ফুটবল মাঠে নাটকীয়তা নতুন কিছু নয়, কিন্তু রবিবারের আফ্রিকা কাপের ফাইনাল হার মানিয়েছে সিনেমার চিত্রনাট্যকেও। পেনাল্টি বিতর্ক, ১৪ মিনিটের দীর্ঘ বিরতি, খেলোয়াড়দের মাঠ ছাড়ার হুমকি এবং শেষ মুহূর্তে পেনাল্টি মিস সব মিলিয়ে এক বিশৃঙ্খল রাতের সাক্ষী হলো ফুটবল বিশ্ব। আর এই সব নাটকীয়তা শেষে স্বাগতিক মরক্কোকে ১-০ গোলে হারিয়ে আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের (AFCON) শিরোপা ঘরে তুলল সেনেগাল।
নির্ধারিত সময়ে গোলশূন্য থাকার পর অতিরিক্ত সময়ে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ হয়। সাদিও মানের দলের হয়ে জয়সূচক গোলটি করেন পাপে গেই। এটি সেনেগালের ইতিহাসে দ্বিতীয় আফ্রিকান শিরোপা।
১৪ মিনিটের বিরতি ও পেনাল্টি নাটক
ম্যাচের নির্ধারিত সময়ের একেবারে শেষ দিকে শুরু হয় মূল নাটক। যোগ করা সময়ে ভিএআর (VAR) চেক করে কঙ্গোর রেফারি জ্যঁ-জ্যাক এনডালা মরক্কোকে পেনাল্টি উপহার দেন। অভিযোগ ছিল, কর্নার ঠেকাতে গিয়ে সেনেগালের ডিফেন্ডার এল হাজি মালিক দিউফ মরক্কোর তারকা ব্রাহিম দিয়াজকে ফাউল করেছেন।
রেফারির এই সিদ্ধান্তে তীব্র প্রতিবাদ জানায় সেনেগাল। ক্ষোভে ফেটে পড়েন সেনেগালের খেলোয়াড়রা। একপর্যায়ে তারা প্রতিবাদস্বরূপ মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যান। খেলা বন্ধ থাকে দীর্ঘ ১৪ মিনিট। শেষ পর্যন্ত সাদিও মানের অনুরোধে ও নেতৃত্বে খেলোয়াড়রা পুনরায় মাঠে ফিরলে খেলা শুরু হয়।
কিন্তু নাটকের তখনও বাকি ছিল। পেনাল্টি নিতে আসেন রিয়াল মাদ্রিদ তারকা (বর্তমানে মরক্কোর হয়ে খেলা) ব্রাহিম দিয়াজ। স্নায়ুচাপের মুহূর্তে তিনি ‘প্যানেনকা’ শট নেওয়ার ঝুঁকি নেন। কিন্তু তার দুর্বল শট সহজেই ধরে ফেলেন সেনেগালের গোলরক্ষক এদুয়ার্দ মেন্ডি। স্টেডিয়ামভ ভর্তি হাজারো দর্শক তখন স্তব্ধ হয়ে যায়।
অতিরিক্ত সময়ে পাপে গেইয়ের গোল
নির্ধারিত সময় গোলশূন্য থাকার পর খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। অতিরিক্ত সময়ের চতুর্থ মিনিটেই আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। মাঝমাঠ থেকে বল কেড়ে নিয়ে সাদিও মানে বল বাড়ান ইদ্রিসা গানা গেইয়ের দিকে। সেখান থেকে বল পান পাপে গেই।
ভিয়ারিয়াল মিডফিল্ডার পাপে গেই মরক্কোর তারকা ডিফেন্ডার আশরাফ হাকিমিকে পেছনে ফেলে এক দুর্দান্ত শট নেন। গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনো বলের নাগাল পেলেও তা জালে জড়ানো আটকাতে পারেননি। আর এই এক গোলই নির্ধারণ করে দেয় ম্যাচের ভাগ্য। ৬৬ হাজার দর্শকের প্রিন্স মৌলাই আবদেল্লাহ স্টেডিয়াম তখন পিনপতন নীরবতায় ডুবে যায়।
বাতিল হওয়া গোল ও মরক্কোর হতাশা
এর আগে ম্যাচের দ্বিতীয় যোগ করা মিনিটে সেনেগালের একটি গোল বাতিল হয়। কর্নার থেকে আবদুলায়ে সেকের হেড পোস্টে লাগার পর ফিরতি বলে ইসমাইল সার গোল করেছিলেন। কিন্তু রেফারি ফাউলের সিদ্ধান্তে গোলটি বাতিল করেন, যা নিয়েও সেনেগাল শিবিরে ছিল চরম অসন্তোষ।
অন্যদিকে গোল হজমের পর মরক্কো ম্যাচে ফেরার আপ্রাণ চেষ্টা করে। অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয় ভাগে নায়েফ আগুয়ের্দের একটি হেড ক্রসবারে লেগে ফিরে আসলে স্বাগতিকদের কপাল পুড়ে। শেষ পর্যন্ত আর গোলের দেখা পায়নি তারা।
সেনেগালের রাজত্ব ও মানের বিদায়ী সুর
এটি সেনেগালের দ্বিতীয় আফ্রিকা কাপ শিরোপা। গত তিন আসরের মধ্যে দুইবারই তারা চ্যাম্পিয়ন হলো। এর আগে ২০২২ সালে মিসরকে হারিয়ে তারা প্রথমবার আফ্রিকার শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরেছিল।
এই জয়ের মাধ্যমে সেনেগাল যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন বিশ্বকাপের আগে নিজেদের আত্মবিশ্বাস অনেক উঁচুতে নিয়ে গেল। তবে ভক্তদের জন্য একটি মন খারাপের খবরও ছিল। দলের প্রাণভোমরা সাদিও মানে আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, এটিই হতে পারে তার শেষ আফ্রিকা কাপ। যদি তাই হয়, তবে শিরোপা জিতেই রাজার মতো বিদায় নিলেন এই লিভিং লিজেন্ড।




