উইকিপিডিয়ায় ইতিহাস বিকৃতি (Wikipedia History Distortion)
উইকিপিডিয়াকে আমরা তথ্যের প্রথম উৎস হিসেবে বিশ্বাস করি, কিন্তু দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সাম্প্রতিক অনুসন্ধান আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ২০১৪ সালের পর থেকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী বাংলা উইকিপিডিয়ায় প্রভাব বিস্তার করছে। বিশেষ করে নোয়াখালী ও কলকাতা দাঙ্গা, চুকনগর গণহত্যা এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো ঐতিহাসিক বিষয়গুলোতে নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্রের বালাই না রেখে মুসলমানদের ঢালাওভাবে ‘ভিলেন’ এবং হিন্দু সম্প্রদায়কে একমাত্র ‘ভুক্তভোগী’ হিসেবে দেখানোর অপচেষ্টা চলছে। এমনকি ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লবের শহীদ ও সংগঠকদের তথ্য মুছে ফেলা বা বিকৃত করার মতো ঘটনাও নজরে এসেছে। এই সচেতনতাই আমাদের প্রথম শক্তি-আমরা এখন জানি যে উইকিপিডিয়ার সব তথ্যই ধ্রুব সত্য নয়, বরং সেখানেও রাজনৈতিক এজেন্ডা থাকতে পারে।
সরব হচ্ছেন লেখকরা
প্রতিরোধ ইতিহাস বিকৃতির এই আয়োজন বিনা চ্যালেঞ্জে পার পাচ্ছে না- এটিই স্বস্তির খবর।
- তথ্যের অণুবীক্ষণ: অভিজ্ঞ উইকিপিডিয়া লেখক ও গবেষকরা (যেমন: এস এম মামুন হোসেন) এখন নিবন্ধগুলোর ‘তথ্যসূত্র’ বা রেফারেন্স যাচাই করছেন। নোয়াখালী দাঙ্গার নিবন্ধে ৮২টি সূত্রের মধ্যে মাত্র ১টি নির্ভরযোগ্য এবং বাকিগুলো যে অতিরঞ্জিত বা অস্তিত্বহীন, তা উন্মোচন করা হয়েছে।
- মিথ্যার মুখোশ উন্মোচন: ব্রিটিশ আমলের সরকারি নথি এবং নিরপেক্ষ ঐতিহাসিকদের (যেমন: সুগত বোস) রেফারেন্স দিয়ে প্রমাণ করা হচ্ছে যে, সোহরাওয়ার্দী দাঙ্গা থামানোর চেষ্টা করেছিলেন, উস্কে দেননি। সংখ্যাতত্ত্বের মিথ্যাচার (যেমন: ৫০ হাজারের জনসংখ্যায় ৫০ হাজার নিহতের দাবি) এখন প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে।
- জুলাই স্পিরিট: জুলাই বিপ্লবের সত্য ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা রুখে দিতে তরুণরা অনলাইনে সরব হচ্ছেন, যা ডিজিটাল প্রতিরোধেরই অংশ।
করণীয় কেবল অভিযোগ না করে, আমাদের সক্রিয় ভূমিকার সময় এসেছে:
১. অন্ধবিশ্বাস ত্যাগ: উইকিপিডিয়ার কোনো স্পর্শকাতর তথ্য পড়ার সময় অবশ্যই নিচে দেওয়া ‘তথ্যসূত্র’ যাচাই করুন। সূত্রটি নির্ভরযোগ্য (যেমন: প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যম বা একাডেমিক বই) কি না, তা দেখুন।
২. উইকিপিডিয়ায় যোগদান: উইকিপিডিয়া সবার জন্য উন্মুক্ত। ইতিহাস সচেতন তরুণ, গবেষক ও লেখকদের উচিত বিপুল সংখ্যায় উইকিপিডিয়ায় ‘কন্ট্রিবিউটর’ হিসেবে যুক্ত হওয়া। নিরপেক্ষ লেখকের সংখ্যা বাড়লে পক্ষপাতদুষ্ট অ্যাডমিনরা একপেশে প্রভাব খাটাতে পারবে না।
৩. আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ: যদি কোনো অ্যাডমিন অযৌক্তিকভাবে নিরপেক্ষ লেখকদের ব্লক করে, তবে উইকিপিডিয়ার আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা ‘মেটা-উইকি’তে (Meta-Wiki) উপযুক্ত প্রমাণসহ অভিযোগ দায়ের করতে হবে।
