মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণা দিয়েছেন। চুক্তি অনুযায়ী, ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ১৮ শতাংশে নেমেছে, যা আগে ২৫ শতাংশ ছিল। এই পরিবর্তনের ফলে ভারতের ‘মেইড ইন ইন্ডিয়া’ পণ্য বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে।
ওয়াশিংটন থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, ট্রাম্প সোমবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, রাশিয়ার তেল কেনার কারণে অতিরিক্ত আরোপিত ২৫ শতাংশ শুল্কও প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মোদকের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
বাণিজ্য চুক্তি এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্টে জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে তাদের বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে এই চুক্তি হয়েছে। ট্রাম্প বলেন,
“মোদির অনুরোধে আমরা বৈশ্বিক ‘লিবারেশন ডে’ শুল্কের আওতায় ভারতের ওপর যে ২৫ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক বসানো হয়েছিল, তা কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হয়েছে। পাশাপাশি রাশিয়ার তেল কেনার কারণে বসানো অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্কও প্রত্যাহার করা হয়েছে।”
চুক্তির মাধ্যমে ভারত যুক্তরাষ্ট্র এবং সম্ভবত ভেনেজুয়েলা থেকে আরও তেল আমদানি করবে। ট্রাম্পের মতে, এটি ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধানে সহায়ক হতে পারে। বর্তমানে ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।
মোদির প্রতিক্রিয়া
সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ মোদি লিখেছেন,
“প্রিয় বন্ধু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলে দারুণ লাগল। ‘মেইড ইন ইন্ডিয়া’ পণ্যের ওপর শুল্ক কমে ১৮ শতাংশ হওয়ায় আমি আনন্দিত।”
তবে তিনি রাশিয়ার তেল কেনাবেচার প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান। মোদি আরও বলেন,
“বিশ্বশান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
দুই দেশের সম্পর্কের প্রেক্ষাপট
উল্লেখযোগ্য যে, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ভারত রাশিয়ার তেলের বড় বাজারে পরিণত হয়। ২০২৪ সালে ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৩৬ শতাংশ এসেছে রাশিয়া থেকে। তবে গত ডিসেম্বরে নয়াদিল্লি সফরে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ভারতের প্রতি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দেন, যদিও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ভারতকে রাশিয়ার তেল না কেনার জন্য চাপ দিচ্ছিল।
এর আগে অক্টোবর মাসে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে মোদি রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কিন্তু চূড়ান্ত চুক্তি তখন হয়নি। এবার সেই প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্লেষক ও মিডিয়ার প্রতিক্রিয়া
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বাণিজ্য চুক্তি ভারতের জন্য নতুন বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করবে। শুল্ক হ্রাসে ‘মেইড ইন ইন্ডিয়া’ পণ্যের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং ভারতীয় রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এছাড়া, ট্রাম্প-মোদির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দুই দেশের মধ্যে যৌথ নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি সুসংহত করতে সাহায্য করবে। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে, রাশিয়ার তেল আমদানিতে পরিবর্তন আন্তর্জাতিক বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে সহায়ক হতে পারে।
সামগ্রিক প্রভাব
চুক্তির ফলে ভারতের পণ্যের বাজারে প্রবেশ সহজ হবে, রপ্তানি ও আমদানির খরচ কমবে। ব্যবসায়ীরা ইতিমধ্যেই আশা প্রকাশ করেছেন যে এই পদক্ষেপ ভারতের উৎপাদন খাত ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি, এই চুক্তি দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করবে। ট্রাম্প-মোদির বাণিজ্য চুক্তি একটি ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার মাধ্যমে সমৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক শান্তি সম্ভব।
শেষকথা
ট্রাম্প-মোদির বাণিজ্য চুক্তি ভারতীয় পণ্যের জন্য নতুন সুযোগের দ্বার খুলেছে। শুল্ক কমার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ‘মেইড ইন ইন্ডিয়া’ পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে মৈত্রীপূর্ণ কূটনীতি ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে।
বিশ্লেষকরা আশা করছেন, এই চুক্তি ভারতের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ইতিবাচক প্রভাব রাখবে এবং ইউক্রেন যুদ্ধের পরিস্থিতিতে স্থিতিশীলতা আনতে সাহায্য করবে।





