চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক বিশ্বের ভূ-রাজনীতিতে সবচেয়ে প্রভাবশালী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কগুলোর একটি। বাণিজ্য, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা-সবক্ষেত্রেই এই দুই পরাশক্তির সিদ্ধান্ত গোটা বিশ্বকে প্রভাবিত করে। এর মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সর্বশেষ ফোনালাপ বিশ্বব্যাপী নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ফোনালাপ শেষে ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, আগামী বছরের এপ্রিলে তিনি বেইজিং সফর করবেন, পাশাপাশি শি জিনপিংকেও তিনি আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ওয়াশিংটনে।
দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের কথোপকথন: কোন কোন ইস্যু আলোচনায়
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় এক ঘণ্টার কথা বলেন ট্রাম্প ও শি। আলোচনার মূল বিষয় ছিল-
- দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য
- রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ
- তাইওয়ান প্রশ্ন
- ফেন্টানিল সংকট
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আলোচনা ছিল “সমতা, সম্মান ও পারস্পরিক লাভের ভিত্তিতে গঠনমূলক”।
সম্পর্ক উন্নয়নের ধারাবাহিকতা: দক্ষিণ কোরিয়ার বৈঠকের পর ইতিবাচক অগ্রগতি
গত অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ার বুসান শহরে ট্রাম্প–শি বৈঠকে দুই দেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ‘যুদ্ধবিরতি’তে পৌঁছেছিল।
- যুক্তরাষ্ট্র ফেন্টানিল নিয়ন্ত্রণে সহায়তার বিনিময়ে ২০% শুল্ক কমিয়ে অর্ধেকে আনে
- চীন বিরল ধাতু রপ্তানিতে নতুন নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে
তবে এখনো চীনা পণ্যে গড়ে প্রায় ৫০% শুল্ক আছে, যা ভবিষ্যৎ আলোচনায় কমতে পারে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।
চীনের বিবৃতিতে বলা হয়েছে-
“সেই বৈঠকের পর দুই দেশের সম্পর্ক স্থিতিশীল ও ইতিবাচক পথে এগোচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হচ্ছে।”
ট্রাম্পের বার্তা: ‘চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত দৃঢ়’
ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া Truth Social–এ লিখেছেন-
“চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত দৃঢ়!”
এটি ইঙ্গিত করছে, আগামী এপ্রিলে তার চীন সফর দুই দেশকে আরও ঘনিষ্ঠ আলোচনার সুযোগ করে দেবে।
বাণিজ্যই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু: হোয়াইট হাউসের স্বীকারোক্তি
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন-
- ফোনালাপ স্থায়ী হয়েছিল প্রায় এক ঘণ্টা
- আলোচনার মূল ফোকাস ছিল বাণিজ্য ইস্যু
- “চীনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে আমরা সন্তুষ্ট,” তিনি বলেন
এটি নিশ্চিত করছে যে, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধ কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তাইওয়ান ইস্যু: শি জিনপিংয়ের পরিষ্কার বার্তা
সংবেদনশীল তাইওয়ান প্রশ্ন নিয়ে চীন তাদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে।
শি জিনপিং বলেন-
- “তাইওয়ানের চীনে প্রত্যাবর্তন যুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় আমাদের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
এদিকে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, তাইওয়ানে চীনের সামরিক পদক্ষেপ হলে জাপান প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে-যা উত্তেজনা বাড়িয়েছে আরও।
যদিও ট্রাম্প তার পোস্টে তাইওয়ানের বিষয় উল্লেখ করেননি।
ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধ: সহযোগিতা চান যুক্তরাষ্ট্র
ট্রাম্প ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন বন্ধ করতে চীনের কূটনৈতিক ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছেন।
চীন দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ‘মধ্যস্থতা’ ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছে।
ট্রাম্পের সম্ভাব্য চীন সফর বিশ্ব রাজনীতিতে কী বার্তা দিচ্ছে?
বিশ্লেষকদের মতে-
- মার্কিন-চীন সম্পর্ক নতুন করে স্থিতিশীল হচ্ছে
- বাণিজ্য যুদ্ধ প্রশমনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হতে পারে
- তাইওয়ান ও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে
- ২০২৫ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতি দুই দেশের আলোচনার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করবে
এপ্রিলের সফর তাই দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।