৪. সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ: জাতীয় ইতিহাসের বিকৃতি রোধে বাংলাদেশ সরকার এবং ইতিহাসভিত্তিক সংগঠনগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে উইকিপিডিয়া কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে সঠিক তথ্য উপস্থাপনে চাপ প্রয়োগ করতে হবে।
বাংলাদেশের সঠিক ইতিহাস ও উইকিপিডিয়া (True History of Bangladesh and Wikipedia)
সচেতন লেখকদের মতে, পরিস্থিতি পাল্টানোর জন্য শুধু অভিযোগ নয়, সংগঠিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সে লক্ষ্যেই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ সামনে আসছে—
- আন্তর্জাতিক উইকিপিডিয়া Arbitration Committee-তে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা
- একাডেমিক বই, ব্রিটিশ সরকারি প্রতিবেদন ও নিরপেক্ষ গবেষণা থেকে রেফারেন্স সংগ্রহ
- Edit-a-thon ও ফ্যাক্ট-চেকিং উদ্যোগ
- ইংরেজি উইকিপিডিয়ায় নিরপেক্ষ তথ্য যোগ করে বাংলা সংস্করণে তা রেফারেন্স হিসেবে যুক্ত করা
- ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রবন্ধ লেখা
এই উদ্যোগগুলো ধীরে হলেও উইকিপিডিয়ার ভেতরে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার পথ তৈরি করছে।
বাংলাদেশ কী করতে পারে
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও ভূমিকা রাখা সম্ভব-
- পররাষ্ট্র ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক উইকিপিডিয়া প্রশাসকদের দৃষ্টি আকর্ষণ
- গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়কে যুক্ত করে নিরপেক্ষ কনটেন্ট তৈরি
- ডিজিটাল আর্কাইভ ও ঐতিহাসিক দলিল উন্মুক্ত করা
এতে শুধু উইকিপিডিয়াই নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের ইতিহাসও সঠিকভাবে উপস্থাপিত হবে।
সত্য কখনো চাপা থাকে না
সবচেয়ে বড় আশার জায়গা হলো- ‘সত্য কখনো চাপা থাকে না।’
- যতই বিকৃত করা হোক, মূল ঐতিহাসিক দলিল, ব্রিটিশ রিপোর্ট এবং নিরপেক্ষ বইগুলো পৃথিবী থেকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।
- সাম্প্রতিক সময়ে এই বিকৃতির বিষয়টি নিয়ে মূলধারার গণমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়েছে, যা সাধারণ মানুষকে সতর্ক করছে।
- উইকিপিডিয়া একটি চলমান প্রক্রিয়া। আজ যা বিকৃত, কাল তা সঠিক তথ্যের জোরে সংশোধনযোগ্য। জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে জাতি যেভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, ঠিক সেভাবেই ডিজিটাল দুনিয়ায় আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষার এই লড়াইয়েও সত্যসন্ধানী মানুষ বিজয়ী হবে।
পাঠকদের জন্য দায়িত্বের জায়গা
উইকিপিডিয়া শুধু লেখকদের প্ল্যাটফর্ম নয়; পাঠকরাও এর অংশ। কোনো তথ্য পড়ার সময়-
- একাধিক সূত্র যাচাই করা
- আলোচনা পাতা দেখা
- সন্দেহজনক তথ্য চিহ্নিত করা
এই অভ্যাসগুলোই দীর্ঘমেয়াদে একটি সুস্থ জ্ঞানভিত্তিক পরিবেশ গড়ে তোলে।
শেষকথা
ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে এই লড়াই শুধু একটি ওয়েবসাইটের জন্য নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর লড়াই। আর সেই লড়াইয়ে আশার আলো জ্বলছেই।
ইতিহাস আমাদের শেকড়, আর সেই শেকড় রক্ষায় আমাদের আজকের সচেতনতাই আগামী প্রজন্মের জন্য সঠিক ইতিহাসের পাথেয় হবে।




