বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে দেশেই সামরিক ড্রোন উৎপাদন কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী। এই লক্ষ্যে চীনের সঙ্গে সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে “ইস্টাবলিশমেন্ট অব ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট অ্যান্ড ট্রান্সফার অব টেকনোলজি (ToT) ফর আনম্যানড এরিয়াল ভেহিকল (UAV)” শীর্ষক প্রকল্প প্রস্তাবের অনুমোদন দিয়েছে।
চার বছরে ব্যয় হবে ৫৭০ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রায়
মোট প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০৮ কোটি ৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে:
- ৫৭০ কোটি ৬০ লাখ টাকা বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করা হবে
- বাকি ৩৭ কোটি ৪৭ লাখ টাকা এলসি চার্জ, ভ্যাট ও সুইফট চার্জ হিসেবে দেশীয় মুদ্রায় ব্যয় হবে
পরিশোধের সময়সূচি:
- চলতি অর্থবছর: ১০৬ কোটি টাকা
- ২০২৬–২৭ অর্থবছর: ১৫৫ কোটি টাকা
- ২০২৭–২৮ অর্থবছর: ১৫৫ কোটি টাকা
- ২০২৮–২৯ অর্থবছর: ১৫৪.৬০ কোটি টাকা
বাজেটের মধ্যেই বাস্তবায়ন হবে প্রকল্প
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- এই প্রকল্প বাস্তবায়নে বিমান বাহিনীর জন্য আলাদা কোনো অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজন হবে না। প্রতিবছর প্রতিরক্ষা বাজেটে “অন্যান্য যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি” খাতে যে অর্থ বরাদ্দ থাকে, সেখান থেকেই ব্যয় নির্বাহ করা হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয় পাঁচটি শর্তে প্রকল্পটির অনুমোদন দিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে:
- চলতি অর্থবছরে অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়া যাবে না
- পরবর্তী অর্থবছরগুলোতে বাজেট সীমার মধ্যেই অর্থ সংস্থান
- সব অর্থ এলসির মাধ্যমে পরিশোধ
- সরকারি আর্থিক বিধি-বিধান কঠোরভাবে অনুসরণ
- প্রকল্প ব্যতীত অন্য কোনো খাতে অর্থ ব্যবহার নিষিদ্ধ
চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিতে তৈরি হবে ড্রোন
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী। প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম সরবরাহ করবে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান চায়না ইলেকট্রনিক্স টেকনোলজি গ্রুপ করপোরেশন (CETC) ইন্টারন্যাশনাল।
প্রথমে প্রতিষ্ঠানটি ৬৪৩ কোটি টাকার প্রস্তাব দিলেও আলোচনার মাধ্যমে মূল্য কমিয়ে ৬০৮ কোটি টাকায় চূড়ান্ত করা হয়।
দেশেই তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ হবে সামরিক ড্রোন
এই কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশ:
- নিজস্ব সামরিক ড্রোন উৎপাদন করতে পারবে
- ড্রোনের মেইনটেন্যান্স ও আপগ্রেড দেশে বসেই সম্ভব হবে
- আমদানিনির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে
- প্রতিরক্ষা শিল্পে দক্ষ জনবল তৈরি হবে
- প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও কৌশলগত নিরাপত্তা বাড়বে
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এটি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা শিল্পে একটি মাইলফলক প্রকল্প।
প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদনেই পথচলা শুরু
প্রকল্পটির প্রস্তাবনায় অনুমোদন দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, যিনি বর্তমানে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও রয়েছেন।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সমন্বয় সভায়ও চীনের সঙ্গে যৌথভাবে ইউএভি কারখানা স্থাপনের বিষয়টি নীতিগতভাবে চূড়ান্ত করা হয়।
CETC: বিশ্বখ্যাত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান
CETC বর্তমানে বিশ্বের ১১০টির বেশি দেশে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান সক্ষমতার মধ্যে রয়েছে:
- রাডার ও এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম
- ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার প্রযুক্তি
- যোগাযোগ ও ন্যাভিগেশন ব্যবস্থা
- ইউএভি ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম
- সমন্বিত সামরিক তথ্যব্যবস্থা
উপসংহার
বাংলাদেশে সামরিক ড্রোন উৎপাদন কারখানা স্থাপন শুধু একটি শিল্প প্রকল্প নয়—এটি দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতা এবং কৌশলগত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী অগ্রগতি।
এই উদ্যোগ সফল হলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় সামরিক ড্রোন উৎপাদনকারী অল্প কয়েকটি দেশের কাতারে যুক্ত হবে—যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও দেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে।
সূত্রঃ বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড




