও প্রভাবশালী। সে হয়তো তার সম্পদ ও প্রতিপত্তির কারণে নিজেকে নবী (সাঃ)-এর উপর শ্রেষ্ঠ মনে করত। আল্লাহ স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, তার ধন-সম্পদ এবং সন্তান-সন্ততি (যা সে উপার্জন করেছে) আল্লাহর শাস্তি থেকে তাকে এক বিন্দুও রক্ষা করতে পারবে না।
আবু লাহাবের স্ত্রীর ভূমিকা
“ওয়ামরাআতুহু হাম্মা-লাতাল হাতাব” – আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামিল বিনতে হারব, যিনি ছিল আবু সুফিয়ানের বোন, তিনিও ছিলেন কুফরিতে তাঁর স্বামীর সহযোগী।
- “হাম্মালাতাল হাতাব” (ইন্ধন বহনকারিণী) – এই উপাধিটি প্রতীকী অর্থে ব্যবহৃত। এর অর্থ হলো, সে নবী (সাঃ)-এর বিরুদ্ধে চোগলখোরি (গীবত ও মিথ্যা অপবাদ) করত, যা আগুন জ্বালানোর ইন্ধনের মতো কাজ করত।
- আবু লাহাবের ধ্বংসের আগুনে এই ইন্ধন তার নিজেরই শাস্তি বৃদ্ধি করবে।
আল্লাহর পক্ষ থেকে চিরন্তন সতর্কবাণী
“ফী জীদিহা- হাবলুম মিম মাসাদ” – জাহান্নামে উম্মে জামিলের শাস্তি হবে-তার গলায় শক্ত পাকানো খেজুরের রশি (মাসাদ) থাকবে, যা দিয়ে তাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে। এটি তার অপমানজনক ও কষ্টের শাস্তির ইঙ্গিত। এই সূরা কিয়ামত পর্যন্ত সত্যের শত্রুদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক চিরন্তন সতর্কবাণী।
সূরা লাহাব এর শিক্ষা | Sura Lahaber Sikkha
সূরা লাহাবের সরাসরি আমল-সম্পর্কিত ফজিলত কম হলেও, এর শিক্ষণীয় দিক ও আধ্যাত্মিক মূল্য অপরিসীম:
কুফরি ও জুলুমের পরিণতি বোঝা
এই সূরা মুসলিমদের শেখায় যে, কুফরি, শত্রুতা ও জুলুমের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, এমনকি যদি তা নবীর নিকটাত্মীয়ের পক্ষ থেকেও আসে।
সত্য ও মিথ্যার স্পষ্ট পার্থক্য
এটি ইসলামের সত্যতা প্রমাণ করে। আবু লাহাবের জীবদ্দশাতেই তার ধ্বংস নিশ্চিত করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে বাস্তবে পরিণত হয়। এটি সত্য ও মিথ্যার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য তৈরি করে।
ইমান দৃঢ় করার সহায়ক
নবী (সাঃ)-এর প্রতি পারিবারিক বাধার মুখেও আল্লাহর অটল সাহায্য ও সমর্থনের ঘোষণা এই সূরা। এটি পাঠ করলে মুমিনের ইমান দৃঢ় হয় এবং সে বুঝতে পারে যে, পৃথিবীর কোনো শক্তিই আল্লাহর ইচ্ছার ঊর্ধ্বে নয়।
সূরা লাহাব এর ব্যাখ্যা
এই সূরার ব্যাখ্যােয় মূল বার্তা হলো: আল্লাহর রাসূলের বিরোধিতা করা মানে আল্লাহর বিরোধিতা করা, এবং এর অনিবার্য ফল হলো ধ্বংস ও জাহান্নামের শাস্তি, তা সে যত প্রভাবশালীই হোক না কেন।
সূরা লাহাব থেকে আমরা আরও কি শিক্ষা পাই
অহংকারের পরিণতি
সম্পদ বা পদমর্যাদার কারণে অহংকার করা উচিত নয়। আল্লাহর ইচ্ছার বিরুদ্ধে অর্থ বা ক্ষমতা কোনোই কাজে আসে না।
সত্যের বিরোধিতা করলে কী হয়
সত্যের বিরোধিতা ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ। এটি ইহকাল ও পরকাল উভয় ক্ষেত্রেই ধ্বংস ডেকে আনে।
পরিবারের নেতিবাচক প্রভাব
ধর্মীয় বিষয়ে নিকটাত্মীয়ের কুফরি প্রভাব বা বিরোধিতা এড়িয়ে চলতে হবে। আবু লাহাব ও তাঁর স্ত্রীর পরিণতি প্রমাণ করে, পারিবারিক সম্পর্ক পাপের শাস্তি থেকে কাউকে মুক্তি দিতে পারে না।
আল্লাহর হুকুমের সামনে কেউ কিছু নয়
আল্লাহর সিদ্ধান্ত অমোঘ ও অপরিবর্তনীয়। তাঁর হুকুমের সামনে দুনিয়ার কোনো ক্ষমতা, সম্পদ বা প্রচেষ্টা টিকে থাকতে পারে না।
সূরা লাহাব সম্পর্কিত সাধারণ ভুল ও সংশোধনী
উচ্চারণে সাধারণ ভুল
| ভুল উচ্চারণ | সঠিক উচ্চারণ | সংশোধনী |
| তাব্বাত ইয়াদা আবি লাহাবয় ওয়াতাব্ব | তাব্বাত ইয়াদা আবি লাহাবিউঁ ওয়া তাব্ব | ‘লাহাব’ এর শেষে একটি মীম সাকিন (মিম-সুকুন) বা তানভিনের উচ্চারণ হয়। |
| মা আগনা আনহু মালুহু ওয়া মা কাসব | মা আগনা ‘আনহু মালুহু ওয়া মা কাসাব | ‘আইন (ع) অক্ষরটির সঠিক উচ্চারণ নিশ্চিত করা। |
| ফি জিদিহা হাবলুম মিন মাসাত | ফি জিদিহা হাবলুম মিম মাসাদ | দাল (د) অক্ষরটি স্পষ্ট করে উচ্চারণ করা। |
নিয়মিত পাঠ করার নিয়ম
সূরা লাহাব কুরআন মাজীদের শেষ অংশের (আমপারা) একটি সূরা। এটি সাধারণত নামাজের সময় বা ঘুমানোর আগে অন্যান্য ছোট সূরার সাথে নিয়মিত পাঠ করতে পারেন।
শিশু ও নতুনদের জন্য সূরা লাহাব শেখার টিপস
ধাপে ধাপে উচ্চারণ শেখানো
- প্রথমে এক-একটি শব্দ ধরে উচ্চারণ শেখান।
- শব্দগুলো একত্রিত করে একটি আয়াতে মনোযোগ দিন।
- তাজবীদ (উচ্চারণের নিয়ম) এর গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো (যেমন: গুন্নাহ, মীম সাকিনের নিয়ম) সহজভাবে বুঝিয়ে দিন।
অডিও–ভিডিওর সাহায্য
কুরআনের কারীদের সুন্দর তেলাওয়াত বা শিশুদের জন্য তৈরি ভিডিওর সাহায্য নিন, যাতে তারা শুনে শুনে সঠিক উচ্চারণ রপ্ত করতে পারে।
মুখস্থ করার কৌশল
- প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট আয়াত বা তার অংশ মুখস্থ করার লক্ষ্য নিন।
- মুখস্থ করার পর নামাজের মধ্যে বারবার পড়ে পাকা করে নিন।
- অর্থসহ মুখস্থ করার চেষ্টা করুন, এতে বিষয়বস্তু বুঝতে সুবিধা হবে।
সূরা লাহাব সম্পর্কে কিছু প্রশ্নোত্তর (FAQ)
১। সূরা লাহাব কেন নাজিল হয়েছিল?
উত্তর: নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) যখন প্রকাশ্যে আল্লাহর দাওয়াত দেওয়া শুরু করেন, তখন তাঁর চাচা আবু লাহাব অত্যন্ত বিদ্বেষ নিয়ে তাঁকে ধ্বংসের অভিশাপ দেন। এর জবাবে আল্লাহ তা‘আলা আবু লাহাবের ধ্বংসের ভবিষ্যদ্বাণী করে এই সূরাটি নাজিল করেন।
২। এটি মক্কায় নাকি মদিনায় নাজিল?
উত্তর: এটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছিল, ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ে।
৩। সূরা লাহাবের মোট কতটি আয়াত?
উত্তর: সূরা লাহাবের মোট ৫টি আয়াত।
৪। সূরাটির আরেক নাম কী?
উত্তর: সূরাটির আরেক নাম হলো সূরা আল-মাসাদ (المسد)।
৫। আবু লাহাব কে ছিলেন?
উত্তর: আবু লাহাব ছিলেন নবী মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর আপন চাচা এবং ইসলামের ঘোর বিরোধী ও শত্রু।
৬। সূরায় “মাসাদ” শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: “মাসাদ” (مَسَد) শব্দের অর্থ হলো শক্ত পাকানো দড়ি বা রশি। এটি দিয়ে জাহান্নামে আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামিলের শাস্তির প্রতীক বোঝানো হয়েছে।